তারেক মাসুদের শিল্পে অন্তর্যাত্রা

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার একজন মাদ্রাসা ছাত্র কালক্রমে বাংলাদেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সর্বাধুনিক এবং শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রের শিল্পশ্রষ্টা হয়ে উঠবেন, তা তাঁর আগে আমরা ভাবতে পারতাম না। তাঁর পরেও এটা বাস্তবে আবার ঘটতে দেখব এমন কথা সহজে ভাবতে পারছি না। এটা কখনো কখনো কোনো কোনো জাতির শিল্পের ইতিহাসে ঘটে, যে একজন শিল্পশ্রষ্টা তাঁর জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনা অথবা তাঁর জীবনের যাত্রাপথের দু’পাশে যা যা দেখেছেন, যার সঙ্গে যেভাবে পরিচিত হচ্ছেন বা হয়েছেন তাকেই তিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পমাধ্যমে ফুটিয়ে তুলছেন, তুলে ধরছেন। একজন শিল্পী যদি তাঁর জীবনের চলে যাওয়া সময়কে ধরতে চান তাঁর শিল্পকর্মে, তাহলে তিনি কি শুধু তাঁর সময়কেই ধরেন নাকি তুলে ধরেন সেই জাতির পেছনে ফেলে আসা সময়কেও? আর এভাবেই মানুষের ব্যক্তি সময়ের বিশ্লেষণে, স্মৃতিচারণে উঠে আসে সমষ্টির সময়। যা থেকে ইতিহাসের ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার নতুন নতুন ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণ আমাদের মাঝে হাজির হয়। তাই আমাদের সমষ্টির সময় আসলে ব্যক্তি সময়ের একটি সরলীকৃতরূপ, যা বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে আসে বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে। ফলে ফরিদপুর জেলার ভাংগা উপজেলার একজন মাদ্রাসা ছাত্র যখন তাঁর পরবর্তী জীবনে চলচ্চিত্রে নিজের ফেলে আসা সময়কে ধরতে চান তখন তা শুধু তাঁর আপন সময় থাকে না। উঠে আসে আমাদের সমষ্টির সময়! আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সেই মাদ্রাসা ছাত্র আমাদের সমষ্টির সময়ের ব্যাখ্যাকারও হয়ে ওঠেন। পরিণত হন নতুন একজন শ্রষ্টায়।

তারেক মাসুদ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন থেকে বেড়ে ওঠা এবং মৃত্যুর পূর্ব সময় পর্যন্ত সংসদ আন্দোলনের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তিনি। তারেক মাসুদ একমাত্র বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকার যাঁর চলচ্চিত্রকর্ম পৃথিবীর প্রায় ৪৪টি দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। এই রকম নজির বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে একমাত্র সত্যজিৎ রায় ছাড়া আর কারো নেই। বিশ্বচলচ্চিত্রে তারেক মাসুদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ‘ব্র্যান্ড’ ছিলেন। আমরা জানি ‘অস্কার’ পুরস্কার প্রতিযোগিতায় তারেক মাসুদের মাটির ময়না (২০০২) একমাত্র চলচ্চিত্র যা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে। ভুবনবিখ্যাত ‘কান’ চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ছবি মাটির ময়না ‘আন্তর্জাতিক সমালোচক’ পুরস্কার লাভ করেছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রসমূহের মধ্যে মোরশেদুল ইসলামের ‘চাকা’ ছাড়া আর কোনো চলচ্চিত্র এই মাপের আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করতে পারেনি।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে কাজ করেছেন, লেখালেখি করেছেন, সভা-সেমিনার এবং আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন তারেক মাসুদ। চলচ্চিত্রকে তিনি শুধুমাত্র আলাদা করে বুঝতেন না। তিনি ‘চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির’ কথা বলতেন। ‘চলচ্চিত্র সংস্কৃতি’র সামগ্রিক রূপ বা চেহারার উন্নতির প্রয়োজনে কাজ করেছেন। তারেক মাসুদের আজীবন চলচ্চিত্রসঙ্গী স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে এবং এককভাবে তারেক মাসুদ যেসব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তা বাংলাদেশের আগামী দিনের চলচ্চিত্র উৎসাহী তরুণদের জন্য ‘অবশ্যপাঠ্য-চলচ্চিত্র’ রূপে চিহ্নিত হবে।

২০১১ সাল পর্যন্ত তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রকর্মসমূহের মধ্যে প্রামাণ্য চিত্রগুলো হচ্ছে: সোনার বেড়ি (১৯৮৭), আদমসুরত (১৯৮৯), আহ আমেরিকা (১৯৮৯), গণতন্ত্র মুক্তি পাক (১৯৯০), ইউনিসন (১৯৯২), মুক্তির গান (১৯৯৫), শিশুকণ্ঠ (১৯৯৭), মুক্তির কথা (১৯৯৯), নিরাপত্তার নামে (১৯৯৮), অন্য শৈশব (২০০২) এবং কানসাটের পথে (২০০৮)।

আর কাহিনীচিত্রসমূহ হচ্ছে: শামীম আখতারের সঙ্গে যৌথভাবে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি সে (১৯৯৩), মাটির ময়না (২০০২), ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে অন্তর্যাত্রা (২০০৬), স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নরসুন্দর (২০০৯) এবং রানওয়ে (২০১০)। এছাড়াও তারেক মাসুদের অনেকগুলো ছবি নির্মাণাধীন ছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশের লোকজ উৎসব, মেলা দিবস ইত্যাদি নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র এবং বাংলাদেশের সিনেমা হলের বেহাল অবস্থা নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাণপ্রক্রিয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। এছাড়াও নির্মাণাধীন ছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে তারেক মাসুদের স্বপ্নের ছবি কাগজের ফুল। এই ছবির প্রেক্ষাপট এবং ব্যাপ্তি বিশাল। ফলে এই ছবি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেটের ছবিতে পরিণত হতে যাচ্ছিল।

তারেক মাসুদ এবং তাঁর বেড়ে ওঠা

তারেক মাসুদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ছিল না, যা তিনি প্রায়শই বলতেন। তারেক মাসুদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৫ সালের ৬ ডিসেম্বর, ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট, একজন শিক্ষিত এবং উদার মনের মানুষ। কিন্তু তারেক মাসুদের নানির মৃত্যুর পর তারেকের পিতা হঠাৎ করেই পরিবর্তন হয়ে যান এবং হয়ে ওঠেন একজন কট্টর মুসলমান। যাঁর প্রভাবে তারেকের গৃহিণী মা এবং শিশু তারেকের জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। তারেকের পিতা বাড়িতে পর্দা করার বিধানের সঙ্গে সঙ্গে তারেককে একজন ‘আলেম’ বানানোর ইচ্ছা পোষণ করেন। ফলে শিশু তারেক প্রথম যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ পান তা হলো একটি আলিয়া মাদ্রাসা। জীবনের প্রথম মাদ্রাসা দর্শনের বর্ণনা তারেক মাসুদ দিচ্ছেন- ‘আমার প্রথম ভর্তি হওয়া ভাঙ্গার মাদ্রাসাসংলগ্ন একটি বিরাট দীঘি ছিল। যেটি আমরা ব্যবহার করতাম। আমি যখন প্রথম মাদ্রাসায় গেলাম সেদিন রাত ৩টা সাড়ে ৩টার দিকে আমাকে তুলে সেই বিরাট দীঘির ঘাটে নিয়ে যাওয়া হলো। কুয়াশার মধ্যে সামান্য আলো-আঁধারিতে দেখা যাচ্ছিল সবাই মেসওয়াক করছে। আমাকেও মেসওয়াক করা শিখানো হলো। আসলে একটি শিশুর ওই ধরনের অভিজ্ঞতা একরকম ইন্দ্রজালিক অভিজ্ঞতা।’

তারেক মাসুদের মাদ্রাসা শিক্ষাজীবন কোনো একটি মাদ্রাসায় বন্দী ছিল না। তিনি প্রায় পাঁচ-ছয়টি মাদ্রাসায় পড়েছেন। সেগুলো আবার এক একটি এক এক জায়গায় অবস্থিত। কোনোটি হয়ত ফরিদপুরের ভাঙ্গায়, কোনোটা ঢাকার লালবাগে, কোনোটা ঢাকার কাকরাইলে, আবার কোনোটা যশোরের মধুমতি নদীর পাড়ের বাহিরদিয়ায় অবস্থিত।

পুরো ষাটের দশক তারেক মাসুদ এক মাদ্রাসা থেকে আরেক মাদ্রাসায় ছুটে চলেছেন পিতার ইচ্ছায়-আদেশে। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাস্তবিকভাবেই তারেক মাসুদের ‘ব্যক্তিযুদ্ধে’ পরিণত হয়। কেননা, নয় মাসের যুদ্ধের পর বাংলাদেশে স্বাধীনতার সঙ্গে তারেক মাসুদও স্বাধীন হয়ে গেলেন। তারেক মাসুদের পিতার যে পাকিস্তান এবং ‘মুসলমান ভাই-ভাই’ বিষয়ক কঠোর মনোভাব ছিল তাতে চিড় ধরে। বলা যায় ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তাঁর উপলব্ধি হয় কোনো কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। ফলে দেশের স্বাধীনতার পর তিনিই উদ্যোগী হয়ে তারেককে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে বলেন। ১৯৭৩ সালে তারেক মাসুদ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। এরপর তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কো-এড কলেজ ‘আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ’-এ ভর্তি হন। গ্রাম এবং মাদ্রাসা থেকে আসা একজন ছেলের মেয়েপ্রধান কলেজে পড়ার অভিজ্ঞতা প্রথমত সহজ ছিল না। এ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলেছেন, ‘আমাকে বহু চেষ্টা করে মানিয়ে নিতে হয়েছিল, যা এক ধরনের কালচারাল শখের মতো ছিল।’ আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি চাচাত ভাইদের মাধ্যমে ঢাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে থাকেন। চাচাত ভাই কামাল মাহমুদের বন্ধু স্থপতি প্রিন্সের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির অফিসে যান এবং সংসদ আন্দোলনের পুরোধা মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে পরিচিত হন। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি চলচ্চিত্র সংসদের নিয়মিত কর্মী হয়ে ওঠেন। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। এই সময় থেকেই তিনি ঢাকার চলচ্চিত্র চর্চার পরিধিতে নিজের প্রস্তুতি, পড়ালেখা, সার্বক্ষণিক কর্মকাণ্ড এবং নতুন নতুন চলচ্চিত্র ভাবনা আয়ত্তের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন অনেকের মাঝে অন্যতম। চলচ্চিত্র ছাড়াও তারেক মাসুদ আগ্রহী ছিলেন সংগীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, নৃতত্ত্ব এবং মনঃস্তত্ত্ব বিষয়ে। বুঝতে চাইতেন এবং পড়তেন এই সব বিষয়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে। যে কারণে বিভিন্ন বিষয়ের মেধাবী সমবয়সীদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর বন্ধুত্ব। এবং পারস্পরিক লেনদেনের মধ্য দিয়ে তারেক এবং তাঁর মেধাবী বন্ধুদের প্রস্তুতি চলে আগামী দিনের শিল্পকলা রূপের নেতৃত্ব দানের।

তারেক মাসুদের প্রথম প্রয়াস আদম সুরত

তারেক মাসুদের কথা ছিল আমেরিকা যাওয়ার। তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন আমেরিকার চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করতে যাওয়ার। কিন্তু তিনি আমেরিকায় যাওয়ার জন্য জোগাড় করা টাকা নিয়ে আদম সুরত নির্মাণ করতে শুরু করলেন। এ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলেছেন, ‘১৯৮২ সালে আমি আমেরিকায় ফিল্মের ওপর পড়াশুনার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলাম এবং পারিবারিকভাবে অর্থ জোগাড় করেছিলাম। এদিকে সুলতান তখন আমাদের মতো যুবকদের কাছে কিংবদন্তি। তার ওপর আহমদ ছফার একটি লেখা আমাদের সুলতানের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করে। আমরা তখন বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কয়েকজন সুলতানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার কথা ভাবছিলাম। আমরা যারা বিকল্পধারা নিয়ে ভাবছিলাম তাঁরা সুলতানের ওপর ছবি করাটা খুবই জরুরি মনে করছিলাম। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন আমার সুলতানের প্রতি এই আগ্রহের বিষয়টি জানতেন। তখন বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করেছি। আনোয়ার ভাই আমাদের ক্যামেরার শিক্ষক ছিলেন। তিনি সবসময় উৎসাহ দিতেন ছবি বানানোর জন্য। আমি একদিন তাঁর জিগাতলার বাসায় গিয়ে যখন বললাম যে আমিতো পড়াশুনার জন্য বিদেশ চলে যাচ্ছি। উনি বললেন, আজকের কাগজ দেখেছো? আমি বললাম, না। উনি আবার বললেন, ইত্তেফাক খুলে দেখো, ব্যাক পেইজে বড় করে নিউজ শিল্পী সুলতান হাসপাতালে, মারাত্মকভাবে অসুস্থ। মনে আছে তুমি বলেছিলে সুলতানের ওপর ডকুমেন্টারি করবে। তুমি যদি এখন পড়তে বাইরে চলে যাও, ফিরে এসে দেখবে শিল্পী নেই। তোমার মনের মধ্যে কিন্তু একটা বিরাট আফসোস থেকে যাবে।’ আমি আনোয়ার ভাইকে বললাম, ‘আমি বাইরে যাবার যাবতীয় কাজ সেরে ফেলেছি, আমি চলে যাবো। তারপর জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে ছয় নাম্বার বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। অনেক সময় নিচ্ছে সেদিন বাসটা, এটাও একটা কাকতালীয় ঘটনা। বাসটা এত দেরি না করলে হয়তো মাথার মধ্যে এত উল্টো বুদ্ধি আসতো না। বাস আসছে না, আসছে না। এ সময় আমার মাথায় উল্টো বুদ্ধিটা এলো, আমি বিদেশে যাব না। ওই টাকা দিয়েই ইমিডিয়েটলি আমি সুলতানের ওপর ছবি বানানো শুরু করে দেবো। দ্যাটস হাউ আই গট্ ইনটু ফিল্ম মেকিং’।

তারেক মাসুদ আদম সুরত নির্মাণ শুরু করেন ১৯৮২ সালে। মূলধন ছিল প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা। যে টাকায় সে সময় আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে একটি বড় দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু এ ছবি নির্মাণ করতে গিয়ে শুরু হয় একটি দীর্ঘসূত্রী অধ্যায়ের। বছরের পর বছর চলে যায় ছবি আর শেষ হয় না। বাড়তে থাকে ছবির ব্যয়। শুটিং চলতে থাকে থেমে থেমে বহু সময় ধরে। ফলে সে সময় এই ছবির এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ চলতে থাকে তারেক মাসুদের প্রতি। বন্ধুরা বলতে থাকেন, তারেক মাসুদ নতুন চলচ্চিত্র আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছেন, যার নাম ‘সিনেমা-দেরীতে’। কারণ তখন বিশ্বব্যাপী নতুন সিনেমা আন্দোলনের নাম ছিল ‘সিনেমা-ভেরীতে’। তাই বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলতেন, ‘ভেরিতে’ নয় ‘দেরীতে’।

কিন্তু এই দীর্ঘসময় জুড়ে সুলতানের সঙ্গে থাকার ফলে তারেক মাসুদের অন্যরকম উপলব্ধি হয়। তিনি লাভ করেন জীবনদৃষ্টি। সুলতানের চোখে আবিষ্কার করেন নতুন দেখার দৃষ্টি যা জীবনব্যাপী সাধনায় লাভ করা যায় কখনো কখনো। এ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলেন, আদম সুরত বানাতে গিয়ে আমি যতই ইম-প্রাকটিক্যাল কাজ করি না কেন, এমন এক আলোকপ্রাপ্ত মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকার ও চলার ফলে আমার একটা আত্মোন্নয়ন ঘটেছে বলে আমি মনে করি। শুধু গ্রাম বাংলা নয়, শিল্প সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে কিছু ধারণা আমার মধ্যে বিকশিত হয়েছে। নিজের মধ্যে এক ধরনের স্থৈর্য এসেছে, আত্মবিশ্বাস জন্মেছে এবং একটুতেই ভেঙে না পড়ার শক্তি জন্মেছে। তাছাড়া শিল্পী সুলতানের সংস্পর্শে আসার ফলে আমার মধ্যে খুব দ্রুত ফিল্ম মেকার হওয়া এবং নাম বা যশের পেছনে দৌড়ানোর যে মানসিকতা সেটা থেকে মুক্ত হতে পেরেছি।’

ফলে ‘আদম সুরত’ তারেক মাসুদের গড়ে ওঠার চলচ্চিত্র। এই ছবি নির্মাণের সতীর্থ ছিলেন বন্ধু মিশুক মুনীর যিনি ছবিটির ক্যামেরা সঞ্চালন করেন। আদম সুরত নির্মাণপ্রক্রিয়ার কারণেই পরিচয় হয় মার্কিন তরুণী ক্যাথরিন শেপিয়ারের সঙ্গে। যা পরবর্তী সময়ে পরিণয়ে গড়ায় এবং ক্যাথরিন শেপিয়ার হন ক্যাথরিন মাসুদ। আদম সুরত নির্মাণ শেষ হয় ১৯৮৯ সালে। সাত বছর মেয়াদি এই ছবি তারেক মাসুদের শিল্পমাধ্যমে শক্তিশালী বুনিয়াদ গড়ে দেয়। এবং একই প্রক্রিয়ায় আদম সুরত হয়ে ওঠে অসামান্য প্রামাণ্যচিত্র।

মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যগল্প মুক্তির গান এবং প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির কথা

১৯৯০ সালে তারেক মাসুদ আমেরিকায় চলে যান। সেখানে গিয়ে একটি বইয়ের দোকানে চাকরি নেন। তখনো তিনি কী করবেন তার কিছুই ঠিক করতে পারেন নি। সে সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আই ওয়াজ স্টিল থিংকিং। কিন্তু ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। ওখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিয়ার লেভিনের ধারণকৃত ২০ ঘণ্টা ফুটেজের সন্ধান পেলাম। সিনেমা থেকে সাত সমুদ্দুর তের নদী দূরে চলে গেছি কিন্তু সেখানে গিয়েই আবার পাঁচ বছরের জন্য নিমজ্জিত হয়ে গেলাম মুক্তির গান নির্মাণে। ১৯৯০ থেকে ’৯৪-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পাঁচ বছর নিউইয়র্কেই আমরা দিন রাত ছবিটির পেছনে কাজ করেছি। আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম। ক্যাথরিন একটা অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মে বেশ উঁচু পদে কাজ করত, সেও চাকরিটা ছেড়ে দিলো। আমি চলচ্চিত্রকেই যে পেশা বা নেশা হিসেবে নিব সেটা ভাবিনি। চলচ্চিত্র বিষয়ে আমি কোথাও শিকড়স্থ না বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না কিন্তু ওই যে নিয়তি!’

১৯৯৫ সালে মুক্তির গান মুক্তি পাওয়ায় বড় সেটা ইতিহাস তৈরি করেছিল। অদ্যাবধি বাংলাদেশের আর কোনো প্রামাণ্যচিত্র এতটা জনপ্রিয় হয়নি। এতটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি, যা মুক্তির গান পেরেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ২৫ বছর পর বাংলাদেশের মানুষ নতুনভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিল মুক্তির গান দেখে। দেশের সকল জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে ছবিটির এক একটি ‘ওপেনএয়ার’ প্রদর্শনীতে ১০-১৫ হাজার দর্শক একত্রে ছবিটি দেখেছে। নির্মাতা তারেক মাসুদ  মুক্তির গান -এর প্রভাব সম্পর্কে বলেন, ‘স্বাধীনতার ২৫ বছর পরে যার মধ্যে ২০ বছর ধরে যখন মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত কিছু ভূলুণ্ঠিত যে সময়ে তরুন প্রজন্মের সামনে সবাকভাবে রঙিন মুক্তিযুদ্ধ আছড়ে পড়া! যে সময়ে রেডিও-টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধ নেই, পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধ নেই, শুধু জাহানারা ইমামের মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা বই ছাড়া নতুন করে মুক্তিযুদ্ধকে উদ্দীপ্ত-আলোড়িত করার অন্য কিছুই ছিল না। তখন নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের এই উজ্জীবন শুরু হয়েছে মুক্তির গান -এর মধ্য দিয়ে।’

মুক্তির গান প্রামাণ্যচিত্রের একটি দৃশ্য

মুক্তির গান এর আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ অনেক প্রামাণ্যচিত্র, কাহিনীচিত্র হয়েছে। প্রায় সবগুলো ছবিতেই মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধ বা রণাঙ্গনের বিষয় মুখ্য হিসেবে উঠে এসেছে। প্রথমবারের মতো মুক্তির গান -এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আনুষঙ্গিক দিকটা উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের পারিপার্শ্বিক দিক, অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ করা, অন্য যোদ্ধাদের সংগ্রামের দিক, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সাধারণ মানুষ, যুদ্ধরত সৈনিকসহ অপরাপরের মনোবল ধরে রাখার সংগ্রামে রত ছিলেন, তাদের যুদ্ধের গল্প উঠে এসেছে মুক্তির গান -এ। নির্মাতা হিসেবে তারেক মাসুদ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বিপুলভাবে গৃহীত হন, নন্দিত হন মুক্তির গান -এর মধ্য দিয়ে, যা অনেক নির্মাতা এবং শিল্পীর আরাধ্য বিষয়।

সারাদেশের মুক্তির গান প্রদর্শনের সময় তারেক মাসুদের সঙ্গে সাধারণ দর্শকদের মতবিনিময় হয় মুক্তির গান নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। সেই মতবিনিময় থেকেই তারেক মাসুদের মুক্তির কথা নির্মাণের ভাবনা আসে। মুক্তিযুদ্ধ শুধু তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধারাই করেন নি, যাদের কথা সকলে জানে শুধু তারাই মুক্তিযুদ্ধের নায়ক নন। দেশের অল্প কিছু দালাল, রাজাকার ছাড়া সকলেই কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে দেশের আদিবাসী মানুষদের আছে গৌরবজনক অবদান, যা সব সময় আড়ালেই থেকে গেছে, রয়ে গেছে অনালোচিত। মুক্তির গান দেখতে দেখতে সেই সব দর্শক বলতে শুরু করেন তারাও যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উঠে আসে এমন সব প্রামাণ্য গল্প। আর এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের অনালোচিত একটি অধ্যায় উঠে আসে মুক্তির কথা য় তারেক মাসুদের হাত দিয়ে, যা শেষ পর্যন্ত জাতির ইতিহাসে নতুন সংযোজন হয়ে ওঠে। ইতিহাস পুনর্গঠিত হয়।

মাটির ময়না যা জাতীয় ইতিহাসের পুনর্গঠিতরূপ

২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া মাটির ময়না তারেক মাসুদের প্রথম বড় কাহিনীচিত্র। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে তারেক মাসুদ ১৯৭৪ সাল থেকে তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করেন। সেই যাত্রা শুরুর ২৮ বছর পর তিনি তাঁর প্রথম বড় কাহিনীচিত্র নির্মাণ শুরু করেন, যা বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। মাটির ময়না আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রদর্শিত হয় মর্যাদাসম্পন্ন ‘কান’ চলচ্চিত্র উৎসবের সম্মানজনক ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’ বিভাগের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে, যা কোনো বাংলাদেশের ছবির জন্য প্রথম এবং তা বিশেষ গৌরবের।

মাটির ময়না চলচ্চিত্র হিসেবে একটি ‘পাঠযোগ্য বয়ান’। এই বয়ানের কথক তারেক মাসুদ স্বয়ং তাঁর কৈশরের সংগৃহীত ব্যক্তিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বাস্তব অবস্থার স্মৃতিকে পুনর্গঠন করেছেন তিনি। এই পুনর্গঠনের কাজে শুধু স্মৃতি নয়, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন ওই সময়কার কালচারাল কোড, ভাবাদর্শ, নানামুখী সামাজিক চিন্তা ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহ। শুরু যদিও নির্মাতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে, ক্রমে তা সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার বয়ানে পরিণত হয়। নির্মাতার আপন আত্মচরিত ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্রের আত্মকথা হয়ে ওঠে। বাঙালি জাতির আত্ম-অনুসন্ধানের বা জাতি গঠন প্রক্রিয়ার একটি ক্রান্তিকালের (১৯৬৯-১৯৭১) ইতিহাস পুনর্গঠিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। মাটির ময়না য় কেন্দ্রীয় চরিত্র আনুর চোখ দিয়ে আমরা চারপাশ দেখি, যেমনটি আনু নিজে দেখে। এ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলেন, ‘আনু যে সময়টা দেখেছে সেটা আমাদের জাতির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এবং ওই সময়টা ধারণ করার জন্য ওর যে বিকাশমান একটা বয়স তার মধ্যে একটা ইনোসেন্সের ব্যাপার  আছে। একটা সারল্য আছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হই তখন কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক স্বার্থ বুদ্ধি কাজ করে। চারপাশে যা দেখি তা আমাদের স্বার্থের  দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। ভেস্টেড ইন্টারেস্টগুলো ডেভেলপ করে যায়। কিন্তু ওই বয়সে একটা ইনোসেন্ট কিউরিয়াস কোশ্চেনিং চোখ থেকে সবকিছু দেখা যায়। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি যে, রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অস্থির ও উত্তাল একটা সময়কে এক ধরনের নির্মোহ নির্লিপ্ত শিশু-কিশোরের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা। ফলে ওই সরলতা এক ধরনের নির্বিকার চোখে দেখা আনু যেন রেকর্ডার, ওর নিজস্ব কোনো পার্টিসিপেশন নেই। আমি নিজে তখন ওই রকম ১৪-১৫ বছর বয়সের ছিলাম তাই সবকিছু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখার আমার সুযোগ হয়েছে।’

তারেক মাসুদের প্রথম বড় কাহিনীচিত্র মাটির ময়নার দৃশ্য

‘মাটির ময়না’য় তিনটি কাহিনীতে তিনজোড়া পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্বমূলক ধারণার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন নির্মাতা। প্রথম কাহিনীতে নারী-পুরষ বা ঘর-বাহির দ্বন্দ্বটি উন্মোচন করা হয়েছে। এখানে আয়েশাকে ঘিরেই দ্বন্দ্বটি দানা বাঁধে এবং পরিণতি পায়। ঘর ছাড়ে আয়েশা। দ্বিতীয় কাহিনীতে  মাদ্রাসাছাত্র রোকনকে ঘিরে ঘনবব্ধ হয় আবদ্ধ মাদ্রাসা বনাম মুক্ত প্রকৃতি তথা প্রতিষ্ঠান-প্রকৃতির দ্বন্দ্বটি। এই দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটে রোকনের পাগল হওয়ার মধ্য দিয়ে। তৃতীয় দ্বন্দ্ব বাঙালি জাতিগঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তানের কাঠামো থেকে বাঙালিরা আলাদা হতে চায়। তাই এই পর্যায়ে যে দ্বন্দ্বটি প্রকট হয়ে ওঠে তা হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বনাম ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এর সাময়িক অবসান ঘটে ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাভিত্তিক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইঙ্গিত দিয়ে। কিন্তু আমরা দেখি অনেকেই ‘মাটির ময়না’কে শুধু মাদ্রাসানির্ভর ছবি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন, যা মাটির ময়না র একটি অংশমাত্র। মাটির ময়না শুধু মাদ্রাসা নিয়ে ছবি কিনা এ বিষয়ে নির্মাতা তারেক মাসুদ বলেন, ‘সাধারণ অনেক দর্শক মনে করেন ছবিটা শুধু মাদ্রাসা নিয়ে? কিন্তু রোকন যেভাবে তার প্রতিপার্শ্বকে মোকাবেলা করছে তাতে কি মনে হয় না পৃথিবীটাই একটা মাদ্রাসা? মানুষ যেভাবে এখানে ক্ষুধার বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, জরার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। রোকনও তেমনি মাদ্রাসায় লড়াই করেছে। সেক্ষেত্রে পৃথিবীটা মাদ্রাসার মেটাফোর হতে পারে।’

অনাবাসী বাংলাদেশীদের শেকড় সন্ধানের অন্তর্যাত্রা

বাংলাদেশের কত লক্ষ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করে? প্রকৃত সংখ্যা কত? সেই সব অনাবাসী বাংলাদেশীদের শেকড় সন্ধানের, তাদের আত্মপরিচয়ের যে জটিল মানসিক সংকট, তা তুলে ধরার চলচ্চিত্র অন্তর্যাত্রা। বাংলাদেশের অনাবাসী বাঙালিদের এই আত্মপরিচয়ের সংকট তুলে ধরা ছবি অন্তর্যাত্রাই প্রথম। ফলে এই ক্ষেত্রেও তারেক মাসুদ অগ্রগামী এবং সংবেদনশীলতার পরিচয়বাহী হয়ে ওঠেন। অন্তর্যাত্রা নিয়ে তারেক মাসুদ বলেন, ‘আমাদের ছবিগুলোতে সামাজিক, রাজনৈতিক পটভূমি খুব গুরুত্ব পেয়ে থাকে। কিন্তুঅন্তর্যাত্রা ছবিতে সমাজ ও রাজনৈতিক পটভূমি অনেক ক্ষীণ এবং মনস্তাত্ত্বিক দিকটা অনেক গুরুত্বে সাথে এসেছে। অর্থাৎ মানবিক সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন নিয়ে আমাদের অন্তর্যাত্রা। বড় ক্যানভাসে নয়, কয়েক দিনের জন্য দেশে ফেরার গল্প নিয়েই অন্তর্যাত্রা। সেটা দেশে ফেরার যাত্রা। এটা যতটা না ভৌগোলিক ততটা মানসিক অর্থাৎ যে যাত্রাটি সারাক্ষণ ছবির মধ্যে চলে সেটি অন্তর্যাত্রা এবং মনের মধ্যেই এক ধরনের জার্নি। একটা ইনার জার্নি প্রভাবিত হতে থাকে। মাটির ময়না যেমন ’৬৯, ’৭০ ও ’৭১ প্রায় তিন বছরের পটভূমিতে নির্মিত। অন্তর্যাত্রা মাত্র চার দিনের ঘটনা এবং প্রায় ঘটনাহীন গল্প, কারণ ছবিতে প্রধানত কিছুই ঘটে না। ছবির শুরুতে একটি মৃত্যু সংবাদ, যেটি আবার ছবিতে দৃশ্যমানও নয়। আবার মৃত্যু সংবাদের পরবর্তী সময়ে তেমন কোনো নাটকীয় কিছুই ঘটে না। যতটুকু ঘটে তা মনের মধ্যে।

সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নির্মিত তারেক মাসুদের প্রথম চলচ্চিত্র অন্তর্যাত্রা

তারেক মাসুদের নরসুন্দর  

এটি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। কিন্তু এর বিষয় এবং কাহিনী উপস্থাপনের ভঙ্গির কারণে ছবিটি আর সংক্ষিপ্ত বা স্বল্প থাকে না। এর দৈর্ঘ্য আমাদের মনে এবং মস্তিষ্কে দীর্ঘ হতে থাকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিহারী জনগোষ্ঠীর লোকজন পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে, তাদের সহযোহী হয়ে নির্বিচারে, নৃশংসভাবে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটা আমাদের জানা কাহিনী। যে কারণে এখনো বাংলাদেশে বিহারীদের যেভাবে মর্যাদা দেয়া হয়নি, বরং ঘৃণাই করা হয়। তারেক মাসুদ আমাদের এই জানা বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি নরসুন্দর ছবিতে দেখান একটি বিহারী সেলুনে আত্মগোপনকারী একজন গেরিলা যোদ্ধাকে সেই সেলুনের বিহারী নরসুন্দররা পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করেন। ফলে ছবিটির বয়ান আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। ছবিটিকে তারেক মাসুদ নিজে একটি ‘পলিটিক্যাল থ্রিলার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ছবিটিতে শব্দ ব্যবহার এবং দৃশ্য রচনায় এমন নৈপুণ্য দেখিয়েছেন নির্মাতা, যে কারণে ছবিটি স্বল্প হয়েও দীর্ঘ দৈর্ঘ্যরে ছবির স্বাদ দেয়।

সমসাময়িক বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে রানওয়ে

বাংলাদেশে ২০০৪, ’০৫ এবং ’০৬ সালে যে সমস্ত ঘটনাবলি আমাদের জাতীয় জীবনে ঘটে গেছে তার সাহসী এবং শৈল্পিক চিত্রায়ন রানওয়ে। সে সময় আমরা জাতিগতভাবেই আক্রান্ত হয়েছিলাম জঙ্গিবাদ দ্বারা। যে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিলেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। বর্তমানে তা তথ্য-প্রমাণসহ আমরা জানতে পারছি। নির্মাতা তারেক মাসুদ সে সময়কে ধরে সমসাময়িক বাংলাদেশকেই যেন বিষয় করে তুলেছেন তাঁর রানওয়ে চলচ্চিত্রে। সেখানে কী নেই? আমরা তো একে একে বাংলাদেশের প্রায় সকল সমস্যা আবিষ্কার করি রানওয়ে চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্র প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিক এবং দেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যদের কষ্ট, যন্ত্রণা এবং লড়াইয়ের বয়ান হাজির করে। আমরা আবিষ্কার করি দেশের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিক নিপীড়নের চিত্র, এনজিওগুলোর ‘বিশ্বস্ত ব্যাংক’-এর আড়ালে বিশ্বব্যাংক কায়দায় ঋণদান এবং তা দিয়ে শোষণ করার চিত্র, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জনগণবিরোধী মনোভাব এবং জঙ্গিবাদে পৃষ্ঠপোষণ, বেকারত্ব, অবৈধ সম্পদের বৈভব এবং তা কিভাবে দরিদ্রকে নির্যাতন করে, আমরা পাই একবারে খালি হাতে শুধু গুলটি দিয়ে যন্ত্রদানবকে প্রতিহত করার সাহসী ভঙ্গি। যে ভঙ্গি মানবীয় অনমনীয় অহংকে প্রতিষ্ঠা করে, যা আমাদের সাহসী করে তোলে এবং আমরা নতুন সম্ভাবনায় আশ্বস্ত হই। রানওয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অনতম সাহসী এবং সমকালীন বাস্তবতার আক্ষরিক দলিল। এই ছবির নির্মাতা এত এত বিষয় মোকাবেলা করেছেন  তাঁর এই ছবিতে কিন্তু কোনো কিছুই আরোপিত মনে হয় না। কোনো কিছুই উচ্চকিত নয়। স্বাভাবিক। একজন নির্মাতার ঋদ্ধি তো এখানেই।

সমকালীন সময় ও সংকট উঠে এসে এসেছে রানওয়ে চলচ্চিত্রে

রানওয়ে ছবির নির্মাতা তারেক মাসুদ শুধু সাহসী এই ছবি নির্মাণ করেই তাঁর নিজের কাজ শেষ বলে করেন নি। তিনি সারাদেশে ঘুরে ঘুরে ‘চলচ্চিত্র সংসদ’গুলোর মধ্য দিয়ে রানওয়ে বিপুল দর্শকদের দেখিয়েছেন। দর্শকদের এবং সাধারণ মানুষদের জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে গেছেন। আর এভাবেই তিনি শুধুমাত্র চলচ্চিত্রকারের বা একজন নির্মাতার গণ্ডি পেরিয়ে যান। তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পী, যে শিল্পী নিজের দেশের মানুষকে ধারণ করেন, তাদের আনন্দে হন আনন্দিত, দুঃখে হন সমদুঃখী; বিপদে তাঁর শিল্পীমন নিয়ে এবং তাঁর শিল্পমাধ্যম দিয়ে জাগাতে চান সকলকে বিপদ মোকাবেলায় আশু-করণীয় সম্পর্কে।

শিল্পী তারেক মাসুদ যিনি বলতেন, ‘আমি গল্পের প্রয়োজনে আমার জীবনের কাছে যাই’।

আমরা কি আমাদের শিল্পপথ জানার, বোঝার এবং শেখার প্রয়োজনে তারেক মাসুদের জীবন ও সৃষ্টিকর্মগুলোর কাছে যাব না?

 

ছবি: জেসমিন আরা মলি (পোট্রেট)

তথ্যসূত্র: ১. চলচ্চিত্রকলা – সাজেদুল আউয়াল

২. ক্যামেরার পেছনের সারথি – মনিস রফিক