ঝুড়ি সমাচার

প্রাকৃতিক উপাদানের সহজলভ্যতা এবং পারিপার্শ্বিকতা সবসময়ই প্রভাবিত করে নিত্য ব্যবহার্য পণ্যদ্রব্যের গঠন ও অবয়বকে। একই বাঁশ সমতলে দ্রব্যাদি বহনের জন্য হয়ে যায় সাধারণ টুকরি বা ঝুড়ি, আর পাহাড়ি এলাকায় কালুং বা থুরুম। লক্ষ্য করলে দেখা যায় সাধারণ টুকরির বয়ন শুরু হয় গোলাকার ‘জো’ থেকে আর কালুঙ্গের ক্ষেত্রে চৌকোণা আধার।

মূলত এই সাধারণ ঝুড়ি, আর মুরগির খাঁচা বুনেই দিন কাটে দাসপাড়ার রমেশ, স্বপ্না, পপি, নিতাই, বিজয় আর সুমিদের। একেকটা বাড়ি যেন ঝুড়ি তৈরির কারখানা। বাড়ির ছেলে, বুড়ো, মেয়ে সবাই ঝুড়ি বুনতে পারে। গল্প করতে করতে, ঘরের অন্যান্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে বোনা হয়ে যায় ১০-২০টা ঝুড়ি। পিছিয়ে নেই ছোট্ট রাজকুমারও। ছোট্ট নরম হাতে অসংখ্য কাটাকুটি। অসম্ভব দ্রুততালে বুনে চলে একেকটি ‘জো’, মাত্র দেড় টাকার জন্য।

এই প্রক্রিয়ার প্রধান কাঁচামাল বাঁশ কিনে আনা হয় হাকিমপুর বাজার থেকে। প্রয়োজনভেদে ৩০ থেকে ৫০ টি বাঁশ লেগে যায় একেক কারিগরের। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশঝাড় থাকলেও না কিনে উপায় থাকেনা। এ অঞ্চলে সাধারণত তিন প্রকারের বাঁশ দেখা যায়- ঝাউ, ভাইরা ও তল্লাবাঁশ। এদের মধ্যে ভাইরা বাঁশগুলো ব্যবহৃত হয় ঘরের খুঁটি তৈরিতে আর ঝাউবাঁশ বেড়া তৈরি করতে। শুধুমাত্র তল্লাবাঁশ কাজে লাগে ঝুড়ি বুনতে। তাছাড়া বাঁশের জীবন চক্রও অনেকাংশে দায়ী। কোঁড় থেকে বেড়ে শক্ত মজবুত বাঁশ হতে তিন থেকে সাত বছর সময় লেগে যায়। ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে যায় কয়েক হাজার ঝুড়ি। বাঁশের তৈরি সকল পণ্যের মতই ঝুড়ি বোনার আগেও বাঁশকে মজবুত করার জন্য নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়ে। সবচেয়ে সহজ হল পানিতে ভিজিয়ে রাখা। নিজেদের পাড়ার পাশে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদীর বুকে তাই সবসময় কার না কারও বাঁশ ভেজানো থাকে। এছাড়া গাবের কষ এবং ধোঁয়া দেওয়া পদ্ধতিও বেছে নেয় কেউ। পর্যাপ্ত সময় ধরে ভেজানো হলে, বাঁশগুলো তুলে নিয়ে চিকন ফালিতে কেটে ফেলা হয়।

একটি ঝুড়িতে লাগে প্রায় ২৫টি বাঁশের ফালি। একটি কেন্দ্রবিন্দুতে তেরটি ফালি সজিয়ে প্রথম স্তর তৈরি করার পর, দ্বিতীয় স্তরে এদের মাঝে সাজানো হয় আরও ১২টি ফালি। একেকটি ফালির পুরুত্ব নির্ধারণ করে এর বাঁকানো আর মোচড়ানোর পরিমাণ। একটুখানি কম বেশিতে বদলে যায় পণ্য-সামগ্রীর গুণগত মান।

বোনার পরে বাড়িময় ছড়িয়ে থাকে বাঁশের মিষ্টি গন্ধ। কয়েকদিন রোদ পোহানোর পরে যত্ন করে তুলে রাখা হয় নির্দিষ্ট ঘরে। পেশার সাথে সামঞ্জস্য রাখতে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই থাকে পণ্যভান্ডার। ঘরের দাওয়া থেকে একটু উঁচু মেঝেওয়ালা ঘরে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয় প্রতিটি পণ্য। ক্রেতা বলতে আশেপাশের গ্রামের মানুষ। কখনো খুচরা, কখনো পাইকারি দরে কিনে নিয়ে যায় বাসা থেকেই। সারদিনের এই অক্লান্ত শ্রমের সামান্যই মূল্য পায় ওরা।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে শুধু ঝুড়ি কেন? বাঁশের তো আরও কত পণ্য আছে। খালুই, পলো, ধামা, পাটি সেসব বোনা হয় না কেন?

বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। আগে বর্ষাকালে নদীনালা, খালে বিলে পানি বেড়ে গেলে, থৈ থৈ জলে পড়ে যেত মাছ ধরার ধুম। মাছ ধরা এবং রাখার জন্য নিপুণ হাতে তৈরি হত খালুই। নিজেদের খাবার মত মাছ রেখে বাকিটা খালুই ভরেই বয়ে নেয়া হত বাজারে। সেই মাছ ও নেই, খালুই এর চাহিদাও শুন্যের কোঠায়।

 

চাষীর ছিল গোয়াল ভরা গরু আর উঠোন ভরা ধান। সারাদিন রোদে শুকিয়ে ধামা ভরে রাখা হত ধান। এখন ধান কাটার পরপরই মহাজন এসে বুঝে নিয়ে যায় পাওনা ধান। এমন অবস্থা যে, অবশিষ্ট ধানে সারা বছরের খোরাকীও মেটে না। ধামা আর লাগেনা কোন কাজে।

তাই ব্যবহারকারীর চাহিদা আর সহজ বিপণন কৌশলের জোরে আজও টিকে আছে দাসপাড়ার ঝুড়ি। বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত জ্ঞান আর নিষ্ঠার জোরে আজও পাঁচ-দশ গাঁয়ে সুনাম আছে এই ঝুড়ির।

অথচ একটু পৃষ্ঠপোষকতা আর পরিবর্ধন একে ঠাঁই করে দিতে পারে বিশ্ববাজারে। গ্রামীণ দারিদ্র্য দূর করার একটি স্বাধীন ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করে এর বিকাশ সাধন ডেকে আনতে পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।