জলরঙে গ্রাম্য জীবন

অভ্যস্ত নাগরিক জীবনের গতিতে খেই হারিয়ে ফেলছে মানুষ। জীবনস্রোতের তীব্র গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের মন আর সারল্য। কংক্রিটের জঙ্গলে দেখা মেলেনা এক ফোটা স্বস্তির। এই ধূসর কংক্রিটের গুমোট পরিবেশ থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি দেয় সুমন কুমার সরকারের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘বরেন্দ্র কাব্য-২।’ ছুটতে থাকা শহরজীবীদের মনে প্রশান্তি এনে দেবে প্রদর্শনীর চিত্রগুচ্ছ। সহজ স্বাভাবিক গ্রামীণ জীবনকে জল রঙের তারল্যে উপস্থাপন করেছেন শিল্পী।

 

সুমনের ভাষ্যমতে, পৌরাণিক কাহিনীতে কথিত আছে ইন্দ্রের বরপ্রাপ্ত ভূমি ‘বরেন্দ্র’। এই অঞ্চলের ভূমি উঁচুনিচু। উঁচুনিচু ভূমির লাল মাটিতে গড়ে উঠেছে কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থা। কৃষিনির্ভর এই সমাজব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আছে কৃষকদের গোটা পরিবার। সেই কৃষক এবং তাদের জীবনযাপনকে ফ্রেম বন্দী করেছেন সুমন কুমার সরকার।

লাঙ্গলের ফলায় মাটি নরম করে, সেই মাটিতে বীজ বপন করে, ফসলে কাস্তে চালিয়ে, শরীরের ঘাম ঝরিয়ে কৃষক ফসল ফলান। সুমনের চিত্রকর্মে উঠে এসেছে কৃষকদের জীবন সংগ্রাম, সুখ-দুঃখের খণ্ডচিত্র। যার মধ্যে মন দিয়ে তাকালে পাওয়া যায় বৃহত্তর গল্পের ইঙ্গিত।

যে কৃষক গোটা দেশের খাদ্যের সংস্থান করে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই কৃষকের জীবন কেমন? কেমন তার পরিবার? কেমন তার জীবনব্যবস্থা? তা যেমন এইসব চিত্রকর্মে উঠে এসেছে, তেমনি উঠে এসেছে হেমন্তের পাকা ধান আসার পর কৃষকের দৈনন্দিন জীবনের কর্মচঞ্চলতা।

কৃষিনির্ভর সমাজে গ্রামীণ জনপদ, নৌপথে চলাচল, ছুটে যাওয়া নৌকার গল্প সুমন তুলে ধরেছেন। ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলোর বাতাসের দুলুনীতে এপাশওপাশ করা, নৌপথে পারাপার হওয়া মানুষের যাপিত জীবনের দৃশ্যও তুলে ধরা হয়েছে এই সকল চিত্রকর্মে।

ভোরের আবহে গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থা কেমন? সূর্যের গতি বাড়ার সাথে সাথে গ্রামীণ নারীদের পাল্লা দিয়ে ছুটে বেড়ানো, ভোরের সাথে পশু-পাখিদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার দৃশ্য ফুটে উঠেছে এই চিত্রকর্মে। কিশোরী নারীর মুখ, প্রকৃতির সাথে নারীর সৌন্দর্য্যের অপরূপ মেলবন্ধন, কৈশরের উচ্ছ্বলতা ফুটিয়ে তুলেছেন সুমন।

যে গ্রামীণ পরিবেশ, প্রতিবেশ থেকে আমাদের উঠে আসা, সেই গ্রামীণ পরিবেশে ডুব দেয়ার অনন্য সুযোগ পাওয়া যাবে সুমনের প্রদর্শনীতে। এই প্রদর্শনী আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেবে, মনে করিয়ে দেবে গ্রাম্য সরলতা।

দলগত ও যৌথ প্রদর্শনীর মাধ্যমে সুমন নিজেকে পরিপক্ক করে নিয়েছেন। ‘বরেন্দ্র কাব্য-২’ সুমনের তৃতীয় একক প্রদর্শনী। এর আগে ২০১৫ সালে রাজশাহীতে ‘বরেন্দ্র কাব্য’ শিরোনামে একক প্রদর্শনী হয়েছিলো এই শিল্পীর। জলরঙে আঁকা ‘বরেন্দ্র কাব্য-২’ রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ৪ মে থেকে শুরু হয়েছে, চলবে ১০ মে পর্যন্ত। প্রদর্শনীটি দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত।