থিয়েটার অলিম্পিক্‌সে বাংলাদেশের অভিষেক

অলিম্পিকস এর কথা শুনলেই অলিম্পিক গেমস এর কথা মনে আস। কিন্তু অলিম্পিক এখন শুধু শুধু খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু হয় থিয়েটারের মহাজজ্ঞ- থিয়েটার অলিম্পিকস। সে বছরই গ্রীসের ডেলফিতে প্রথম শুরু হয় থিয়েটার অলিম্পিকস এর। প্রথম আসরের মূল ভাবনা ছিলো ট্র্যাজেডি। সূচনার পর থেকে জাপান (১৯৯৯), রাশিয়া (২০০১), ইস্তানবুল (২০০৬), দক্ষিন কোরিয়া (২০১০), চীন (২০১৪), পোল্যান্ড(২০১৬) আয়োজকের ভূমিকা পালন করে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার উপমহাদেশে অর্থ্যাৎ ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অষ্টম থিয়েটার অলম্পিকের। এবারের আয়োজনের মূল ভাবনা- ‘ফ্ল্যাগ অব ফ্রেন্ডশিপ’।

উপমহাদেশের মঞ্চনাটকের তীর্থস্থান ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’ অষ্টম থিয়েটার অলিম্পিকের আয়োজক। ভারতের দিল্লী, পাটনা, আগরতলা, ব্যাঙ্গালুরু, কলকাতা, মুম্বাই সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে ৫০০ টির মতো নাটক মঞ্চায়িত হবে। হ্যামলেট, ফেইড্রা, অ্যান্টিগনের মত ধ্রুপদী নাটকের পাশাপাশি মঞ্চায়িত হবে সমসাময়িক নাট্যকারদের প্রযোজনা।

বাংলাদেশ এই প্রথমবারের মতো থিয়েটার অলিম্পিকসে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছে ৯টি নাটক।

মহাজনের নাও

শাহ আব্দুল করিমের জীবন ও দর্শনের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে সুবচন নাট্যসংসদের নাটক মহাজনের নাও। শাহ আব্দুল করিম বিভিন্ন গানের মধ্যে দেহতত্ত্বের কথা  বলেছেন। আর এই নাটকেও দেখা যায় বিভিন্ন উপাদানের বা দৃশ্যের মাধ্যমে দেহত্বত্তের কথা বলা হয়েছে। বর্ণনানাট্য রীতির মাধ্যমে শাহ আব্দুল করিমের জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে। মহাজনের নাও নাটকে নৌকার ব্যবহার করা হয়েছে- নির্দেশক এই নৌকা ব্যবহার করেছেন প্রতীকি হিসেব। নাটকটি রচনা করেছেন শাকুর মাজিদ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন সুদীপ চক্রবর্তী। নাটকটি ২৮ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় প্রদর্শিত হয়েছে।

মাতব্রিং

ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষরা নানান সময়ই বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠির কাছে অত্যাচার ও নিগ্রহের মুখোমুখি হয়ে আসছে। এসব বঞ্চিত মানুষদের টিকে থাকার লড়াই, বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও তাদের সংগ্রামের চিত্রগুলোকে নাট্যকার সাধনা আহমেদ বিভিন্ন মায়াবী দৃশ্যকাব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের মঞ্চে তুলে ধরেছেন। কথা বলেছেন তাদের অধিকার নিয়ে। নাটকটি  প্রযোজনা করেছে যশোহরের বিবর্তন নাট্যদল। মান্দি জনগোষ্ঠীর দুই নর-নারীর প্রেম ও আর্থ-সামাজিক প্রতিকূলতার কথা ঠাই পেয়েছে মাতব্রিং নাটকে। নাট্যকার সাধনা আহমেদ গদ্য সংলাপের মাধ্যমে  নিজের ভেতরের কাব্যের মাধ্যমে দৃশ্যকাব্যে পরিণত করেছেন। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ইউসুফ হাসান অর্ক। নাটকটি গত ২৭ ফেব্রুয়ারী ভুবনেশ্বরের রবীন্দ্রমন্ডপে এবং অগ্নিঝরা মার্চের ১ম দিন অর্থাৎ ১লা মার্চে দিল্লীতে প্রদর্শিত হয়েছে।

মর্ষকাম

রাজনৈতিক পটভূমির বিভিন্ন মিশ্রনে রচিত হয়েছে নাটক মর্ষকাম। রাজনীতি থাকলে সেখানে ক্ষমতা, ক্ষমতালোভী মানুষ এবং নির্যাতিত মানুষ থাকবেই। এই নাটকে জোরালোভাবেই ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যমে অঙ্কুরিত হয়েছে বিপ্লবের বীজ। নাটকটি বর্তমানে চলমান বিশ্বের ক্ষমতাধর পররাষ্ট্রনীতির কথাই বলেছে। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন অভিনেত্রী ও নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী। রচনা করেছেন তারই মেয়ে আকিকা মাহিন। নাটকটি গত ৫ ই মার্চ দিল্লীর কামানী মিলনাতয়নে এবং ৭ মার্চ কলকাতার ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টারে প্রদর্শিত হয়েছে।

ক্যালিগুলা

ফরাসি কথা সাহিত্যিক আলবেয়ার কামুর বিখ্যাত ক্যালিগুলা নাটকের কথা সাহিত্যপ্রেমী সকল মানুষেরই জানা। ১২ খ্রিষ্টাব্দের রোমান সম্রাট ক্যালিগুলার অন্ধকার জগতকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে নাটকটির প্লট। ভালোবাসা কিংবা অনুকম্পা সহ্য হয় না তার। ক্রোধ আর ঘৃণার এক পর্যায়ে নিমজ্জিত হয়ে তিনি অত্যাচারী শাসক হয়ে যান। রাজ্যের মন্ত্রী থেকে শুরু করে হতদরিদ্র প্রজা সবাই তাঁর অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। কিন্তু তার কাছের  মানুষেরাই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। নিজের প্রিয়ভাজন রক্ষীদের কাছেই তার মৃত্যু হয়। এই নাটকটির প্রযোজনা করে চট্রগ্রামের ফেইম নাট্যকলা বিভাগ। নির্দেশনা দিয়েছেন ফেইম নাট্যকলা বিভাগের পরিচালক অসীম দাশ। গত ১০ মার্চ পাটনার প্রেমচাঁদ  রঙ্গশালায় এবং ১২ মার্চ দিল্লীর কামানী মিলনায়তনে মঞ্চায়ন  হয়েছে নাটকটির।

পাঁজরে চন্দ্রবান

অষ্টম থিয়েটার অলিম্পিকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক একমাত্র প্রোযোজনা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের পাঁজরে চন্দ্রবাণ। শরণার্থীদের মানবেতর জীবন যাপন নিয়ে, তাদের অসহায়ত্বের কথা, তাদের সুখ-দুখ, আনন্দ নিয়ে কথা বলেছে পাঁজরে চন্দ্রবান নাটকটিতে। নাটকটিতে জীবনের প্রতি অন্য একধরনের সৌন্দর্যতার প্রতিচ্ছবি কে বাস্তবায়িত করে তোলার চেষ্টা করেছেন নির্দেশক। এতে যেসব চরিত্রের দেখা যায়, তারা সবাই আমাদের পরিচিত। তারা যে সমস্যা নিয়ে কথা বলে সেই বিষয়গুলোই এখন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। পাঁজরে চন্দ্রবান নাটকের দৃশ্যগত কোনো মিল নেই, কিন্তু  প্রত্যেকটা দৃশ্যের ভাব একই অর্থ বহন করে- তা হলো মানুষের মুক্তি। নাটকটি রচনা করেছেন থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহামান মৈশান, নির্দশনা দিয়েছেন একই বিভাগের  অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহীন। নাটকটি গত ১৩ মার্চ পাটনাতে এবং ১৫ মার্চ দিল্লীর এন.এস.ডিতে প্রদর্শিত হয়।

রাই-কৃষ্ণ পদাবলী

 

 

রাধা-কৃষ্ণের অমর প্রেমের কাহিনী নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃন্দাবনের ব্রুজবুলি ভাষায় রচনা করেছিলেন ভানু সিংহ ঠাকুরের পদাবলী। এই রচনাকে শেখ হাফিজুর রহমান বাংলায় গীতিনৃত্যনাট্যের রূপ দিয়েছেন। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন সুকল্যাণ ভট্রাচার্য। নাটকটি মঞ্চে এনেছেন নৃত্যাঞ্চল। অভিনয় করেছেন শিবলি মোহাম্মদ এবং শামীম আরা নীপা।

নাটকটি গত ১৪ মার্চ পাটনায় প্রদর্শিত হয়েছে এবং ১৬ মার্চ দিল্লীতে মঞ্চায়ন হবে।

বারামখানা

নাট্যদল থিয়েটারের প্রযোজনায় বারামখানা নাটকটির মূলে রয়েছে লালন দর্শন। লালনের জীবনকেই এই নাটকের প্রধান উপজীব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর লালসালু উপন্যাসের মতো মাজার সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে এই নাটকে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস মনের মানুষ হতে অনুপ্রাণিত হয়ে নাটকটি রচনা করে করেছেন পান্থ শাহরিয়ার। নির্দেশনা দিয়েছেন ত্রপা মজুমদার। বারামখানা নাটকটি ১৮ ই মার্চ  ভারতের দিল্লীর কামানী মিলনায়তনে প্রদর্শিত হবে।

কিনু কাহারের থেটার

এ নাটিকের ঘটনা পুতনা রাজ্যের হলেও সাধারণ দর্শক হিসেবে মনে হয় এ গল্প বাংলাদেশেরই। রাজ্যের বিভিন্ন চরিত্র মনে করিয়ে দেয় আমাদের দেশের কিছু ক্ষমতালোভী, স্বার্থপর মানুষদের কথা। যারা বিভিন্ন অপরাধ করলেও তাদের শাস্তি হয় না। ক্ষমতার অপব্যবহারে তারা বেঁচে যায়। আর শাস্তি ভোগ করতে হয় কিনু কাহারের থেটার নাটকের ঘন্টাকর্ণের মত নিরপরাধ সাধারণ মানুষদের। প্রাচ্যনাটের কিনু কাহারের থেটার নাটকে এমন এক রাজ্যের কথা বলা হয়েছে যেখানে ক্ষমতাবানরা  অপরাধ করলে কোনো শাস্তি পেতে হয় না। কিন্তু একদিন পুতনা রাজ্যের বড় লাটের বুদ্ধির প্যাঁচে শাস্তি হয় রাজার। নাটকটি  রচনা করেন মনোজ মিত্র এবং নির্দেশনা দিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম। মঞ্চায়িত হবে ভারতের দিল্লীর অভিমঞ্চে আগামী ২১ মার্চে এবং ভোপালে আগামী ২৩ মার্চে।

ঈর্ষা

বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের মধ্যে ‘ঈর্ষা’ অন্যতম। এটি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক। ঈর্ষা নাটকে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী তিনজন ব্যাক্তির জীবনের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব। শিল্পের দ্বন্দ্ব, শিল্পীর দ্বন্দ্ব, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে ঈর্ষা নাটকটি। শিল্পের বর্ণনা করতে গিয়ে যৌনতার বর্ণনা করা হয়েছে এখানে। ঈর্ষা নাটকের চরিত্রগুলো দীর্ঘ সংলাপের মাধ্যমে বাস্তব জীবনকে উন্মোচন  করেছে। সৈয়দ শামসুল হক ঈর্ষা নাটকে অভিনেতারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের সৌন্দর্য তাদের অভিনয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দৃশ্যে উপস্থাপন করেছেন। নাটকটি প্রযোজনা করেছে নাট্যদল প্রাঙ্গণে মোর ও নির্দেশনা দিয়েছেন অনন্ত হীরা।