দিনু ঠাকুরের গানের ডালি

নাতি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের বানানে ঈ-কার পরিবর্তন করে ই-কার বসিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে। দিন+ইন্দ্র= দিনেন্দ্র। রবির আবির্ভাবেই যেন তাঁর প্রকাশ। অথচ তাঁর কাব্য প্রতিভা ‘রবি’র আড়ালেই থেকেছে সবসময়। এ কথা রবীঠাকুর নিজেই লিখেছেন দিনেন্দ্র রচনাবলীর ভূমিকায়। কবি আদর করে তাঁকে ডাকতেন ‘গানের ভাণ্ডারি’ বলে। কেননা দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৯ সাল থেকে পরবর্তী ২৫ বছর রবীন্দ্রনাথের ৭০০ গানের স্বরলিপি তৈরী করেন যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত মোট গানের তিন ভাগের এক ভাগ।

জীবদ্দশায় ‘বীণ’ নামে একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল দিনেন্দ্রনাথের। তাঁর মৃত্যুর পর ১৪টি গানের স্বরলিপি পাওয়া গেছে বিভিন্ন জায়গায় যা একসাথে করে তাঁর স্ত্রী কমলা দেবী দিনেন্দ্র রচনাবলী র মলাটে প্রকাশ করেছিলেন। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনোই তাঁর নিজের রচনা নিয়ে খ্যাতিলাভের আকাঙ্ক্ষা করেননি। কাব্যরসে তার মতো দরদী অল্পই দেখা গেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘চিরজীবন অন্যকেই সে প্রকাশ করেছে, নিজেকে করেনি। তার চেষ্টা না থাকলে আমার গানের অধিকাংশই বিলুপ্ত হত।’ ‘রবির কিরণ’ সামলে রাখতে গিয়ে পেছনে রয়ে গেছে দিনেন্দ্রনাথের নিজস্ব সাহিত্যকর্ম।

দিনু ঠাকুরের রচনা থেকে নয়টি নির্বাচিত গান নিয়ে দুই শিল্পীর যৌথ অ্যালবাম প্রকাশ করলো বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। ধানমণ্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে গত ২২ জুলাই সন্ধ্যায় শিল্পী সুকান্ত চক্রবর্তী ও অভিজিৎ মজুমদার এর কন্ঠে ধারণ করা দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সংকলন নিয়ে ‘আমার বেদনা লহ বুঝি’ শীর্ষক অ্যালবামটি প্রকাশিত হল। অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক।
অনুষ্ঠানে সুকান্ত চক্রবর্তী ও অভিজিৎ মজুমদার দ্বৈতসংগীত পরিবেশন করেন। অ্যালবাম থেকে দিনেন্দ্রনাথের গান ও কিছু রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে শিল্পীরা। দুইশিল্পীর গানের মাঝে রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথের লেখা থেকে পাঠ করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়।

অডিও অ্যালবাম নিয়ে কবি শঙ্খ ঘোষ মন্তব্য করেন, এতকালের দীর্ঘ অবহেলার পর, দুই বাংলার দুই সাহসী তরুণ, সুকান্ত আর অভিজিৎ, বিস্মৃত সেই গানগুলি থেকে ন-খানি গান বেছে নিয়ে আমাদের উপহার দিচ্ছেন সযত্ন ভালোবাসায়। এ-দুই তরুণের কাছে আমাদের তাই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক সুকান্ত চক্রবর্তী রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষা নিয়েছেন ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন থেতে। হরিপদ চৌধুরী থেকে শুরু করে ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন, সুমন চৌধুরী, মিতা হক, নীলোৎপল সাধ্য, রেজওয়ান আলী এবং লাইসা আহমেদের কাছে দীক্ষা নিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত এই শিল্পী ভূষিত হয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননায়। এবং অভিজিৎ মজুমদারের বেড়ে ওঠা কলকাতায়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতোকত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে শান্তিনিকেতনে পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি পণ্ডিত নীহাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিচ্ছেন এই তরুণ শিল্পী।