ঢাকায় রিকশার আগমন

শহর ঢাকার অনেক তকমা। যার মধ্যে আধুনিকতম বিশেষণ হলো ‘রিকশার শহর’। অলিতে, গলিতে, রাজপথে সবচেয়ে বেশি যে বাহন চোখে পড়ে তা এই রিকশা। যার সুবাদে ঢাকার নাম উঠেছে গিনেস বইয়ে। আবার রিকশার গায়ে আঁকা বর্ণিল চিত্রও এখন বিশ্বের শিল্প রসিকদের আগ্রহের বিষয়। নির্ভুল পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও জানা যায় বর্তমানে পাঁচ লক্ষেরও বেশি রিকশা চরে বেড়ায় ঢাকার রাজপথে। কেমন করে এই মনুষ্যবাহী এবং মনুষ্য চালিত যন্ত্রটি হয়ে গেল আমাদের প্রতিদিনকার বাহন তার রয়েছে এক বৈচিত্রময় ইতিহাস।
রিকশা শব্দটি জাপানি। মূল শব্দটি ‘জিন রিকিশা’ যার অর্থ মনুষ্য চালিত যন্ত্র। তাই বলে বাংলাদেশে রিকশা জাপান থেকে আসেনি। বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বেশ পরেই এসেছে। ঢাকায় রিকশার আগমণ ঠিক কবে, তা দিনক্ষণ ধরে বলা যায় না। জানা যায়, ১৯৩০-এর দশকেই ঢাকায় এসেছিলো রিকশা। তবে বাংলায় রিকশা সেই প্রথম নয়।

বাংলাপিডিয়াতে সিরাজুল ইসলাম সূত্র উল্লেখ না করে লিখেছেন যে বার্মা থেকে ১৯১৯-এর রিকশা এসেছিলো চট্টগ্রামে। এই হিসেবে বাংলাদেশে সেটিই প্রথম রিকশার আগমণ। এরপরেও ঢাকায় না, বরং নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের পাট ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কলকাতা থেকে রিকশা আনেন।

ঢাকা শহরে ১৯৪১-এ রিকশার সংখ্যা ছিলো ৩৭টি যা ১৯৪৭-এ বেড়ে হয় ১৮১টি (এ সংখ্যা দুটিও অসর্মথিত)। উল্লেখ্য, সব রিকশাই ছিল সাইকেল রিকশা বা প্যাডেল-রিকশা; হাতে টানা রিকশা লোকলজ্জার ভয়েই হয়তো আমদানি করা হয়নি। মানুষের ঘাড়ে চেপে আরেকজন মানুষ যাবে, এটি সমাজে গ্রহণযোগ্য ছিলো না তখনও।

ঢাকায় প্রথম রিকশার প্রচলন নিয়ে নানা কাহিনী, অভিজ্ঞতা ও তথ্য পাওয়া যায়। মুনতাসীর মামুন তাঁর ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী (২য় খণ্ড)-তে  সঠিক বলতে পারেননি বাংলাদেশে বা ঢাকায় কবে রিকশার যাত্রা শুরু। উনি মনে করেন, কলকাতায় রিকশার প্রচলন ১৯৩০-এর দিকে। বাংলাপিডিয়া ও গ্যালাগারের বইয়েও এমন তথ্য পাওয়া যায়। গ্যালাগারের সূত্র ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে রিকশা এসেছিল ১৯৩০ দশকের মাঝামাঝি, আর ঢাকায় ১৯৩৭-এ।

১৯৫০ এর দশক। সদরঘাটের রাস্তায় রিকশার আনাগোনা।

মোমিনুল হক চৌধুরীর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, ১৯৪০ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের পাট কোম্পানি রেলি ব্রাদার্সের এক কেরানী কলকাতা থেকে একটি রিকশা আনেন। এটিই তার (মোমিনুল হক চৌধুরী) মতে পূর্ববঙ্গের প্রথম রিকশা। প্রথম রিকশা মালিকের নাম যদু গোপাল দত্ত, চালকের নাম নরেশ। এরপরে যদুগোপাল দত্তের প্রতিবেশী শিশির মিত্র আরো ৪টি রিকশা আমদানি করেন। হাতে টানা কিছু রিকশাও আনা হয়েছিল তখন। তবে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে মিউনিসিপ্যালিটি তা বন্ধ করে দেয়। এ তথ্য সম্পূর্ণ সত্য নাও হতে পারে। কারণ এর আগেই রিকশার আগমনের কথা আরও নানা মানুষের স্মৃতিকথা ও কিছু রিপোর্টে পাওয়া যায়।

সত্যেন সেন তার শহরের ইতিকথায় বলেন, মোটামুটি ১৯৩৬-৩৭ সালের দিকে মৌলভীবাজারের দু জন ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের ফরাসি উপনিবেশ (চন্দননগর) থেকে দুটি সাইকেল রিকশা নিয়ে আসেন। তাদের একজন ছিলেন ডাক্তার। মৌলভিবাজারের মাংস পট্টির সামনে তার ডিসপেন্সারি ছিলো। তারা ব্যক্তিগত ব্যবহার নয়, বরং ব্যবসার উদ্দেশ্যেই আনিয়েছিলেন রিকশা। তবে তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হয়নি। অনেকেই রিকশায় চড়ে যেতে লজ্জা পেতেন। একজন মানুষের ওপরে চেপে আরেকজন যাচ্ছেন সেটা মেনে নিতে কষ্ট হতো বলে। রিকশা দুটির দাম পড়েছিলো ১৮০ টাকা। রিকশার হুড বা পর্দা ছিল না প্রথমে। এসবের প্রচলণ হয় আরও পরে।

এক রিকশায় গোটা পরিবার। ৬০ এর দশকে ঢাকা।

রব গ্যালাগার তার The Rickshaws of Bangladesh বইতে সেলিম রশিদের Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS) এর রিকশা শিল্পের উপরে একটি গবেষণার বরাতে বলেন যে, ১৯৩৮ সালে সূত্রাপুরের এক বাঙালি জমিদার এবং ওয়ারির একজন মারওয়ারি ভদ্রলোক ৬টি রিকশা কেনেন ও ঢাকায় ব্যবসার জন্যে চালানোর চেষ্টা করেন। এ গবেষণা মতেও নারায়নগঞ্জ ও ময়মনসিংহে রিকশার প্রচলন আরও আগে হয়েছিলো। ঢাকা ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় শহর যেখানে রিকশা চলা শুরু করে। এখানেও চট্টগ্রামের কোনো উল্লেখ নেই।

মূলত কলকাতা থেকে প্যাডেল স্টিমারে করে রিকশাগুলো আনা হয়। সেগুলো দেখতে মোটেই এখনকার রিকশার মতো ছিলো না। বর্ণনা দেখে মনে হয় সেগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশে তখন যে রিকশাগুলো চলতো তাই সরাসরি নিয়ে আসা হয়েছিলো। কলকাতার রাস্তাতেও একইরকম ঘটেছিলো। পরবর্তীতে ঢাকার মিস্ত্রীরা তাদের মত করে স্থানীয় সহজলভ্য যন্ত্রপাতি ও কাচামাল দিয়ে রিকশা নিজের মত করে বানিয়ে নেয়। প্রথম আনা রিকশাগুলো কালো চামড়ার চওড়া সিট ছিলো, যা ছিলো বর্তমানের তুলনায় আরামদায়ক, সাথে ছিলো খাকি হুড। ফ্রেম ছিলো লোহার, কাল বা সবুজ রঙের। ১৯৫০-এর আগে রিকশাতে রঙের বা সাজসজ্জার প্রচলন হয় নি।

ঢাকার রিকশার প্রচলন খুব সহজ হয়নি, বিশেষ করে হাতে-টানা রিকশা আসেই নি বলতে গেলে। রংপুর ও চট্টগ্রামে কিছু এসেছিলো বলে গ্যালাগার উল্লেখ করেছেন। মানুষও প্রথমে চড়তে আগ্রহী ছিলো না। ঢাকার তখনও ঘোড়ার গাড়ীর একছত্র দাপট। ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ানরা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে রিকশাচালকদের ছোলা-বুট, ডাল খেতে বলতো গায়ের জোরের জন্যে। তবুও রিকশার সংখ্যা বেড়ে চলেছিলো অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে। ১৯৪৪ সালে প্রথম রিকশার লাইসেন্স বিতরণ শুরু হয় এবং ১০০টি দেয়া হয় সে বছর। ১৯৪৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৫টিতে।

ঢাকা পুরাণ- এ মীজানুর রহমান ১৯৫০-এর দশকে গণপরিবহন কেমন ছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। ঢাকার প্রধান যানবাহন তখন ঘোড়ার গাড়ি আর রিকশা, বাস চলে দুই-একটি, আর ব্যক্তিগত গাড়ি প্রায় দেখাই যায় না। তার মতে ঢাকায় জনসংখ্যা তখন ৫-৬ লাখ। সাধারণ মানুষের জন্যে ছিল রিকশা আর স্কুল কলেজের মেয়েদের জন্যে ছিল ঘোড়ার গাড়ি (পর্দারক্ষার্থে)। সন্ধ্যার পরে সুনসান হয়ে যেত রাস্তাঘাট। সে সময় বাস ভাড়া ছিল এক আনা, ঘোড়ার গাড়ীর ভাড়া জনপ্রতি দুই আনা, আর রিকশার চার আনা। সদরঘাট থেকে নবাবপুর রেলগেট পর্যন্তও পরিবহন ব্যবস্থা ছিল রিকশা ও ঘোড়ার গাড়ি। ভাড়া চক-সদরঘাটের সমান।

ছবি: গুগল

তথ্যসূত্র: 

১। সত্যেন সেন, শহরের ইতিকথা, সত্যেন সেন রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড), বাংলা একাডেমি জুন ২০১৬

২। মুনতাসীর মামুন, ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী (২য় খণ্ড), অনন্যা

৩। মীজানুর রহমান, ঢাকা পুরাণ, প্রথমা প্রকাশন

৪. Rob Gallagher, The Rickshaws of Bangladesh, University Press Limited, 1992

৫. Dr. Salim Rashid, The Rickshaw Industry of Dhaka: Preliminary Findings, Bangladesh Institute of Development Studies, Dhaka, Research Report No. 51, June 1986

৬. Sirajul Islam, Rickshaw, Banglapedia,

৭. উইকিপিডিয়া