ঢাকায় এলো রেল

কাশবনের মাঝখান দিয়ে বিলি কেটে এগিয়ে আসছে ট্রেন। একগাদা কালো ধোঁয়া ছেড়ে পঁ পঁ করে বাঁশি বাজিয়ে চলে যাচ্ছে লাই ধরে। আকাশে সাদা মেঘের ব্যাকগ্রাউন্ডে সে দৃশ্য দেখতে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে দুই ভাইবোন অপু-দূর্গা। সত্যজিত রায়ের পথের পাঁচালির অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য। যেন ধেয়ে আসছে সভ্যতার বার্তা বাহক; যান্ত্রিক ঝনঝনানির মাঝে পাওয়া যাচ্ছে আধুনিকতার আগমনী ধ্বনি। আর ওরকম শিশুর চোখে মুগ্ধ হয়ে দেখছি আমরা- দর্শক। আবিষ্কারের পর থেকেই অপার বিষ্ময়ে রেলগাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছে সবাই।

সাম্রাজ্যের প্রসারেই হোক কিংবা ব্যবসার পসারের জন্যই হোক, রেলগাড়ি বেশ আগেভাগেই এ মুল্লুকে এসে পৌঁছেছে। ভারতীয় উপমহাদেশ হয়ে বাংলা তথা ঢাকায় রেল আসার গল্পটাও বেশ পুরোনো। উপমহাদেশে রেলের আগমন ঘটে রেল আবিষ্কারের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। সে সুবাদে বাংলাদেশেও। ১৮৫৩ সালে ভারতে প্রথম রেল আসে। কলকাতা ও বোম্বে অল্প সময়ের ব্যবধানেই রেলের দেখা পায়।

১৮৬২ সালে ১৫ নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে প্রথম ট্রেন লাইন স্থাপিত হয় কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত। পরবর্তীতে সেটি গোয়ালন্দ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। রেললাইন কুষ্টিয়া পর্যন্ত থাকাকালে ঢাকার কমিশনার বাকল্যান্ডের তত্ত্বাবধানে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত স্টিমার চলতো। রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত চলে আসলে, স্টিমার গোয়ালন্দ-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল শুরু করে।

শুরু থেকেই ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে সরাসরি রেল সংযোগের চিন্তা করেছিল ব্রিটিশরা। সে লক্ষ্যে কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত রেললাইনের প্রস্তাব করা হয় ১৮৫৬ সালে। প্রমত্ত পদ্মার কারণে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার সরাসরি রেল সংযোগ তখন সম্ভব হয়নি।

কিছুটা দেরীতে হলেও, নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ঢাকায় প্রথম রেল চালু হয় ১৮৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে। এরপরে সেই লাইন বিস্তৃত হয় সে বছরই আগস্টে, ময়মনসিংহ পর্যন্ত। ঢাকা-ময়মনসিংহ স্টেট রেলওয়ে, প্রাদেশিক বাংলা সরকারের অধীনে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি নামে একটি বেসরকারী কোম্পানির তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের কওরাইদ পর্যন্ত মোট ১১টি স্টেশন পড়তো।

রেল-পূর্ব সময়ে নদীপথ ছাড়াও ঢাকা ময়মনসিংহের মধ্যে জয়দেবপুর হয়ে একটি রাস্তা (মূলত পায়ে চলার) ছিলো। ঢাকায় আসার জন্যে সাধারণ মানুষ ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে নৌকায় যাতায়াত করতো যা ছিলো সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য।

মূলত ১৮৭৭-এ প্রাদেশিক সরকার প্রথম ঢাকা ও তার চারপাশে রেল প্রতিষ্ঠার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৮৭৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ স্টেট রেলওয়ের আনুষ্ঠানিক জরিপ শুরু হয়। জরিপের নাম ছিল ‘ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলওয়ে সার্ভে ১৮৭৮’। সার্ভে করেছিলো মের্সাস মোলওয়র্থ অ্যান্ড ইংলিশ অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার্স; এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন ডব্লিউ ডব্লিউ ওয়ার্ডেন। উদ্দেশ্য ছিলো ঢাকার সঙ্গে গোয়ালন্দকে সংযুক্ত করা এবং ময়মনসিংহ পর্যন্ত লাইনটি সম্প্রসারণ করা। তাই জরিপের কাজ শুরু হয় পদ্মার পূর্ব পাড় থেকে। জরিপে আরিচা-ঢাকা, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-নারায়নগঞ্জ এই তিনটি পথ ও শাখা বিবেচনা করা হয়। আর মূল প্রস্তাবে তিনটি লাইন করার জন্যেই সুপারিশ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জে নদী সংলগ্ন রেললাইন।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ লাইন দুটির কাজ শুরু হয় যথাক্রমে ১৮৮২ ও ১৮৮৩ সালের ডিসেম্বরে। পরীক্ষামূলক পরিচালনার জন্যে ১৮৮৪ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লাইনটুকু প্রস্তুত হয়ে যায়। সে বছর জানুয়ারির ১ম সপ্তাহের পরীক্ষামূলক পরিচালনায় মোট যাত্রী ছিল ২ হাজার ১৭০ জন। প্রথম শ্রেণিতে ১৭ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩২ জন ও বাকিরা ছিল তৃতীয় শ্রেণির যাত্রী।

লাইনটি তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। সে সময়ে এই অংশের নির্মাণে খরচ পড়েছিলো ৭৬ লক্ষ ৮৩ হাজার ৭৩৩ টাকা। প্রতি মাইলে খরচ হয় ৮৯ হাজার ৭৪২ টাকা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লাইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি। লাইনটি ছিল ১০.২৫ মাইল দীর্ঘ।

ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল লাইনটি (৭৫.৫ মাইল) চালু হয় ১৮৮৫ সালের পয়লা আগস্ট। তবে কেবলমাত্র মালামাল পরিবহনের জন্যে। ধাপে ধাপে সেটি যাত্রী পরিবহনের জন্যেও খুলে দেয়া হয়। ১৮৮৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি লাইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বাংলার লেফট্যানেন্ট গভর্নর স্যার অগাস্টাস রিভার্স থম্পসন।

জরিপ করা অংশের দুটি শাখা তৈরি হয়ে গেলেও তৃতীয় শাখা, ঢাকা-আরিচা শাখাটি হল না। ইঞ্জিনিয়ার আর আমলারা তার কারণ হিসেবে বলেছিলো, ধলেশ্বরীর উপরে ১৮ লাখ টাকার সেতু বানাতে হবে, যা যথেষ্ট সময় ও অর্থকড়ির ব্যাপার। এছাড়াও এসব ছোট ছোট লাইন তখন সরকারের তত্ত্বাবধানে বেসরকারি কোম্পানিগুলোই তৈরি করতো। মূলত লাভের কথা চিন্তা করেই তারা এটা করত। লাইনের এ অংশে তাদের মনে হয়েছিল লাভ হবে না। কারণ যোগাযোগের জন্যে নদীপথই ছিল যথেষ্ট। তারা বরং সেটির উন্নতির জন্যে সুপারিশ জানায়।

এছাড়াও ততদিনে ঢাকা-গোয়ালন্দ-কোলকাতা বা নারায়ণগঞ্জ-গোয়ালন্দ একটি লাভজনক স্টিমার ও লঞ্চ রুটে পরিণত হয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই এই রিভার নেভিগেশন কোম্পানিগুলোর রেলের লাইন তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতো, তাদের এত বিপুল বিনিয়োগ করে ইতোমধ্যেই লাভজনক একটি রুটকে বদলানোর ইচ্ছা ছিলো না।

এর বাইরেও, মোটরগাড়ি ও বিশেষ করে মোটরবাসের প্রচলন রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত পৌছাতে ও যেখানে রেল নেই, সেসব স্বল্প দূরত্বে চলাচলে বেশ সাহায্য করেছিল। অন্যদিকে, তাদের সাথে রেলকে মাঝে মাঝে প্রতিযোগিতাতেও পড়তে হতো। ১৯২৭-২৮ সালের রেলওয়ে বোর্ডের রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ সড়কের জন্যে রেলওয়ে খানিকটা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩০০০-৪৫০০ টাকা প্রতি বছরে। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে রেলওয়ে এ লাইনে ৩টি অতিরিক্ত ট্রেন চালু করে। ফলে ক্ষতি কমেও আসে। তবে এ অবস্থা শুধুমাত্র যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলো, মালামাল পরিবহনে রেলওয়ের ব্যবহার ছিল একচেটিয়া।

ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে লর্ড কার্জনের আগমন

ঢাকার স্টেশনটি ছিলো ফুলবাড়িয়াতে, এবং সেটিকেই প্রায় শহরের শেষ সীমানা বলা যেত তখন। এরপরে শুরু হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, নতুন শহর ও রমনার বাগান। ১৯০৪ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জন ট্রেনে চড়ে ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশনে এসেছিলেন। তাকে সেখানেই সংবর্ধণা দেওয়া হয়।

ট্রেনের ইঞ্জিনগুলো শুরুতে ছিলো কয়লার স্টিম ইঞ্জিন, অনেক পরে পাকিস্তান আমলে সেগুলো বদলে ডিজেল ইঞ্জিন আনা হয়। ডিজেল ইঞ্জিল সীমিতভাবে বাংলাদেশে এসেছিল ১৯৫০-এর পরেই। কিন্তু স্টিম ইঞ্জিন সম্পূর্নরূপে বিদায় নেয় আরও ৩০ বছর পরে, ১৯৮৪-৮৫ সালে।

আগমনের পর থেকেই মালামাল এবং যাত্রী পরিবহনের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে ট্রেন। এখনও পন্য পরিবহনে রেলগাড়ির বিকল্প কেবলই রেলগাড়ি।

ছবিসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশিত ফটোগ্রাফিক অ্যালবাম অব ওল্ড ঢাকা

তথ্যসূত্র:

১। অনুপম হায়াৎ, ‘নবাব পরিবারের ডায়েরিতে সমাজ ও সংস্কৃতি’, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি, ২০০১

২। নাজির হোসেন, ‘কিংবদন্তির ঢাকা’, থ্রী স্টার কো-অপারেটিভ মালটিপারপাস সোসাইটি লিঃ, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৯৫

৩। শ্রী কেদারনাথ মজুমদার, ‘ঢাকার বিবরণ ও ঢাকা সহচর’, গতিধারা

৪। দিনাক সোহানী কবির, ‘পূর্ব বাংলার রেলওয়ের ইতিহাস ১৮৬২-১৯৪৭’, একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি,

৫। মীজানুর রহমান, ‘ঢাকা পুরাণ’, প্রথমা প্রকাশন

৬। খন্দকার মাহমুদুল হাসান ‘সেকালের ঢাকা’, শোভা প্রকাশ, ফেব্রুয়ারী ২০১২

৭। Azimusshan Haider, Dacca: History and Romance in Place Names: An Analytical Account of the Nomenclature of Roads and Localities in Dacca, with a Discussion of the Rationale for Their Retention Or Otherwise, Dacca Municipality, 1967