ধর্মভিত্তিক দলগুলোর পুনর্বাসনের কারণ জোটভিত্তিক নির্বাচন

জোটভিত্তিক নির্বাচনী রাজনীতির কারণে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনা রহিত হচ্ছে। এর ফলেই জামায়াতসহ ধর্মীয় রাজনৈতিক দলসমূহের পুনর্বাসন ঘটেছে। আর জোটভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ঘটেছে ফাস্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি, এই পদ্ধতিতে প্রতিটি নির্বাচনী আসনে একাধিক প্রার্থী অংশগ্রহণ করলেও যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পান তিনি নির্বাচিত হন) পদ্ধতির নির্বাচন ব্যবস্থার কারণে।

জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন আয়োজিত গুণীজন বক্তৃতায় ড. রওনক জাহান এসব কথা বলেন। গতকাল, শনিবার, বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এই বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক–শিক্ষার্থী ছাড়াও সংবাদপত্রের সম্পাদক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন আয়োজিত গুণিজন বক্তৃতামালার চতুর্থ আসরে এসব মন্তব্য করেন প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান। তিনি বলেন, এফপিটিপি পদ্ধতি দুই দলের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান তৈরি করে। কারণ, প্রধান দুটি দলই প্রায় সমানসংখ্যক জনপ্রিয় ভোট পেলেও আসন সংখ্যার পার্থক্যের ভিত্তিতে সরকারি ও বিরোধী দল নির্ধারিত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দুই দলই ৩১ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট পেলেও বিএনপির যেখানে ১৪০টি আসন লাভ করে, সেখানে আাওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৮টি। বিএনপি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জামায়াতের সহায়তায় সরকার গঠন করে। এভাবেই দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুই নির্বাচনী জোট ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর ঐতিহাসিক বিবর্তন মূল্যায়ন করেন ড. রওনক জাহান। বক্তৃতায় তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলসমূহ সাংগঠনিকভাবে দুর্বল, কাগজে-কলমে জাতীয়-স্থানীয় পর্যায়ে বিশাল দলীয় কাঠামো থাকলেও শুধুমাত্র নির্বাচনের সময়ই সাধারণত দলীয় কাঠামো সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর সামরিক শাসনামলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন রাষ্ট্রীয়-পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দল সংগঠনের চেয়ে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতিতেই বেশি মনযোগী ছিল। ১৯৯১ সালের পর বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে দল সংগঠনের চেয়ে অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়ের মিশনেই বেশি মত্ত হয়ে উঠে। রাজনীতিতে আদর্শের বদলে পদ ও সুবিধাই প্রধান হয়ে ওঠে।

সভাপতির বক্তব্য রাখছেন অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান

রাজনৈতিক দলসমূহের জনসম্পৃক্ততা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলসমূহ দলীয় প্রধান ও সরকার প্রধানকে আলাদা করার চেষ্টা করেনি। অন্যদিকে, দলে ভাঙন রোধে বিএনপি আওয়ামী লীগ দুদলকেই বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। সামরিক শাসনামলে রাজনৈতিক দল সংগঠনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে সংস্কৃতি চালু হয়, দুঃখজনকভাবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পরেও তা অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলেই আচ্ছন্ন থেকেছে। রাজনীতিতে অর্থের সমাগম সামরিক আমলে প্রথম পরিলক্ষিত হলেও নির্বাচনী গণতন্ত্রের আমলে তা নতুন মাত্রা লাভ করে। রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী রাজনীতিতে মাস্তানরা অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হওয়ার ফলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন প্রবণতা বাড়ছে। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, মাস্তান ও আইন-শৃক্সখলা বাহিনীর আঁতাত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পাকাপোক্ত হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কারণেই তরুণ প্রজন্মের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাাপক রেহমান সোবহান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ড. আহ্‌রার আহমদ এবং অধ্যাপক ড. রওনক জাহানের পরিচিতি পাঠ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান।

এর আগে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে তিনটি বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে বক্তৃতা পাঠ করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান দ্বিতীয় পর্বে বক্তৃতা করেন গবেষক ও লেখক বদরুদ্দীন উমর এবং তৃতীয় পর্বে বক্তব্য রাখেন এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।