নববর্ষে সংগীতমুখর বেঙ্গল বই

বাঙালির ঐতিহ্যে ও জীবনযাপনে নববর্ষের আবেদন সর্বজনীন। সুন্দর আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে আসে বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখ। এসময় উৎসবে মুখর হয়ে ওঠে গোটা দেশ, মানুষ ও সমাজ। নতুন আশা, উৎসাহ আর গভীর মানবিক উজ্জীবনকে সঙ্গী করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সবাই। সেই শুভকামনা উজ্জীবীত রাখতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজন করে গানের আসর ‘পরান ভরি দাও’। গত ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল লালমাটিয়ার বেঙ্গল বইয়ে আয়োজিত হয় চার দিনব্যাপী সংগীতানুষ্ঠান।

আয়োজনের প্রথমদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের দলীয় সরোদ পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে বৈশাখ উৎসব অনুষ্ঠান শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা সমবেতভাবে সরোদে রাগ ভুপালী বাজিয়ে শোনান। সরোদ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন ইলহাম ফুলঝুরি খান, ইশরা ফুলঝুরি খান, মো. সাদ্দাম হোসেন এবং শরীফ মোহাম্মদ আরেফীন রনি। তাদের তবলায় সহযোগিতা করেন রতন কুমার দাশ এবং পিনুসেন দাশ। অনুষ্ঠানের পরের উপস্থাপনা ছিলো শারমিন সাথী ইসলামের পঞ্চকবির গান এবং হাসান আরিফের কবিতা পাঠ। বাংলা কাব্য সাহিত্যে পঞ্চগীতিকবির এই বাণীপ্রধান গান বাঙালীর প্রাত্যহিক জীবনের প্রেরণার উৎস। একই মঞ্চে কন্ঠশিল্পী ও বাচিকশিল্পীদ্বয়ের পরিবেশনা শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। এসময় যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন, তবলায় গৌতম সরকার, এসরাজে একরাম হোসেন, কীবোর্ডে রবিনস্ এবং মন্দিরায় প্রদীপ রায়।

সরোদ পরিবেশন করছে বেঙ্গল পরম্পরা’র শিক্ষার্থীরা

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন শুক্রবারে আয়োজনে ছিলো সময় চেতনার গান নিয়ে জনপ্রিয় গানের দল ‘জলের গান’- এর পরিবেশনা। বাংলা নাগরিক গানের এই দলটি তাদের উদ্ভাবিত নানারকম যন্ত্রসহযোগে গান গেয়ে থাকে। লোকসংগীত অঙ্গের গানে আর নৃত্যদোদুল ছন্দে জলের গানের পরিবেশনা ছিল মনোমুগ্ধকর, এ সময় বিপুলসংখ্যক শ্রোতা সমাগম ঘটে বেঙ্গল বই প্রাঙ্গনে।

দ্বিতীয় দিন মুখর ছিলো জলের গানের পরিবেশনায়

তৃতীয় দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বেঙ্গল বই প্রাঙ্গনে ছিলো দিনব্যাপী পথিক বাউলের বাঁশি আর গানের পরিবেশনা। ফরিদপুর হতে আগত বাউল শিল্পীরা গানে ও বাজনায় মাতিয়ে রাখেন শ্রোতাদের। বাউলরা তাদের লোকজ যন্ত্র যেমন একতারা, বাওয়া, খমক, সারিন্দা ইত্যাদি বাজিয়ে গান করেন। শিল্পীরা ছিলেন সিরাজ বাউল, মহর বাউল, সুমন বাউল, আরিফ এবং শিশু শিল্পী আরিফা। শিল্পীদের সাথে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন হারমোনিয়ামে আব্দুল আজিজ, বাঁশিতে মো. আখতারুজ্জামান, মন্দিরায় মো. আব্বাস এবং ঢোলে মাসুদ সরকার।

তৃতীয় দিনের বাউল সংগীত পরিবেশনা

চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের চতুর্থ এবং শেষ দিন। সন্ধ্যার এই আয়োজনে আজ ছিল লোকসংগীতের আসর। অনুষ্ঠানের শুরুতে গাইলেন শিল্পী হালিমা পারভীন। তিনি গাইলেন লালন সাঁইজীর ‘আমি ওই চরনের দাসের যোগ্য নই’, রামপ্রসাদ সেনের ‘মন রে কৃষি কাজ জান না’, জালাল উদ্দিন খাঁর ‘মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এ মন্ত্রনা কে দিয়াছে’, বিজয় সরকারের ‘তুমি জানোনা রে প্রিয় তুমি মোর জীবনের সাধনা’, উকিল মুন্সীর ‘লীলুয়া বাতাসে প্রাণ জুড়ায়’। চার দিনের উৎসবের শেষ শিল্পী ছিলেন ভজন বাউল। ভজন লালন সাঁইজীর ‘ইলাহী আলামিন গো আল্লাহ’, ‘কি এক অচিন পাখি পুষলাম খাঁচায়’, ‘রাত পোহালে পাখি বলে দেরে খাই’, ‘কখন সাঁই অতল রূপে’, আব্দুল হালিমের ‘ডুব দিলে না পাক দরিয়ায়’, ভবা পাগলার ‘এখনো সেই বৃন্দাবনে বাঁশি বাজে রে’, সুনীল কর্মকারের ‘বন্ধু আইলোনা আইলোনা আমারে দেখিতে’ সহ বেশ কিছু গান পরিবেশন করেন। শিল্পীদের সাথে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন তবলায় গৌতম সরকার, ঢোলে বিশু, বাঁশিতে কৌশিক, দোতারায় মোক্কাদেছ এবং কীবোর্ডে ইফতেখার হোসেন।

লোকসংগীত পরিবেশন করছেন শিল্পী হালিমা পারভীন

চারদিনের সব অনুষ্ঠানই সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিলো। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে শত শত দর্শনার্থী উপভোগ করেছেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের এই আয়োজন। অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্বই সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।