জলে যার আস্তরণ

চলতে না পারে সহস্র শৈবালদাম বাঁধে। জীর্ণ লোকাচার বাঁধে পদে পদে তারে। মানুষের যাপিত জীবনের- তার সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনীতির এক অনন্য কুশীলব নদী।
আদপে যমুনা নাম সে নদীর। ছিল ব্রহ্মপুত্রের সংশ্লিষ্ট। ১৭৮৭ সালে নবসৃষ্টি ঘটে তার। কেননা ওই বছরই ব্রহ্মপুত্র নিজের গতিপথ পরিবর্তন করে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করে। নাম তার যমুনা। আদুরে, প্রমত্তা, দিগন্তছোঁয়া এক বিপুলা চঞ্চলা। সে বছর বড় বন্যা হয়েছিল এক, তাই এই নাটকীয় পরিবর্তন। অনেকে অবশ্য ১৭৮২ সালের তীব্র ভূমিকম্পের দোহাই দেন; বলেন নদীর গতিপথ পরিবর্তনে এ ঘটনাও অবদান রাখতে পারে।
নদী তো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। প্রবাহিত হয় সে, গঠন করে নতুন জমিন, ক্ষয় করে পুরাতনকে। গড়ে তোলে প্লাবন সমভূমি। মানুষ বসতি তৈরি করে সেই নরম কোমল ভূমিতেই। সেই সে কোন কাল থেকে। নদীর সঙ্গে সঙ্গে তাই মানুষেরও জীবনের গতিপথ বদলায়। এ কারণে পূর্ব ভারতের কৃষিনির্ভর গ্রামকেন্দ্রিক বসতি আর নগরগুলোর উত্থানে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছে নদী ও নদীব্যবস্থা। সেখানেই আছে আমাদের নদী। ভালোবেসে যাকে সম্বোধন করা যায় ‘অয়ি যমুনা’।


প্লাবন সমভূমির প্রতিবেশগত অনুষঙ্গে তাই নদী, নদী প্রভাবিত ভূমিরূপ আর বন্যার সঙ্গে মানুষের নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক বজায় এবং অব্যাহত রাখা বড় জরুরি। আর দু-দশটা নদীর মতো যমুনাও তার রূপ পাল্টিয়েছে; এক খাত থেকে আরেক খাতে আকস্মিকভাবে সরে; ধীরে ধীরে এক পাশ থেকে আরেক পাশে বদলে। ঘটে যাওয়া আকস্মিক প্রাকৃতিক ঘটনা বিশেষত অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যা, নদীর ধরন, নদীতে প্রবাহিত পানির পরিমাণ ও স্রোতের বেগ, নদীর পানিতে বাহিত পললের ধরন ও পরিমাণ, যে ভূমিরূপের মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়, সেই ভূমিরূপের প্রকৃতি, ঢাল, তাতে মাটি ও শিলার ধরনসহ অনেকগুলো প্রাকৃতিক প্রভাবক যমুনার রূপ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। যমুনাও চলেছে সে পথেই মানুষী ক্ষমতার জোরে। উজানের জল আটকে, বড় বড় সেতু গড়ে নদীকে আমরা বশে আনছি বলে ভাবি। কিন্তু আদপে সেকি ঘটে?

 

পুরাকালে একটার পর একটা নদী মরে গেছে, নতুন নদীপ্রবাহ সৃষ্টিও হয়েছে। এ নিরন্তর ভাঙা-গড়ার একান্ত প্রবৃত্তিতে বাদ সেধেছি আমরা, বন্যার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের তৎপরতায় যে রুক্ষ বালু সঞ্চিত হয়েছে মাতৃস্বরূপা নদীর বুকের গহিনে, তার একটা বড় অংশই আজ নদীকে নিয়ে চলেছে মরুপথে।

ছবি: গায়ত্রী অরুণ

লেখা: সালেহ্‌ রাব্বী জ্যোতি