নববর্ষের প্রত্যাশা: তবু হিল্লোল জাগে প্রাণে

বৈশাখ শুধু ঋতুচক্রমণের ধারাবাহিকতা নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্যচেতনার বলিষ্ঠ প্রকাশ। বাংলা সন, যার উদ্ভব ও বিকাশ অসাম্প্রদায়িক মোগল সম্রাট আকবর ফসলি সন হিসেবে, যা কালক্রমে বৃহত্তর বাঙালির অস্তিত্বসূচক উৎসবে রূপান্তরিত। এর সঙ্গে যেমন ফসল ও মৃত্তিকার ভাবনা জড়িত, তেমনি বাংলা নববর্ষ উৎসবও মূলত তৃণমূললগ্ন এক জন-উৎসবের প্রতীক।

বৈশাখ আসে ঝড় নিয়ে, উড়িয়ে দিতে পুরোনো জঞ্জাল। এই ধ্বংস-প্রতাপ নতুন দিনের প্রারম্ভ; নতুন বছর, সৃষ্টি সুখের উল্লাস। অন্ধকার ফুঁড়ে হেসে ওঠা সূর্য তোমায় অভিবাদন। এই ঘোর লাগা নতুন আলোয় কেমন দেখতে চাই চরাচর? কী প্রত্যাশা করি নতুন বছরে? কী প্রার্থনা মূর্ত হবে মঙ্গলবারতায়? অসুরবধের শোভাযাত্রায়?

শুরু করতে চাই অশুভ-সাম্প্রদায়িকতা-কূপমণ্ডূকতা-হানাহানি ভুলে নতুন করে। কিন্তু সবকিছু ভুলতে নেই। বৈশাখের মাহাত্ম্য ওই হালখাতায়। দেনাপাওনার ঋণ শোধও জরুরি। গত বছর বর্ষবরণের উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনা কি ভুলে যাব? এখনও অপরাধী ধরা পড়ল না! এমন নিষ্ক্রিয়তা আর আশ্বাস চাই না। হাজার হাজার মানুষের সামনে সেদিনের ঘটনার প্রতিবাদ মাত্র হাতে গোনা কজন করেছিল, নতুন বছরে অন্যায়ের প্রতিবাদ দেখতে চাই তীব্র, সংহত।

শুধু মুখে বলা নয়, চাই দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা। রবীন্দ্রনাথ নববর্ষে শান্তিনিকেতনে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘নূতনত্বের মধ্যে চিরপুরাতনকে অনুভব করিলে তবেই অমেয় যৌবনসমুদ্রে আমাদের জীর্ণ জীবন স্নান করিতে পায়। আজিকার এই নববর্ষের মধ্যে ভারতের বহুসহস্র পুরাতন বর্ষকে উপলব্ধি করিতে পারিলে তবেই আমাদের দুর্বলতা, আমাদের লজ্জা, আমাদের লাঞ্ছনা, আমাদের দ্বিধা দূর হইয়া যাইবে।’

নতুন বছরে ভেবে দেখতে চাই যাকে বাঙালিয়ানা বলছি তাতে কতটুকু সোনা আর কতটুকু ধার করা খাদ, গড্ডলিকা প্রবাহ। বর্ষবরণের উৎসবে তাই বিজাতীয় উদ্দাম বাজনার তালে হইহই রব আর ‘নতুন লাল-শাদা জামা ছাড়া বৈশাখ মাটি’ এমন ধারণা মনের দীনতা ও নববর্ষের চেতনার পরিপন্থী। কে বলে, ইলিশ-পান্তা খেলেই বাঙালি হওয়া যায়? ওর সঙ্গে বর্ষবরণের কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ক কি কেউ দিতে পারবেন? কিন্তু জাটকার মৌসুমে ইলিশ-অমৃত ভক্ষণের মাধ্যমে আমাদের বাঙালি হয়ে ওঠার চেষ্টায় অস্থির হয়ে পড়ে মাছের বাজার। এর রেশ ঢাকাবাসীকে বহন করতে হয় আরও কিছুদিন। সেই আত্মঘাতী পেটুকী স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে চাই নতুন বছরে।

গত একটা বছর রাজনীতির অঙ্গন বেশ শান্ত। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রাজপথে সহিংসতা ও রক্তারক্তি বেশ কমে এসেছে। দলীয় প্রতীকে পৌর ও ইউপি নির্বাচনে সব দল অংশ নিয়েছে- এটা ভালো দিক। কিন্তু ভোটকে ঘিরে যে প্রাণহানি ও দলাদলি, তা নতুন করে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে মানুষকে। সেই সঙ্গে, একের পর এক ব্লগার, প্রকাশক ও মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীদের ওপর হামলা নিরাপত্তাহীনতার নতুন উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। গত বছর একের পর এক শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা আমাদের ধর্মীয় সহনশীলতা ও উগ্রবাদবিরোধী জাতীয় চেতনাকে তুমুলভাবে নাড়া দিয়েছে। বগুড়ার শিবগঞ্জের হরিপুরে শিয়া মুসলিমদের মুসল্লিরা যখন সিজদায়, তখন গুলি চালিয়ে একজনকে হত্যা ও তিনজনকে জখম করা হয়েছে। তার মাস খানেক আগে, পুরান ঢাকার হোসেনি দালানের ইমামবাড়ায় মহররমের জলুসে বোমা হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ বছরেই দিনাজপুরে বিভিন্ন জায়গায় আক্রান্ত হন খ্রিস্টান যাজকেরা। ঠাকুরগাঁওয়ের জয়নন্দ ইস্কন নামহট্ট মন্দিরে ঘটে বোমা হামলা ও গুলিবর্ষণ। এসব ঘটনায় আল-কায়েদা ও আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন জড়িত বলে সাইট ইন্টেলিজেন্সে দাবি করা হয়েছে। তবে,

সরকার এই দাবি নাকচ করে বলেছে, আইএস বা আল-কায়েদার অস্তিত্ব নেই বাংলাদেশে। এই পরস্পরবিরোধী দাবি নিয়ে বিতর্ক না তুলে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ এক গভীর অসহনশীল ও অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে চলেছে। কারণ, কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার এখনো সম্ভব হয়নি। এই উগ্রবাদ থেকে মুক্তি চাই নতুন বছরে। চাই অসাম্প্রদায়িকতা ও উদার গণতান্ত্রিক চেতনায় নব-উদ্যমে জেগে উঠবে বাংলা ও বাঙালি।

এত নেতিবাচক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। মোটা ভাত আর মোটা কাপড়ের যে স্বপ্ন, সেই লক্ষ্যে অনেকটাই এগিয়েছে দেশ। এবারই প্রথম ৭ শতাংশের ওপর অর্জিত হতে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধি। আর তেমনটি হলে গত এক দশকের ৬-এর ঘরে ঘুরপাক খাওয়া জিডিপি উন্নীত হবে নতুন উচ্চতায়। আমরা যদি আর্থিক ঘূর্ণাবর্ত ভাঙতে পারি, তবে সাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তবুদ্ধির ওপর আঘাতকারীদের কেন প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে পারব না? নতুন বছরে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে দূর হবে সেই অশুভ শক্তি- সেটাই শান্তিপ্রিয় বাঙালির প্রত্যাশা।

গত বছর বারবার আমাদের উৎসবের উপলক্ষ এনে দিয়েছে ক্রিকেট দল। যদিও বিশ্বকাপে টাইগাররা খুব একটা ভালো করেনি। কিন্তু লড়াই করার মানসিকতা গর্বিত করেছে পুরো জাতিকে। এ ক্ষেত্রে ফাইনালে উঠতে না পারলেও অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে আমাদের ক্ষুদে টাইগারদের বছরে খেলার মাঠের খুশি ছড়িয়ে পড়বে বাংলার শহর-বন্দর-গ্রামে- সেই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

পিছিয়ে নেই প্রবাসীরাও। বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা যেমন তারা পাঠিয়েছেন, তেমনি অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে বাড়িয়েছেন বাংলাদেশের মান।

আমেরিকায় নারী সাংবাদিকতায় বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য ‘গ্র্যাসিজ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তাসমিন মাহফুজ। গত বছরই কানাডার অত্যন্ত সম্মানজনক পদক ‘দ্য টরন্টো স্টার হাইস্কুল নিউজপেপার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই তরুণী অনন্যা রাফা ও চিত্রা চৌধুরী। ওরাও আমাদের আশাবাদী করে, স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগায়।

চিত্রা কাব্যগ্রন্থে নববর্ষে নামক কবিতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘নিশি অবসানপ্রায়, ওই

পুরাতন/ বর্ষ হয় গত/ আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত/ বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ আমিও ক্ষমা চাই, একজন সচেতন-শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে আচরণ করিনি বলে, যখন কোনো কোমলফুল অনাদরে মূর্ছা গেছে তখন নীরব থেকেছি বলে, দেশ হোক, সমাজ হোক, সমাজ হোক, পরিবার হোক, আমি শুধু পেতে চেয়েছি, দিতে চাইনি আন্তরিকভাবে।

মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, আমি বলি, নিজের ওপর বিশ্বাস হারানো আত্মঘাতী, যা পুরো সমাজ-সভ্যতাকে অধঃপাতে নিমজ্জিত করে। বৈশাখী ঝড়ে সেই ভয়ডর যেন জয় করি প্রভু। এবারের বৈশাখে সভ্য মানুষকে বলি, আমরা লড়ব। হাতের মুঠোয় হাজার বছর, সামনে চলবই। ঝোড়ো মেঘের যদি হাসে গগনে, জানি মিলবে স্বস্তির বৃষ্টি; মনের খোরাক হবে কলিকা জারুল। কৃষ্ণচূড়া মনে রং লাগাক, ফুটুক যৌবন।