দ্বিজেন শর্মা: মুক্তচিন্তার নিসর্গপ্রেমী একজন বিজ্ঞান লেখক

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭। রাতের শেষার্ধে যখন পান্থপথ শান্ত, ভোরের সূর্য ঘুমাতুর চোখে উঠি উঠি করছে। শহর জেগে ওঠেনি তখনও। আমি আর শাহানা আপা (শাহানা চৌধুরী) স্কয়ার হসপিটাল থেকে বের হয়ে উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটছি- যেন গন্তব্য অজানা। কিছুক্ষণ আগে দ্বিজেন শর্মা স্যারকে স্কয়ারের আইসিইউ থেকে নেওয়া হলো শবঘরে। সেখানেই তাকে একা রেখে একে একে বিদায় নিলাম আমরা। রাস্তায় কিছুদূর সামনে একটি রিকশা দেখে শাহানা আপা ডাকতে গেলেন, আমি শুধু বললাম- থাক, চলুন হাঁটি। পাশাপাশি নিঃশব্দে হাঁটছি দু’জন, হাঁটতে হাঁটতে আমি কখন যেন চলে যাই ২০১০ সালের কোন এক সকালে।

আমি তখন স্থাপত্যের শেষবর্ষের ছাত্র। হাতে কিছু ড্রইং আর মাস মডেলের কয়েকটি ফটোগ্রাফ নিয়ে সেদিন হাজির হই সিদ্ধেশ্বরী রোডের ক্রিস্টাল গার্ডেন ভবনে। সেদিনই প্রথম সাক্ষাৎ দ্বিজেন শর্মা স্যারের সঙ্গে। এর আগে তাকে জেনেছি কিছু দৈনিক সংবাদ পত্রের কল্যাণে, তার কিছু লেখা পড়ে। তার বইয়ের মধ্যে ‌‌’নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’ আমার পড়া প্রথম বই। তখন আমি মগ্ন আমার থিসিসের ক্যাম্পাস মাস্টার প্ল্যান এবং তার ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনে, আর সেই সূত্রেই তাকে খুঁজে সেদিন তার বাসায় যাই। অনেক পরে জেনেছি স্থপতি এবং স্থাপত্যের ছাত্রছাত্রী তার পছন্দের মানুষ। তিনি বলতেন প্রকৃতিবিদ স্বপ্ন দেখতে পারেন কিন্তু স্থপতিই পারেন স্বপ্নের রূপ দিতে। একবার তিনি নটরডেম কলেজ ক্যাম্পাসে বাগান করার প্রস্তাব দেন ফাদারকে, তখন তিনি নটরডেম কলেজে কর্মরত। দ্বিজেন স্যারের প্রস্তাব শুনে সেদিন ফাদার নাকি তাকে দাঁড় করিয়েছিল কলেজ ক্যাম্পাসের মডেলের সামনে। কিছু তুলা জড়ানো কাঠি তার হাতে দিয়ে ফাদার বলেছিলেন, ‘এই লন, এই মাঠ সবই আছে, কোথায় কোন কোন গাছ লাগাবে দেখ।’ ‘সেদিন ছিল আমার ল্যান্ডস্কেপিং-এ প্রথম হাতেখড়ি’, আমার মডেলের ফটোগ্রাফ হাতে নিয়ে তিনি বলছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন যে ল্যান্ডস্কেপিং খুব সহজ বিষয় নয়, এর জন্য জানতে হবে বৃক্ষ, লতা-গুল্মকে। একটা বাড়ির পিছনে বড় গাছ লাগালে সবুজের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাড়িটিকে দেখতে ভাল লাগবে। আবার পশ্চিমদিকে এমন গাছ থাকবে, যা বাড়িকে পশ্চিমের সূর্যতাপ থেকে শীতল রাখবে। সেদিন স্যারের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করে আর প্রথম পরিচয়েই স্যারের ভক্ত হয়ে যাই।

শুধু স্থপতি হিসাবে নয়, একজন নিসর্গপ্রেমী হিসাবে ধীরে ধীরে গাছপালা সম্পর্কে জানতে, বুঝতে একসময় পরিচয় হয় স্থপতি মুশতাক কাদরীর সঙ্গে, যিনি স্থাপত্য থেকে প্রকৃতি ভালোবাসেন বেশি, কাজ করেন ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে। তার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে শুরু হয় বৃক্ষপ্রেমের নতুন অধ্যায়। তিনিও দ্বিজেন শর্মাকে মনে প্রাণে একজন গুরু হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। দ্বিজেন স্যারের ‘শ্যামলী নিসর্গ’ তার প্রিয় বই। তার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে আমি অন্য এক দ্বিজেন শর্মাকে খুঁজে পাই। শুরু করি তার লেখা বইগুলি পড়তে। উদ্ভিদবিজ্ঞান আমার অপ্রিয় ছিল, কিন্তু দ্বিজেন স্যারের হাতে নিরস বিজ্ঞান যেন সাহিত্যের ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। তার লেখা অন্যান্য বইগুলির মধ্যে ‘ফুলগুলি যেন কথা’ অসাধারণ একটি বই, বৃক্ষ চিনতে এই বইটি অনন্য।

পেশাগত কারনে তিনি জীবনের একটি বড় অংশ থেকেছেন মস্কোতে। কাজ করেছেন একটি অনুবাদ সংস্থায়। অনুবাদের পাশাপাশি লিখেছেন অনেক বই। ঘুরেছেন ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের অনেক দেশ। দেখেছেন কিউ গার্ডেনসহ অনেক পার্ক। সেই সময় থেকে স্বপ্ন দেখতেন ঢাকার রমনা পার্ককে নতুনভাবে সাজানোর। তার সেই স্বপ্ন আজ অনেকটাই বাস্তবায়নের পথে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ‘রমনা পার্কের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি’ নামে একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে, যে কমিটি দ্বিজেন স্যারের পরামর্শে রমনা পার্কের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। তিনি ভাবতেন আমাদের পয়েলা বৈশাখও হতে পারে জাপানের চেরি ব্লোজম এর মত কোন বর্ণিল ফুলময় উৎসব। অথচ পরিকল্পনার অভাবে আমরা এখনো বৈশাখকে রঙিন করে উপস্থাপন করতে পারি নাই। সেই আক্ষেপ থেকে বৈশাখকে বরণ করতে রমনার বটমূলের চারিদিকে অপরিকল্পিত গাছ অপসারণ করে লাগানো হয়েছে কুরচি, সোনালু আর জারুল। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে যে কটি গাছ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে তার অন্যতম এই তিনটি বৃক্ষ। বসন্তের শেষে সোনাইল গাছ গুচ্ছ গুচ্ছ হলুদে ভরে ওঠে, পত্রহীন গাছটিতে যেন হলুদের মেলা। আবার তার পাশেই জারুলের সবুজ পাতার কক্ষে কক্ষে বেগুনি রঙের বড় বড় ফুলের থোকা। আর পত্রহীন কুরচির সমস্ত গাছটি তখন শুভ্রতার চাদরে মুড়ে থাকে সাথে চমৎকার গন্ধ। এ যেন হলুদ আর বেগুনির সাথে সাদার শুভ্রতায় নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া। পাশাপাশি রমনাতে বেশ কিছু পায়ে হাঁটা পথের দু’পাশে একই বৃক্ষের বিথী তৈরি হচ্ছে। যখন সেখানে ফুল আসবে একই ফুলের লম্বা বিথী পার্কের সৌন্দর্য বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। রমনার লেকে নতুন করে রোপণ করা হবে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা, যা এখন অনেকটাই বিরল। শুধু কষ্ট লাগে স্যার তার স্বপ্ন অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেলেন এই আমাদের ছেড়ে।

দ্বিজেন শর্মা প্রকৃতি, বৃক্ষাদি ছাড়াও লিখেছেন সমাজতন্ত্র আর বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। ভাবতেন ঢাকা শহর নিয়ে। তার এক লেখায় তিনি লিখেছিলেন, “ঢাকা মহানগরের আশপাশের নদীগুলির দূষণ-বিষয়ক একটি আলোচনাসভায় বসে মনে পড়েছিল পঞ্চাশ দশকের বুড়িগঙ্গার কথা। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই বুড়িগঙ্গার পাড়ে গিয়ে দাঁড়াতাম। কোন জাহাজ বা লঞ্চ ভিড়তো না সেখানে। কতবার নৌকায় নদী পারাপার হয়েছি। স্বচ্ছ জলের স্বাভাবিক স্রোতস্বিনী। শুনেছি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর নবগঠিত পূর্ববঙ্গ-আসাম প্রদেশের রাজধানী এই বুড়িগঙ্গার পাড়ে নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। কেন জানি না, পরিবর্তে সেটা শুরু হয়েছিল প্রায় জনহীন নির্জন রমনা এলাকায়। বুড়িগঙ্গার পাড়ে হলে নদীটি আজও হয়ত এতটা দূষিত হত না। সেই নদীতীরে বসে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক’জন ছাত্র স্বপ্ন দেখতাম-ঢাকা একদিন উদ্যান-নগরী হবে, বুড়িগঙ্গার দুপারে থাকবে পামগাছ ও নিয়ন-আলো শোভিত বুলভার্দ, জিঞ্জিরার মাঠটিই হবে খোলা ময়দান। এখন ভাবি স্বপ্ন নয়, আমরা দিবাস্বপ্ন দেখতাম।”

তিনি ভালবাসতেন রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রকৃতিসাহিত্যের রাজাধিরাজ। আমি সর্বদাই কবির কাছে নতশীর, কৃপাপ্রার্থী, তাঁর অফুরান ভাণ্ডার থেকে দু’হাত ভরে কুড়োই সম্মোহক আনন্দের খোরাক, লিখতে বসে তুলে নিই তাঁর শব্দ ও শব্দগুচ্ছ, কাছে রাখি বনবাণী, সঞ্চয়িতা, গীতবিতান।” স্যারের বইয়ে পাঠক এক ভিন্ন রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাবে, তা অনেকটাই চেনা রবীন্দ্রনাথের বাইরে আরও আপন কোনো রবীন্দ্রনাথ। স্যারের লেখা অনেক বই এখনো আমার পড়া বাকি, ভেবেছিলাম সেগুলি পড়ব, সেগুলি নিয়ে কথা বলব। বই হয়ত পড়া হবে কিন্তু সেগুলো নিয়ে তাঁর সঙ্গে আর কোনো দিন কথা হবে না।

মৃত্যু মানে বিচ্ছেদ। কিন্তু মৃত্যু মহামানবদের কখনোই বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে না পৃথিবী থেকে। আমিও বিশ্বাস করি তিনি থাকবেন আমাদের মাঝে, তার বইয়ের প্রতিটি পাতায়, তার ভাবনায় আর স্বপ্নে। থাকবেন বেঁচে প্রকৃতির মত আমাদের প্রকৃতিপুত্র হয়ে।

 

ছবি: লেখক

লেখক: স্থপতি এবং ‘রমনা পার্কের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি’র সদস্য।