তারা বাঁশির কারিগর

চিকন লম্বা বাঁশ। একজন কেটে ছোট ছোট করে রাখছে। পাশেরজন সেগুলো আঁটি বাঁধছে পানিতে ভেজানোর জন্য। কেউ আবার সদ্য ভেজানো বাঁশের টুকরোগুলো মেপে মেপে কাটছে। কেউ মেপে কাটা সেই বাঁশগুলোয় ছোট ছোট ছিদ্র করছে। অন্যরা কেউ রং করে, রঙিন জরি-ফিতা লাগায়, বেলুন বাঁধে বা নানা নকশা করে। তারপর একজন নকশা করা সেই বাঁশের টুকরোটি মুখে ফুঁ দিয়ে পরীক্ষা করে নেয় সব ঠিক আছে কিনা। এভাবেই তৈরি হয়ে যায় একটি বাঁশের বাঁশি।

বাঁশের বাঁশি তৈরির এই দৃশ্য শ্রীমদ্দি গ্রামের। কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলা সদর থেকে কিছুটা দূরে এই গ্রাম অবস্থিত। দিনের যে কোনো সময় শ্রীমদ্দি গ্রামের বিভিন্ন পাড়ার বাড়ি বাড়ি গেলেই দেখা যাবে এই বাঁশের বাঁশি তৈরির নানা কারিগরি প্রক্রিয়া। এই বাঁশি তৈরির কারিগরদের মধ্যে আছেন নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা, তরুণ-তরুণী ও শিশু-কিশোর। তাদের হাতে তৈরি বাঁশের বাঁশি দেশের বাজারের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

পশ্চিম শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশি তৈরির কারিগর ফিরোজা বেগম বলেন, ‘এখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরিবার বাঁশি তৈরির কাজ করে। এই বাঁশি তৈরি করেই আজ এখানকার অনেক নারী-পুরুষ সফল হয়েছেন বা সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করছেন। বাঁশি তৈরির কাজ আমরা স্বামী-স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে মিলেমিশে করি।’

প্রায় দেড় বছর আগে শফিকুল ইসলামের বউ হয়ে শ্রীমদ্দি গ্রামে আসেন কেরানীগঞ্জের মেয়ে নাসরিন বেগম। তিনি বলেন, ‘বাঁশি তৈরির কাজ আমি আগে জানতাম না। এ বাড়িতে এসেই জেনেছি। এখন তৈরি করতে পারি। এটা তৈরি করে ভালোই লাগে। এক ধরনের আনন্দ পাই।’

রেনু আক্তার। বয়সে তরুণী। পারিবারিক কারণে খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি। তাই বাঁশি তৈরির কাজ করছেন ছোটবেলা থেকেই। রেনু আক্তার বলেন, ‘পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের মতো পরিবারের বাবা-মা, ভাইবোন সবাই মিলেই আমরা বাঁশি তৈরির কাজ করছি। কারণ, পরিবারে আমরা সবাই সমান। তাই কাজের অংশেও সবাই সমান থাকার চেষ্টা করি।’

তরুণী শাহীনূর আক্তারও এখানকার বাঁশি তৈরির একজন কারিগর। শাহীনূর আক্তার বলেন, ‘সংসারের সচ্ছলতার জন্যই আমরা বাঁশি তৈরির কাজ করি। উপার্জনও ভালো। উপার্জনের টাকা সংসারেই খরচ করি। এ ছাড়া নিজের বাড়িতে বাবা-মা, ভাইবোনদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করি। এটা এক ধরনের আনন্দের মধ্যেই কাজ করা হয়। তাই কাজের সময় তেমন পরিশ্রম বা কষ্ট মনে হয় না।’

রাজিয়া বেগম বলেন, ‘রান্নাবান্না ও সংসারের অন্যান্য কাজ গুছিয়ে স্বামী ও ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাঁশি তৈরির কাজ করি।’ এখানকার আরেক কারিগর জোছনা আক্তার বলেন, ‘এখানে বাঁশি তৈরির কাজ কয়েক পুরুষ ধরে হয়ে আসছে। আমরাও করছি পারিবারিকভাবেই।’

বাঁশি তৈরির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি থেকে তল্লা নামের এক ধরনের বাঁশ কিনে আনা হয়। তারপর সেই বাঁশ প্রথমে রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। শুকনো বাঁশ কেটে ছোট ছোট করে আঁটি বেঁধে পানিতে কয়েক দিন ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর ভেজানো সেই বাঁশ বাঁশির মাপ অনুযায়ী কাটা হয়। সেখান থেকে বাঁশির ফুটো, রঙ, জরি লাগানোসহ বিভিন্ন নকশা করা হয়। তৈরি করা বাঁশিতে একজন ফুঁ দিয়ে পরীক্ষা করে নেন ঠিকমতো বাজে কিনা। তারপর তা বিক্রির জন্য প্যাকেট করা হয়।

এখানকার বাঁশি তৈরি হয় ছয়, দশ, এগারো ও সাড়ে বারো ইঞ্চিসহ বিভিন্ন মাপের। এ ছাড়া এখানে মুখবাঁশি, মোহনবাঁশি, আড়বাঁশি, ফটিকবাঁশি, বেলুনবাঁশিসহ বিভিন্ন নামের বাঁশি তৈরি করা হয়। এখানকার তৈরি বাঁশি পাইকারি বিক্রির বড় বাজার হলো ঢাকার চকবাজার। বাঁশি তৈরির কারিগররাই চকবাজারে গিয়ে তাঁদের বাঁশি বিক্রি করেন এবং নতুন বাঁশি তৈরির অর্ডার নেন। অনেক পাইকার বাড়িতে গিয়েও বাঁশি কিনে আনেন। অনেক কারিগর আবার দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেরাই পাঠিয়ে দেন বিক্রির উদ্দেশ্যে।

এখানকার বড় বাঁশি বিক্রি হয় প্রতিটির হিসেবে। আর ছোট বাঁশি বিক্রি হয় হাজার হিসেবে। এসব বাঁশির দাম সাধারণত ১ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু বিশেষ নকশার বিশেষ মাপের বাঁশির দাম একটু বেশি হয়ে থাকে। তবে দাম নির্ভর করে বাঁশির মাপ ও নকশা অনুয়ায়ী।

এখানকার কারিগর সুস্মিতা রানী বলেন, ‘বাঁশি তৈরি হয় বিভিন্ন উৎসব, মেলা ও পার্বণকে কেন্দ্র করে। যেমন, বৈশাখ, ঈদ ও পূজার সময় বাঁশির চাহিদা থাকে বেশি। আবার অন্য সময় চাহিদা কমে যায়। এ ছাড়া আগে বাঁশির চাহিদা অনেক বেশি ছিল। এখন দিন দিন কমছে। কারণ, বিভিন্ন যন্ত্র ও প্লাস্টিকের খেলনা আসার কারণে বাঁশির ব্যবহার কমতে শুরু করেছে।’

এখানকার আরেক তরুণ কারিগর মাহমুদ বলেন, ‘বাঁশি আমাদের দেশের ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম। এই বাঁশি তৈরির অন্যতম কারিগর হলেন আমাদের বাবা-মা ও ভাইবোনরা। তাই আমাদের কাছে এটা এক ধরনের আনন্দের বিষয়।’ স্থানীয় কলেজের প্রভাষক মতিন সৈকত বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম অনুষঙ্গ বাঁশের বাঁশি। কিংবা বাঁশির সুর ছাড়া গান, নাচ বা কোনো সংস্কৃতিই সঠিকভাবে ফুটে ওঠে না। আর সেই বাঁশি তৈরি হয় আমাদের এখানে। এটা স্থানীয়দের জন্য গর্বের বিষয়।’

 

ছবি: লেখক