জাহাজ তৈরির কারিগর

আশ্বিনের তপ্ত রোদে বসে উত্তাপ ছড়ানো ওয়েল্ডিং মেশিনে একটির পর একটি শিট ঝালাই করে যাচ্ছেন ওয়েল্ডার উত্তম। কর্দমাক্ত শরীরে ক্লান্তিরা যেন বিশ্রামই পাচ্ছে না। মাথায় একটায় চিন্তা, কাজটা কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়। প্রতিটি মিনিট তার জন্য মহামূল্যবান। কারণ সময় ধরে মেলে কাজের পারিশ্রমিক। গরিব বাবার অন্ধের যষ্টি সংসারে বলতে গেলে সে একা। তার উপার্জনের ওপর নির্ভর করে পরিবারের পাঁচজন সদস্যের জীবন-জীবিকা। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা থেকে তার উপলব্ধি সে যত সময় নিয়ে কাজ করবে তার পরিবার ততো ভালোভাবে খেয়ে ভালো থাকবে। তাই কাজে কোনো ধরনের ফাঁকিবাজি নেই নবাবগঞ্জ উপজেলার বারহা গ্রামের ছেলে উত্তমের। হাত দুটো তার শিট ঝালাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকলেও মাথায় এখন অন্য চিন্তা কাজ করছে ‘এইতো আর কয়েকটা ঘণ্টা, তারপর ৫টা বাজলেই ২৫০ টাকা হাজিরা। আর যদি ৮টা পর্যন্ত কাম চলে তাহলে ১০০ টাকা ওভার টাইম’।

অন্যদিকে মা হারা ফিটার আলীম মণ্ডলের ভাবনাগুলো আরো জটিল। বাবা ইউনুছ মণ্ডলকে বলে এসেছে, ‘তুমি ডাক্তোরের দোকান থাইক্যা তোমার শ্বাসের ওষুধ কিইন্যা খাইয়ো। আমি গিয়াই টেহা পাঠামু।’ কিন্তু সে এখনো প্রতিশ্রুত টাকা পাঠাতে পারেনি। এ কারণে মনটা ভালো নেই আলীমের। একমাত্র বড় বোন সুফিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। কথোপকথনে সে জানায়, ‘তার বাবা আগে গোয়ালন্দ ঘাটে মাছের ব্যবসা করতো। অহন আর কামে যাবার পারে না। খুব শ্বাসকষ্ট অয়তো তাই। কেউতো নাই বাবারে দেহার এই জন্য হারাদিন চিন্তা লাগে। দেহি হাজিরা আটটু (আরেকটু) বাড়লে বাবাকে আমার সঙ্গেই আইন্না রাখমু।’ রাজবাড়ির গোয়ালন্দ উপজেলার ইউনুছ মণ্ডলের পোষ্যপুত্র আলীম। পরিচয়হীন অচেনা একটি ছেলেকে পেলে পুষে লায়েক করেছে যে মানুষটি। তার জন্য একটু বাড়তি চিন্তা থাকাটাই স্বাভাবিক। আর হেলপার ইমরান ভাবছে, ‘ইশ যদি কামডা তাড়াতাড়ি শিখতে পারতাম তাইলে আমার বেতন আরো কতো বাড়তো।’ বিদেশ গিয়ে বড় কোম্পানির বড় বড় জাহাজ তৈরি করার স্বপ্ন তার। মাসে এক দেড় হাজার করে জমানো টাকায় কবে বিদেশে পাড়ি দেয়া হবে ইমরানের তা তার কাছে অজানা। এ কারণে কাজ শিখে হাজিরা বাড়ানোর জন্য অন্তরে এত তাড়া। আর তাই কাজটার প্রতি অগাধ আগ্রহ তার। ওরা সবাই জাহাজ তৈরির কারিগর। লোহার সঙ্গে কাটে তাদের প্রতিদিন। লোহার মতোই কঠিন তাদের জীবন। পরিবার আর পরিজনদের সুখ নিশ্চিত করার জন্য তারা তাদের নিজের সুখ আর স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে পুরো জীবনটাই উৎসর্গ করেন কাজের মধ্যে। এই অভাবী মানুষগুলোর অমানুষিক কায়িক শ্রমে স্বনির্ভর হয় আমাদের অর্থনীতি। সময়ের কাঁটা ধরে কাজ করা এই অভাবী মানুষগুলোকে নিষ্ঠুর সময় একটু সুখ এনে দিতে পারে না। ভোরে কাজে যাবার তাড়ায় রাতের রয়ে যাওয়া পান্তাগুলো সকালে যখন অস্থির হয়ে তারা খায় তখন পেটে দুই মুঠো দানা পড়ায় সেই মূহূর্তটাই তাদের জন্য হয় প্রশান্তির।

রাজধানীর উপকণ্ঠের ডেমরা থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে উত্তরে কালো অজগরের মতো এঁকেবেঁকে যে পিচঢালা রাস্তাটি গাজীপুরের কালিগঞ্জে গিয়ে মিশেছে। সেই রাস্তা ধরে মাত্র তিন কিলোমিটার এগোলেই জাহাজ তৈরির চর রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া। পাঁচ বছর আগেও বন্যাকবলিত এই এলাকায় একটি পাখি ডেকে উঠলে তার শব্দ বাতাসে ভেসে যেত দূর-দূরান্তে। সময়ের ব্যবধানে সেখানে গড়ে উঠেছে জাহাজ তৈরির শিল্পাঞ্চল। হাজার মানুষের পদচারণায় কায়েতপাড়া এখন এক কর্মমুখর জনপদ। কায়েতপাড়ার পূর্বগ্রাম, ভাওয়ালীয়াপাড়া, ডাক্তারখালী, বড়ালু, মাঝিনা, হড়িনা ও ইছাখালীর চরে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক জাহাজ তৈরির কারখানা। এছাড়া উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের গঙ্গানগর ও দড়িকান্দির চরে রয়েছে আরো আট-দশটি প্রতিষ্ঠান। দেশের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও সোনারগাঁও, গাজীপুরের কালীগঞ্জ, চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, পাগলার পানগাঁও, সাভারের আশুলিয়া ও বরিশালের বেলতা এলাকায় এই শিল্পের অবস্থান। মাস্টাং ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, ফাহিম ডকইয়ার্ড, শামস ডকইয়ার্ড, তালহা ডকইয়ার্ড, আমির ডকইয়ার্ড, মালেক ডকইয়ার্ড, ফটিক ডকইয়ার্ড, ভাই ভাই ডকইয়ার্ড, মনির ডকইয়ার্ড- এগুলোর মধ্যে মাস্টাং ইঞ্জিনিয়ারিং কায়েতপাড়ার জাহাজ কারখানা অন্যতম। ২৫০ ফিট থেকে শুরু করে শত ফিটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরি, জেটি, পল্টন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট আর ড্রেজার তৈরি হয় শীতলক্ষ্যার এই চরে। দিনভর টানা খুটখাট আর ঢং ঢং শব্দে মুখরিত এলাকাতে অচেনা আগন্তুক এলে হয়তো ভাবতে পারে এলাকাজুড়ে চলছে উৎসব।

প্লেনশিট সমতল করছেন কারিগরেরা

জাহাজ তৈরিতে মূলত ব্যবহার হয় লোহার প্লেনশিট আর অ্যাঙ্গেল, মেশিন সরাসরি আমদানি করতে হয় চীন থেকে। অতিরিক্ত উপাদান বলতে টি-গার্ডার, বিট-গার্ডার, রং, ইট, বালি, সিমেন্ট, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন, ওয়েল্ডিং রড আর লেদ মেশিনের কিছু খুচরো কাজ। একটি বড় মাপের কোস্টার জাহাজ তৈরির জন্য প্রথমে রাজমিস্ত্রি বেইস লাইন তৈরি করে দেন। পরে ঠিকাদারের নির্দেশনাক্রমে ফিটাররা জাহাজের মলিন তৈরি করেন। ওয়েল্ডার ঝালাইয়ের মাধ্যমে জাহাজটির খাঁচা নির্মাণ করেন। একটি বডি দাঁড় করানোর পর চলে মেশিন স্থাপন আর রঙের কাজ। বড় জাহাজে তিন-চারটি খুপড়ি বা হেস থাকে।  যেখানে ৩০০-৪০০ টন পর্যন্ত মাল বহন করা যায়। প্লেনশিট আসে চট্টগ্রাম থেকে। বিদেশী কাটা জাহাজের ৮ থেকে  ১২ মিলির শিট ব্যবহার করা হয় জাহাজ তৈরিতে। ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে শিট কিনতে হয়। আর  লোহার অঙ্গেল ৭৫-৭৬ টাকায় পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। ৮-৯ লাখ টাকায় জাহাজের মেশিন আমদানি করা হয় চীন থেকে আর অন্যান্য মালামাল আছে ঢাকার বংশালে অথবা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে। সর্বসাকুল্যে একটি বড় জাহাজ তৈরিতে ৯-১০ কোটি টাকা খরচা হয়। এরপর মালিকরা সুবিধামতো লাভ করে তা বিক্রি করেন। একটি জাহাজ ২০-২৫ জন কারিগর মিলে তৈরি করলে সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ মাস।

জানা যায়, ১৭৯৯ সালে ব্রিটেন দ্বিতীয় যুদ্ধজোট গঠনের পর জোট থেকে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে একটি বার্তা আসে মিত্র হিসেবে ভারতবর্ষ থেকে জাহাজ তৈরির জন্য কিছু শ্রমিক প্রেরণ করার। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) থেকে ৩২০ জন শ্রমিক ব্রিটেনে পাঠান। শোনা যায়, তারা বর্তমান ঢাকার দোহারের অধিবাসী ছিলেন। সেই থেকে জাহাজ তৈরি করা দোহারবাসীর আদি ব্যবসা হয়ে উঠেছে। এখন কাঠের জাহাজের প্রচলন না থাকলেও বাংলাদেশে যারা জাহাজ তৈরি করেন বা জাহাজের ব্যবসা করেন তাদের অধিকাংশের বাড়ি ঢাকার দোহারে। আবার অনেকে মজা করে বলেন বাড়ি আমার দোহার, কাজ করি লোহার। অন্যদিকে বিক্রমপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ির গোয়ালন্দ, আর নবাবগঞ্জেও জাহাজ তৈরির কারিগরদের বাসস্থান রয়েছে। রং এবং রাজমিস্ত্রির কাজ করেন স্থানীয়রা। জাহাজ তৈরির জন্য যিনি জমি দেন এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন তাকে বলা হয় কারখানা মালিক। আর যারা জাহাজটি ফিটিংস করেন তাদের বলা হয় ফিটার। জাহাজে ঝালাইয়ের কাজ করেন ওয়েল্ডার আর পুরো ব্যাপারটা যে নিয়ন্ত্রণ করে সে হলো ঠিকাদার। জাহাজ তৈরির সকল উপকরণ কিনে দেন জাহাজ মালিক। জমির মালিক একটি জাহাজ ফেলার জন্য জমির ভাড়া নেন ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। শ্রমিকদের মজুরি মিটিয়ে জাহাজ পানিতে নামানোর পর বছরে ৪০-৫০ লাখ টাকার মতো আয় হয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া অত্র এলাকায় শিল্পটি গড়ে ওঠায় এলাকাতে বাড়ি ভাড়া, গর্দার ব্যবসা, লেদ মেশিন, খুচরো যন্ত্রাংশ আর পান-সিগারেটের দোকান দিয়েও এলাকার মানুষ বাড়তি উপার্জন করছে।

ইঞ্জিন স্থাপনের অপেক্ষায় একটি তৈরি জাহাজ

হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও কিন্তু ভালো নেই তারা। সবার সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল হতাশার খবর। জীবনজীবিকা আর বাসস্থানের মান নগণ্য। ফিটার সাঈদ, সোনাই, মোক্তার, জয়নাল ওয়েল্ডার পান্নু, আলমাছসহ আরো অনেকে জানান, হিসাব কষে খেয়ে দেয়ে বাকি টাকাটুকু তুলে রাখেন পরিবার-পরিজনদের জন্য। তারা বলেন, কাজের তুলনায় বেতন অনেক কম, তারপরও করার কিছু নেই। এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ তারা শেখেননি। এটাই করতে হবে তাদের।

বছরের অর্ধেকটা সময় কায়েতপাড়া অঞ্চলটি একসময় থাকতো জলমগ্ন। কৃষিনির্ভর এলাকার মানুষ বছরে মাত্র একবার ফসলের মুখ দেখার কারণে তাদের দিন কাটতো না খেয়ে। হঠাৎ করেই এলাকার আব্দুল মালেক আর ফটিক খান বন্দর এলাকার সোনাকান্দায় গিয়ে দেখতে পেলেন শীতলক্ষ্যার বুকে জেগে ওঠা সামান্য চরে তৈরি হচ্ছে ট্রলার। তাদের মাথায় চিন্তা ঢুকে তারাও তাদের প্রায় পতিত চরের জমিকে এভাবে কাজে লাগাতে পারেন। ভাবনা থেকেই তারা একাধিকবার দোহারে যান। কথা বলেন জাহাজ মালিকদের সঙ্গে। তারা সম্মত হলে ২০০৫ সালে পূর্বগ্রাম এলাকায় দুটি কারখানা চালু হয়। লাভের মুখ দেখায় একে একে গড়ে উঠলো অর্ধশত কারখানা। আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এলাকার মানুষ।

 

ছবি: আরমান হোসেন বাপ্পি