তাঁতিবাড়ির কথকতা

মাকুর ছন্দময় ঠুকুর-ঠাকুর শব্দ তুলে একমনে কাজ করে যান তাঁরা। কখনো তৈরি করেন জমকালো বেনারসি। কখনো বা নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় বের হয়ে আসে সূক্ষ্ম কাপড়ের ফালি। আবার কখনো প্রস্তুত করেন মোটা কাপড়ের গামছা কিংবা নিতান্তই সাধারণ লুঙ্গি। কাপড় তৈরির এই কারিগররা ‘তাঁতি’ নামে পরিচিত।

তাঁতযন্ত্র দিয়ে তুলা বা তুলা হতে উৎপন্ন সুতা থেকে কাপড় বানানো যায়। তাঁত বিভিন্ন রকমের হতে পারে। খুব ছোট আকারের হাতে বহনযোগ্য তাঁত থেকে শুরু করে বিশাল আকৃতির স্থির তাঁত রয়েছে। সাধারণত তাঁতযন্ত্রে সুতা কুণ্ডলী আকারে টানটান করে ঢুকিয়ে দেওয়া থাকে। যখন তাঁত চালু করা হয়, তখন নির্দিষ্ট সাজ অনুসারে সুতা টেনে নেওয়া হয় এবং সেলাই করা হয়। তাঁতের আকার এবং এর কলাকৌশল বিভিন্ন রকমের হতে পারে। বাংলা তাঁতযন্ত্রে ঝোলানো হাতল টেনে সুতা জড়ানো মাকু আড়াআড়ি ছোটানো হয়। ‘তাঁত বোনা’ শব্দ দুটি এসেছে ‘তন্তু বয়ন’ থেকে। যাঁরা তাঁত বোনেন, তাঁরাই তাঁতি। ঐতিহ্যবাহী এ পেশার ধারকেরা তাঁদের মনের শৈল্পিক ভাবনা নিয়ে আসেন কাপড়ে। যুগ যুগ ধরে এ পেশায় জড়িত আছেন তাঁতিরা। হাত ও পায়ের সাহায্যে তাঁতযন্ত্র পরিচালনা করে বস্ত্র তৈরি করেন তাঁরা। তারপর মনের রং মিশিয়ে শিল্পসম্মতভাবে নানা ডিজাইন করে সাজিয়ে তোলেন শাড়ির জমিন কিংবা পাড়। সেখানে ফুটে ওঠে ফুলেল নকশা বা ঐতিহ্যবাহী কলকি।

গোড়ার কথা

বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের ইতিহাস অতি প্রাচীন। দেশের সর্ববৃহৎ কুটির শিল্প বা লোকশিল্প এটি। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে এ দেশের সংস্কৃতি। তাঁতশিল্প গড়ে উঠেছিল আমাদের নিজস্ব বানানো তাঁতযন্ত্র এবং নিজেদের তুলা দিয়ে। দৈনন্দিন ব্যবহার্য কাপড়ের চাহিদা পূরণের জন্যই তাঁতি সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল। চর্যাপদে তাঁতিদের জীবনপ্রণালি, কাজের গতিপ্রকৃতি, তাঁদের পেশার শৈল্পিক উপস্থিতি প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ আছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে স্নিগ্ধা, দুকুল, পাত্রনন্দা ইত্যাদি নামের কিছু মিহি সুতার উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের আবিষ্কার থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে বাংলা সুতিবস্ত্র উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। বাংলায় বস্ত্রশিল্পের সস্তা উপকরণ তুলে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে ঢাকার মসলিন রোমে সুখ্যাতি ও বিপুল কদর লাভ করে। বাংলায় বিভিন্ন ধরনের মসলিন তৈরি হতো। এ ছাড়া অন্যান্য মিহি সুতার কাপড়ও তৈরি হতো। এসব বস্ত্রসহ বাংলার অন্যান্য অনেক কাপড় বুনন, সৌন্দর্য, কারুকাজ, নমনীয়তা ও স্থায়িত্ব বিবেচনার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।

একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের কারিগররাই তাঁতি পেশায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ পর্যন্ত এই পেশার লোকজন আশ্বিনী তাঁতি নামে পরিচিতি ছিল। তাঁরা অন্যদের চেয়ে জাতে কিছুটা উঁচু ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে আশ্বিনী বা আসান তাঁতিরা দাবি করেন যে তাঁরাই আসল তাঁতি। অন্যরা হচ্ছে তাঁদের উপগোত্র। এ দলের তাঁতি মহিলারা নাকে নোলক পরতেন। এটি ছিল তাঁদের সামাজিক স্বাতন্ত্র্যের নিদর্শন।

তাঁতিরা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পেশার অনুসারী। তাঁরা বিভিন্ন উপাধি, যেমন বসাক, নন্দী, পাল, প্রামাণিক, সাধু, সরকার, শীল প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। বসাক উপাধি এসেছে ধনাঢ্যদের কাছ থেকে। তাঁরা বুনন কাজ করার মাধ্যমে কাপড় ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছেন। ১৯২০-এর প্রথমার্ধে শহুরে তাঁতিদের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির একদল তাঁতি পূর্ববঙ্গে এসে আবাস গড়েন। তাঁদেরই বাংলার আসল তাঁতি বংশোদ্ভূত বলে গণ্য করা হয়। কথিত আছে, তাঁরাই সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের আগে সুতি কাপড় সরবরাহ করতেন।

কালের পরিক্রমায় তাঁতিদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাঁদের পেশাগত চরিত্রও বিবর্তিত হতে থাকে। মোগল আমলে হিন্দু ও মুসলিম- উভয়েই এ পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলো। ১৫১৮ সালের দিকে দুয়ার্তে বারবোসা নামের একজন পর্তুগিজ পরিব্রাজক বাংলা ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর লেখায় সে সময়ের বিশিষ্ট কিছু কাপড়, যেমন, মেমোনা, চওলারি, চিনিবাপা, বালিহা ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন এবং কর্তৃত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেশজ কাপড়ের উন্নয়নের লাগাম টেনে ধরে। ১৭৭৩ সালে মি. রোজ জানান, তাঁতিরা সাধারণত ভীরু প্রকৃতির ও অসহায়। তাঁদের অধিকাংশই দুরবস্থায় পতিত। তাঁরা হিসাব-নিকাশ রাখতে অক্ষম। জন্মগতভাবে পরিশ্রমী হলেও নিজেদের ওপর নির্ভর করতে পারেন না বলে অসহায়ত্বের শিকার। তবু তাঁরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী কাজে সন্তুষ্ট। তাঁরা তাঁদের পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার্থে কোনোরকমে উপার্জন করে সততার সঙ্গে কাজ করে যান।

এক শতাব্দী আগে বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘোরে বুনন মেশিন বা চরকা ছিল। স্বদেশি আন্দোলনের সময় যখন বিদেশি পণ্য বর্জন করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জাতীয় কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছিল, তখন বিলেতি ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়ে। সে সময় তাঁতবস্ত্রের উন্নয়ন ঘটার একটি সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৪৭ সালে বিলেতি শাসনের শেষদিকে ভারতে তাঁতশিল্পে ঝলমলে ফ্যাশনের পুনর্বিকাশ ঘটতে শুরু করে।

হিন্দু ও মুসলমান- উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁতিদের দেখা পাওয়া যায়। মুসলমান তাঁতিদের বলা হতো জোলা। এই জোলা তাঁতিদের সংখ্যাধিক্য ছিল টাঙ্গাইল, কালিহাতী ও গোপালপুর এলাকায়। আবার যুগী বা যুঙ্গীদের নাথপন্থী এবং কৌলিক উপাধি হিসেবে দেবনাথ বলা হয়। মোটা কাপড় বোনার কাজে এদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। সুতা কাটার চরকা তাঁদের প্রত্যেক পরিবারেই ছিল এবং পুত্র-কন্যাসহ পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই সুতা কাটা ও কাপড় বুনতে সারা দিন ব্যস্ত থাকতেন। টাঙ্গাইল, কালিহাতী ও গোপালপুর এলাকায় যুগী সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। যুগীরা গামছা, মশারি তৈরি করে প্রায় স্বাধীনভাবেই ব্যবসা চালাতেন।

আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় তাঁতশিল্প গড়ে উঠেছিল টাঙ্গাইল জেলায়। এ ছাড়া বৃহত্তর পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলায়ও এ শিল্প সমৃদ্ধি লাভ করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই হচ্ছে টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি। অর্থাৎ, আদিকাল থেকেই তাঁরা তন্তুবায়ী গোত্রের লোক। তাঁদের একশ্রেণীর যাযাবর বলা চলে। এঁরা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এসে বস্ত্র বয়ন শুরু করেন। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়ায় শাড়ির মান ভালো না হওয়ায় চলে আসেন রাজশাহী অঞ্চলে। সেখানেও আবহাওয়া অনেকাংশে প্রতিকূল দেখে বসাকরা দুই দলে ভাগ হয়ে একদল চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, অন্যদল ঢাকার ধামরাইয়ে। এদের একটি অংশ সিল্কের কাজে যুক্ত হয়ে রাজশাহীতেই থেকে যায়। ধামরাইয়ে কাজ শুরু করতে না করতেই বসাকরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়েন। ফলে ভাগ হয়ে অনেক বসাক চলে যান প্রতিবেশী দেশের চৌহাট্টা অঞ্চলে। এর পর থেকে বসাক তাঁতিরা চৌহাট্টা ও ধামরাইয়া- এ দুই দলে স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ধামরাই ও চৌহাট্টায় তন্তুর কাজ ভালোই হচ্ছিল। তবে আরও ভালো জায়গায় খোঁজ করতে করতে অনেক বসাক টাঙ্গাইলে এসে বসতি স্থাপন করেন। এখানকার আবহাওয়া তাঁদের জন্য অনুকূল হওয়ায় পুরোদমে তাঁত বোনার কাজে লেগে পড়েন। পরে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরাও তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। টাঙ্গাইলে বংশানুক্রমে যুগের পর যুগ তাঁরা তাঁত বুনে আসছেন। এককালে টাঙ্গাইলে বেশির ভাগ এলাকাজুড়ে বসাক শ্রেণীর বসবাস ছিল, তাঁরা বসাক সমিতির মাধ্যমে অনভিজ্ঞ তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দান ও কাপড়ের মান নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগ ও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর অনেক বসাক তাঁতি ভারত চলে যান। এ সময় বসাক ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকও তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাঁরা বসাক তাঁতিদের মতোই দক্ষ হয়ে ওঠেন। টাঙ্গাইল ছাড়াও এ দেশের কিছু অঞ্চল যেমন, নরসিংদী, ডেমরা, শাহজাদপুর, কুমারখালী, বাবুরহাট, গৌরনদী, রুহিতপুর এবং নাসিরনগর বয়নকার্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। কাপড়ের গুণগত বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ দেখা যায় অঞ্চলভিত্তিক কাপড় উৎপাদনে। রাজশাহীর সিল্ক, টাঙ্গাইল ও পাবনার সুতি শাড়ি, মিরপুরের কাতান ও জামদানি, ডেমরার বেনারসি এবং নরসিংদীর লুঙ্গি, গামছার খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। এ ছাড়া মণিপুরী, রাখাইনদের তাঁতের বোনা বিভিন্ন রং ও নকশার শাড়ি ও কাপড় বেশ নাম করেছে। তাঁতিরা বেশির ভাগই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন এবং বর্তমানে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোটাই বাণিজ্যকেন্দ্রিক। তাঁরা গ্রামের যে অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন, তাকে তাঁতিপাড়া বলে।

আগেরকার দিনে হস্তচালিত তাঁতের সাহায্যে তাঁতবস্ত্র তৈরি করার জন্য চরকা বা সুতা কাটার টাকু ব্যবহার করা হতো। আজকাল পর্যাপ্ত পরিমাণে মেশিন তৈরি হচ্ছে। ফলে চরকা প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। এখন বয়নকারীরা শুধু নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবহারোপযোগী চলতি মানের সস্তা গামছা, গেঞ্জি, লুঙ্গি এবং শাড়ি প্রস্তুত করছেন।

তাঁতিদের জীবনযাপন

তাঁতিদের আগেকার সেই জৌলুস এখন আর নেই। জগদ্বিখ্যাত সেসব ঐতিহ্যবাহী কাপড় হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। তাঁতিদের কারখানায় এখন মানের দিক থেকে উৎকৃষ্ট বিবেচিত কাপড় প্রায় দুষ্প্রাপ্য। কাপড় তৈরির কারিগররা এখন সাধারণ মানুষের আটপৌরে ব্যবহারের কাপড় তৈরি করেই তাঁদের পেশা জিইয়ে রেখেছেন। আবার প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলেও হুমকির মুখে পড়েছে তাঁদের পেশা। আধুনিক মেশিনে কম সময় ও কম খরচে তৈরি হচ্ছে কাপড়। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক তাঁতি। অনেকে আবার দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতিদের কাছ থেকে জানা গেল তাঁদের জীবনযাপন সম্পর্কে।

টাঙ্গাইল

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তাঁতশিল্প টাঙ্গাইলে। প্রাচীনকাল থেকে টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা তাঁদের বংশপরম্পরায় তৈরি করছেন নানা জাতের কাপড়। টাঙ্গাইলের তাঁতিরা একসময় মসলিন শাড়ি বুনতেন বলে শোনা যায়। টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, নাগরপুর, সখীপুর উপজেলা হচ্ছে তাঁতবহুল এলাকা। তা ছাড়া ভূঞাপুর উপজেলায়ও তাঁতশিল্প রয়েছে। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল বাজার, নলসোধা, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, বামনকুশিয়া, ঘারিন্দা, গোসাইজোয়াইর, তারটিয়া, নলুয়া, দেওজান, এনায়েতপুর, বেলতা, গড়াসিন, সন্তোষ, নলসুন্দা, কাগমারী প্রভৃতি গ্রামে রয়েছে তাঁত। পাথরাইল বাজারে ঢুকতেই নাকে আসে রঙিন সুতার গন্ধ। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল নারী-পুরুষ সবাই ব্যস্ত তাঁত বুনতে। পুরুষেরা তাঁত বুনছেন আর চরকা কাটা, রং করা, জরির কাজে সহযোগিতা করছেন বাড়ির মহিলারা। তাঁরা জানালেন, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে তাঁত বোনার কাজ। উৎসব সামনে থাকলে আরও বেশি সময় দিতে হয় কাজে। বৃদ্ধ তাঁতি মজিবর জানান, যুদ্ধের পর থেকেই তিনি আছেন এ পেশায়। একেক শাড়িতে একেক রকম মজুরি পাওয়া যায়। তবে সপ্তাহে কয়েক হাজার টাকা পাওয়া যায়। এটুকু দিয়েই স্ত্রী, দুই ছেলে আর এক মেয়ের পরিবারকে টানার চেষ্টা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে খারাপ কাটছে না দিন। তবে উল্টো চিত্রই যেন প্রকট হয়ে দেখা দিল। তাঁতি মরিয়ম বেগম জানান, সুতার দাম বেড়েছে। কিন্তু লাভ গুনছে মহাজনরা। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপদে পড়েছেন তাঁরা। কারিগর ও মহাজনদের মধ্যে লভ্যাংশের অসম বণ্টন আর শ্রমিকের অভাবে তাঁতশিল্পের আগাম দিনগুলো নিয়ে সংশয়ে পড়েছেন বেশির ভাগ তাঁতশিল্পী। বর্তমান সরকারের আমলে দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে সুতার মূল্যসীমা নাগালের বাইরে আসায় চরম বিপর্যয়ে পড়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প।

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার কৈজুরি গ্রামে মর্জিনা বেগমের বাড়ি। স্বামী তরফ আলী তাঁতের কাজ করতেন। তাঁর আয়ে অনেক কষ্টে চলত সংসার। সংসারের পাশাপাশি স্বামীকে সাহায্য করতেন। অল্পদিনেই তাঁত বুননসহ অন্যান্য কাজ শিখে ফেলেন। মাঝে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তরফ আলী। কোনো কাজ করতে পারেন না। কোনো উপায় না দেখে নিজেই তাঁত হাতে তুলে নেন মর্জিনা। তিনি জানান, তাঁত চালানোর জন্য পুঁজি হিসেবে কয়েক দফায় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেন। তৈরি শাড়ি বিক্রি করে তেমন লাভ না পাওয়ায় মজুরি হিসেবে বুননের কাজ করেছেন। দেড় বছর চলেছে এ অবস্থা। এখানে নিজের পছন্দের কোনো মূল্য নেই। মহাজনের চাহিদামতো কাপড় বা ওড়না বানাতে হয়। পাঁচ হাত ওড়না বুনে মজুরি পান ৭০ টাকা। সাত দিনে সর্বোচ্চ ১০টি ওড়না বানানো যায়, জানালেন মর্জিনা বেগম। মর্জিনা আক্ষেপ করে বলেন, ‘পরিশ্রম করি আমরা, লাভ পাচ্ছে অন্যরা। মহাজনরা যা বোঝায়, আমরা তা-ই বুঝি। আমরা যদি সোজা ক্রেতাদের কাছে কাপড় বেচতে পারতাম, তাহলে দুজনেরই লাভ হতো।’

মালিকেরা জানালেন, সেতু, ছাইহাম, উত্তরা, কটন, জরি, রেয়ন, পাকুয়ানসহ সব ধরনের সুতার দাম তাঁদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ফলে তাঁতমালিকেরা উচ্চ দামে সুতা কিনতে না পেরে অনেকে তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। বিশ্ববাজারে সুতার দাম যতটা না বাড়ছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে দেশীয় বাজারে। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন তাঁতশিল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তাঁতের শাড়ির চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক তাঁতঘরে তালা ঝুলছে। উচ্চ মূল্যে সুতা ক্রয়, অতিরিক্ত শ্রমিক মজুরি, রং, প্যাকিং, বিদ্যুৎ বিলসহ পরিবহন খরচ মিলিয়ে একটি কাপড় তৈরি করে বাজারে ৫০ টাকা ক্ষতিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।

দিনাজপুর

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর ও খানসামা উপজেলার ১৩টি গ্রামে তদানীন্তন ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠে বৃহত্তর রানীরবন্দর তাঁত শিল্পাঞ্চল। সেই থেকে তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে রানীরবন্দরের পরিচিতি ছিল দেশজুড়ে। এখানকার সুদক্ষ তাঁতশিল্পীদের হাতে উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, মশারি এবং গুলটেক্স চাদর জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে ছোট-বড় দুই শতাধিক তাঁতশিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০ হাজার মানুষ।

তবে সেই অতিপরিচিত তাঁতের মাকুর ঠুকঠুক শব্দ আর আগের মতো শোনা যায় না। মাকুর ঠুকঠুক শব্দে ভোররাতে মানুষের ঘুমও ভাঙে না। দিনাজপুরে তাঁতশিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা, সুদক্ষ তাঁতশিল্পী, সহজলভ্য শ্রমিক থাকা সত্ত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া, বাজারজাতের অভাব এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় এই শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে অতি মানবেতরভাবে জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে যে কটি তাঁত চালু অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তাঁতশ্রমিকেরা জানান, একটি শাড়ি তৈরি করে মজুরি পাওয়া যায় ৪০ টাকা। সারা দিনে তিনটি শাড়ি তৈরি করে আয় হয় ১২০ টাকা। সামান্য এই আয় দিয়ে অগ্নিমূল্যের বাজারে সংসার আর চলছে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

একসময় বাঞ্ছারামপুর উপজেলা তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাঁতশিল্পের কারণে এই এলাকা ছিল বেশ জমজমাট। বর্তমানে নানা কারণে এক এক করে তাঁতশিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর সে জন্য তাঁতিরাও পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। উপজেলার ফরদাবাদ, রূপসদী, ভেলানগর, সলিমাবাদ, বাঁশগাড়ী, হুগলাকান্দি, আইয়ুবপুর, সোনারামপুর, ডুমরাকান্দি, বাহেরচর, উলুকান্দি, আকানগর, তেজখালী, বিষ্ণুরামপুরসহ উপজেলার ৩২টি গ্রামে তিন হাজার ১৬২টি তাঁতের কারখানা আছে। তবে এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার কারখানাই এখন বন্ধ আছে। বিভিন্ন দৈন্যদশার মধ্যেও চালু আছে হাজার খানেক তাঁত কারখানা। তাঁতশ্রমিকেরা জানান, উপজেলার ৩২টি গ্রামে তাঁতিরা লুঙ্গি ও গামছা তৈরি করেন। তাঁদের উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র বিক্রি হয় নরসিংদীর বাবুরহাটে। এটি তাঁদের তাঁতবস্ত্রের প্রধান হাট। উৎপাদিত পণ্য নৌকাযোগে বাবুরহাটে নেওয়া হয়।

প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব, শ্রমিক-সংকট, সুতা ও রঙের মূল্যবৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা ও শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে বন্ধ হয়ে গেছে দুই সহস্রাধিক তাঁতকল। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার শ্রমিক। অনেকে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছে, কেউ বা পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। রূপসদী গ্রামের তাঁতশিল্পী খসরু মিয়া বলেন, তিনি ১৪ বছর ধরে জড়িয়ে আছেন এ কাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, অর্ধেক মাস কাজ আর বাকি অর্ধেক মাস বিশ্রাম করেন। শরীরও চায় না আর আগের মতো কাজ করতে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, তাঁতে কাজ করে যে মজুরি পান, তা দিয়ে সংসার চলে না। তাঁদের তৈরি লুঙ্গি-গামছা শোরুমে চড়া মূল্য বিক্রি হলেও তাঁতিদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার জন্য এ এলাকার অনেক তাঁতি জাত পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। কেউ কেউ খেয়া নৌকা বা দিনমজুরের কাজ করছেন। কেউ কেউ চলে যাচ্ছেন বিদেশে। অন্যদিকে চালু থাকা তাঁতগুলোও নিয়মিত লোকসানের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তাঁতশিল্পী হিরণ মিয়া, বাকির ও হোসেন মিয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে ববিন ও মাকু কিনে এনে স্থানীয়ভাবে বাঁশ ও কাঠের তাঁত তাঁরা নিজেরাই তৈরি করেন। তাঁদের অভিযোগ, তাঁতশিল্পের ওপর কোনো প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি। তাঁতমালিক কালা মিয়া বলেন, ৪০ বছর ধরে এ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু দিন দিন তাঁতশ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাঁতকল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্ষাকালে অন্য কাজ না থাকায় শ্রমিকেরা তাঁতের কাজে আগ্রহী হন। ফলে বর্ষায় উৎপাদন বাড়ে।

নারায়ণগঞ্জ

১৯৭৫ সালে এখানে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার জামদানি তাঁতি ছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল প্রায় দেড় লাখ মানুষ। নারায়ণগঞ্জ জামদানি তাঁতশিল্প শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্র জানায়, নব্বইয়ের দশকে এসে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬০ হাজারে। আর বর্তমানে দেড় হাজার পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

আশি বছরের বৃদ্ধ জামদানিশিল্পী আবদুল গফুর মিয়া বলেন, ‘অহন আর জামদানি কারিগররা ভালা নাই। হগল সমস্যা জামদানি কারিগর গো।’ তাঁতশিল্পী চম্পা, আনোয়ারা। তাঁরা জামদানি তৈরি করলেও নিজেরা জামদানি পরতে পারেননি। এ নিয়ে তাঁদের আক্ষেপ, ‘কাপড় বুইন্নাই গেলাম, পরবার পারলাম না।’ সুতা, জরি, রঙের দাম তদুপরি সহকারীদের বেতন-খাওয়া-দাওয়ার খরচ মিটিয়ে লাভ মেলে না তাঁতিদের। ভারত থেকে আসা শাড়ির দাম কম হওয়ায় বেশি দামে জামদানি শাড়ি কেউ কিনতে চায় না। এসব জানিয়ে নোয়াপাড়া এলাকার জামদানিশিল্পী মনির হোসেন বলেন, ‘কোনো লাভ নাই। বাপ-দাদাগো পেশা তো, তাই ছাড়বার পারি না।’

সিলেট

সিলেট বিভাগের ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী তাঁতশিল্প বিখ্যাত দেশজুড়ে। মণিপুরীদের তাঁতে বোনা শাড়ি, চাদর, কার্ডিগান, ব্যাগসহ বিভিন্ন বস্ত্রের চাহিদা রয়েছে। বিভিন্ন মেলায়ও মণিপুরীদের হাতে তৈরি পোশাক ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মণিপুরী তাঁতশিল্পের অধিক প্রসার মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায়।

তবে তাঁতিদের দিন ভালো যাচ্ছে না। কমলগঞ্জের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মণিপুরী। এখানকার মণিপুরীদের মধ্যে দুটি সম্প্রদায় আছে- বিষ্ণুপ্রিয়া ও মাতৈ। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া প্রধান। কমলগঞ্জের মোট নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে আদমপুর, আলীনগর, কমলগঞ্জ, মাধবপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নে মণিপুরীর সংখ্যা অনেক। অন্যান্য ইউনিয়নে বিচ্ছিন্নভাবে মণিপুরীদের বসবাস। তিলকপুর মণিপুরী-অধ্যুষিত একটি গ্রাম। এ গ্রামে প্রায় দুই হাজার লোকের বসতি। এরা সবাই মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়ের। এই গ্রামে প্রায় ৮০টি পরিবার আছে যার সবাই তাঁতি। কিন্তু অধিকাংশ তাঁতই বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। সারা গ্রামের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত কোনো তাঁত নেই। শুধু ঐতিহ্য ও পারিবারিক চাহিদা পূরণের জন্য তাঁতগুলো বসানো আছে। এরই মধ্যে আবার অনেকেই তাঁতের ব্যবসা ছেড়েও দিয়েছেন। একই অবস্থা বাকি সব ইউনিয়নে। সারা উপজেলার প্রতিটি মণিপুরী ঘরেই তাঁত বসানো আছে।

কমলগঞ্জের তাঁতশিল্প শিল্প হিসেবে গড়ে না ওঠার প্রধান কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য। এ ব্যাপারে তিলকপুর গ্রামের প্রবীণ তাঁতশিল্পী সুভাসিনী সিনহা বলেন, প্রাথমিকভাবে একটি পারিবারিক ক্ষুদ্র তাঁত কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সর্বনিম্ন একটি তাঁত মেশিনের দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং এক বান্ডিল সুতার দাম কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা। মোট ৩৫ হাজার টাকার প্রয়োজন। কিন্তু এত টাকা একসঙ্গে সংগ্রহ করা দরিদ্র তাঁতিদের পক্ষে সম্ভব নয়। এখানকার তাঁতিরা খুবই দরিদ্র। এই তাঁতিদের মধ্যে আবার ভূমিহীন রয়েছে। এ ছাড়া উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করারও সমস্যা আছে। এখানে তাঁতে উৎপাদিত পণ্যের নির্দিষ্ট কোনো বাজার নেই। যে সামান্য তাঁতের কাপড় উৎপন্ন হয়, তা মহাজনের ঋণের টাকায় হয়। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদিত পণ্য মহাজনের লোকজন এসে অতি অল্পমূল্যে কিনে নিয়ে যায়। এসব কারণে এখানে এ শিল্পের কোনো বিকাশ হচ্ছে না। তবে সুহাসিনী দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, এ শিল্প কোনো দিনই বিলুপ্ত হবে না। কারণ, এটা মণিপুরীদের ঐতিহ্য। অন্যদিকে উপজেলার মঙ্গলপুর গ্রামের প্রবীণ তাঁতি বিদ্যাধন শর্মা বলেন, এই দৈন্য চলতে থাকলে একসময় এ শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

কক্সবাজার

শুরু থেকে রাখাইনপল্লীর ঘরে ঘরে হস্তচালিত তাঁতশিল্প চালু হয়। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকে একে একে এই শিল্প বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। চকরিয়ার রাখাইন নারীদের হাতের তৈরি থামি লুঙ্গি, চাদর, বেড শিটসহ নানা রকম কাপড় একসময় কক্সবাজারের ঘরে ঘরে জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু সেসব কাপড় এখন তেমন চোখে পড়ে না। এখানকার হাটবাজার দখল করে নিয়েছে মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানা কাপড়।

রাখাইনরা তাঁদের বসবাসের ঘরের নিচে তাঁত বসিয়ে কাপড় বোনে। বর্তমান বাজারে একটি লুঙ্গি তৈরি করতে ১০০ থেকে ৪০০ ও একটি ব্যাগ তৈরি করতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। এসব সামগ্রী এখানে আসা পর্যটকদের মন সহজেই কেড়ে নেয়।

একসময় নারীরা কাপড় তৈরি করতেন আর পুরুষেরা তা হাটবাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁরা নিজেদের পোশাক চমৎকার বুননশৈলীর মাধ্যমে নিজেরাই তৈরি করে নিতেন। জানা গেছে, কাপড় তৈরির উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, মূলধন-সংকট, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এরই মধ্যে উপজেলার চারটি রাখাইনপল্লীর প্রায় এক হাজার তাঁতের মধ্যে ৮০০টি বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ২০০টিও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে পাঁচ শতাধিক রাখাইন পরিবারের প্রায় তিন হাজার নারী-পুরুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় রাখাইন নারীরা জানান, দুই দশক আগেও তাঁরা বংশানুক্রমে তাঁদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাপড় বুনতেন তাঁতে। পুরুষের লুঙ্গি, মেয়েদের থামি, নানা রকমের নকশা করা চাদর, ওড়না, গামছা ও থলে নিজেদের ব্যবহার ছাড়াও অন্যদের চাহিদা পূরণ করত। এখন নিজেদের পরনের কাপড়ও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। কয়েকজন তাঁতশিল্পী জানান, কাপড় তৈরির উপকরণের (সুতা, রং) দাম বাড়া, মূলধন-সংকট, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং মিয়ানমার থেকে আসা কাপড়ে দেশীয় বাজার ছেয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় তাঁতপণ্যের চাহিদা কমে গেছে। লোকসানের কারণে অনেকে তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকে জীবিকার সন্ধানে বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজার শহরে পাড়ি জমিয়েছেন।

শেরপুর

এখানকার আদিবাসীদের শতকরা ৯০ ভাগই কোচ। প্রায় প্রতি বাড়িতেই কোচ মেয়ে শিল্পীরা তাঁদের বাপ-দাদার আমলের ঐতিহ্যবাহী বানাতাকতো তাঁতের মাধ্যমে অবসরে কাপড় বোনায়। অধিকাংশ বাড়িতে হাতে বোনা চিকন বাঁশ টানার খটখট শব্দ যেন পাখির কিচিরমিচির শব্দকে হার মানায়।

ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৭-৮ কিলোমিটার উত্তরে নওকুচি ও রাংটিয়া গ্রামের অবস্থান। নওকুচি গ্রামের মোড়ল ধীরেন্দ্র কোচ এবং রাংটিয়া গ্রামের জাগেন্দ্র কোচের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ৫০-৬০ বছর আগে থেকে হয়তো বাঁশের তৈরি তাঁতে কাপড় বোনার প্রচলন শুরু হয়। খটখটি তাঁত বসানো থাকে বাড়ির আঙিনায় বড় বড় গাছের নিচে। তাঁতশিল্পী কোচনি বসেন কাঠের পিঁড়িতে। পাশে রাখা হয় পানের বাটা, তারপর বাঁশের নাছিতে সুতা ঢুকিয়ে চিকন বাঁশের সাহায্যে সমানতালে টেনে টেনে সুতা চাপানো হয় সামনের দিকে।

আর বাঁশের নলি দিয়েই সুতা বোনা হয় কাপড়ে। এভাবেই ৮-১০ দিনের দুটি পাঁচ হাত লম্বা কোচনি শাড়ি তৈরি হয়, যার খরচ পড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। কোচনির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুতার অগ্নিমূল্য এবং অর্থ-সংকট না থাকলে তাঁরা এ তাঁতের সাহায্যেই গামছা, লুঙ্গি, বিছানা ও গায়ের চাদর বুনতে পারেন।

শেরপুরের জামদানিও বিখ্যাত। জেলা শহর থেকে পশ্চিম দিকে ৭ কিলোমিটার দূরের গ্রাম চরশেরপুরে গড়ে উঠেছে জামদানি শাড়ি তৈরির কারখানা। নারায়ণগঞ্জের জামদানিপল্লীতে কাজ করা এক শ্রমিক এলাকায় এসে নিজেই গড়ে তুলেছেন এই জামদানি কারখানা। গ্রামের মানুষ এই জামদানি কারখানাকে ঘিরে দেখছে নতুন স্বপ্ন। খুঁজছে নতুন সম্ভাবনার পথ। ১৮টি হাতে বোনা তাঁতে কারিগর ও সহকারী মিলে ৪০ জন শ্রমিক ছাড়াও অর্ধ শতাধিক লোক কাজ করছেন এই কারখানায়।

ববিতা বেগম নামের একজন কর্মী জানায়, তারা তিন ভাইবোন এখানে কাজ করছে। বাবা ভ্যানচালক। চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর সামর্থ্য না থাকায় বাবা-মা তাদের পড়াতে পারেননি। এখানে তাঁত হওয়ায় কাজ শিখে দুই বছর ধরে তারা কাজ করছে। ঝিনাইগাতী উপজেলার আহমদনগর গ্রামের সজীব মিয়া বলেন, আগে নারায়ণগঞ্জে কাজ করতেন। এখন এলাকায় তাঁত হওয়ায় এখানে কাজ করছেন। তাঁর স্ত্রীও এখানে কাজ করছেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে সপ্তাহে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা রোজগার হয়। তবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে এই শিল্প।

তাঁতশিল্পীরা অবিরত বুনে চলেন তাঁদের জীবন ও জীবিকা। প্রাচীনকাল থেকে আঁকড়ে ধরে রাখা এ পেশায় যদিও নেই আগের জৌলুস। তার পরেও তাঁরা ছাড়তে পারেন না বাপ-দাদার ভালোবাসার এ পেশা। নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন যুগ যুগের ঐতিহ্য। যদিও তাঁরা চিন্তিত নিজেদের অনিশ্চিত আগামী নিয়ে। তবু সুতার রঙিন ফোঁড়ে বুনে চলেন স্বপ্নের জাল ও নিজের ভবিষ্যৎ। আর গেয়ে ওঠেন-

ভাদর মাসে কাটিলাম সুতা

আশ্বিন মাসের পয়লাতে

বাড়ির কাছে তাঁতিয়া ভাইরে

শাড়ি খান বুনে দে।

সেই কথা শুনিয়ারে তাঁতি

মনে মনে হাসতাছে

কি-বা রংয়ের বুনবো শাড়ি

ছবি খান দেখায়া দে…।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন