নববর্ষ : বাঙালির সর্বজনীন উৎসব

অস্থিরতা ও বিপন্নতায় মানব সমাজের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা দিশাহীন হয়ে পড়ছে। সংকট আর উন্মূল বেদনায় মানুষ খুঁজে চলছে তার স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ। সে জন্য সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে নবীন বোধে উজ্জীবিত করার
অভিপ্রায়েই বাঙালির প্রাণের বৈশাখী উৎসব জীবনচর্যায় ও মনন সাধনায় খুবই তাৎপর্যময় হয়ে উঠছে। পয়লা বৈশাখ থেকেই যাত্রা শুরু হয় নবীন বোধে দীপিত হবার সাধনা। সারা মনপ্রাণে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে নতুন বছরে নতুন কিছু করার সংকল্প। চোখে ভাসে স্বপ্ন। মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত এক বোধ আমাদের চেতনাকে আরও উজ্জীবিত করে তোলে। আর শুধু দিনযাপনের প্রাণ ধারণের গ্লানি নয়, নবীন আলোকে পথচলারও এক স্বপ্নসঞ্চার আমাদের পথ দেখায়। বৈশাখ প্রতিবছর ভাবনায় যে পথ ছুঁয়ে যায়, সেখানে বাঙালি আবাহন করে নবীন কিছু করার সাধনা। মানবের সঙ্গে মানবের যুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষায় সংস্কৃতিচর্চার আর কোনো বিকল্প নেই। সে জন্য একদিকে আমাদের ঐতিহ্যের প্রবহমান ধারায় অবগাহন; অন্যদিকে সৌন্দর্যে আর সাধনায়, সংগ্রামে, আকাঙ্ক্ষায় স্বপ্ন ও জাগরণে জীবনযাপনের সঙ্গে একাত্ম আধুনিক এক মানবতার আদর্শ খোঁজার লক্ষ্য নিয়েই বৈশাখ উদ্‌যাপিত হচ্ছে।
বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের অন্তিম পর্যায়ে ছায়ানট নববর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে রমনার বটমূলে বাঙালি সম্মিলনের মধ্য দিয়ে যে নববর্ষ উদ্‌যাপনের যাত্রা শুরু করেছিল, তা ক্রমে প্রসারিত চেতনা নিয়ে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনচর্চা ও সাধনায় তা নবমাত্রা যোগ করেছে। সংস্কৃতিচর্চায় ঘটিয়েছে আশ্চর্য এক জাগরণ। শুধু একাত্তরে এই অঞ্চলের বাঙালি সমাজ নববর্ষ উৎসব উদ্‌যাপন করতে পারেনি। দেশ ছিল অবরুদ্ধ। আর কে না জানে, পাকিস্তানি স্বৈরশাস- কদের কাছে পয়লা বৈশাখ বা বাঙালির নববর্ষ উদ্‌যাপন ছিল ভাবাদর্শের পরিপন্থী।
ষাটের দশক থেকে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রাণের উৎসব হয়ে উঠছে নববর্ষ। সত্তরের দশকে এই নববর্ষ উদ্‌যাপন আরও প্রসারিত হতে থাকে। ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের সব শহরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা ও সম্মিলনে বাঙালিত্বের সাধনা মাত্রা পেতে শুরু করে; নববর্ষ উদ্‌যাপন হয়ে ওঠে সর্বজনীন প্রাণের উৎসব। ঢাকাসহ বৃহৎ ও ক্ষুদ্র শহরগুলোতে দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠান বাঙালির চিত্তে আনন্দের সঙ্গে আশারও জন্ম দেয়।
ঢাকার রমনার বটমূলে প্রভাতি সম্মিলনে সংগীতে স্নাত হয়ে এই আবাহন শুরু হয়।
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চারুকলা অনুষদের শিক্ষাব্রতী ও সুহৃদদের নিয়ে এক মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন। এই শোভাযাত্রা দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গকে ধারণ করে শহর প্রদক্ষিণ করে। আপামর দেশবাসীর কল্যাণ কামনায় মাঙ্গলিক প্রার্থনাও নববর্ষ আবাহনে নবীন মাত্রা যুক্ত করছে। এ ছাড়া শহরে, গ্রামে-গঞ্জে নববর্ষ আবাহন ও উদ্যাপনের জন্য যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তাতে নবীন প্রজন্ম উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে বাংলা নববর্ষের কোনো আবেদন বা আবাহন ছিল না, তা নয়। ১৯৫১ সালের এপ্রিলে ঢাকার মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে নববর্ষকে আবাহন করা হয়েছিল রবীন্দ্র-নজরুলের গান দিয়ে। এই উৎসবের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী, অজিত গুহ, লায়লা সামাদ প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় মননজীবী। তৎকালীন সময়ে মফস্বল শহরগুলোতেও এই আবাহন সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে মানবের বন্ধনকে খুবই দৃঢ় করে তুলেছিল।
বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে ফসলকে কেন্দ্র করে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন শত শত বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই একটি সর্বজনীন উৎসব, যা হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আলোড়িত হয়ে কত ধরনের অনুষ্ঠানই যে হয়ে থাকে। মেলা বসে গ্রামে-গঞ্জে; ঐতিহ্যের ধারায় গণমানুষের এ মেলায় সব বয়সের মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। কখনো সপ্তাহব্যাপী এসব মেলায় বিনোদনেরও নানা কর্মসূচি থাকে। যাত্রা, পালাগান, নৃত্য এবং গীতে মুখর হয়ে ওঠে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ। এই সম্মিলন ও ঐতিহ্যিক ধারায় নিমজ্জনে আমাদের জাতীয়তাবোধও নবীন প্রাণ পেয়ে যায়।
ড. মুহম্মদ এনামুল হক বাঙালির নববর্ষ নিয়ে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। তিনি ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘পয়লা বৈশাখ’ বা ‘বাংলা নববর্ষের’ রূপ তার আচরিত অনুষ্ঠানগুলোতেই ধরা পড়ে।
প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবীর যেকোনো জাতীয় উৎসবের রূপ তার প্রতিপালিত অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। ‘বাংলা’ নববর্ষের জন্য এ কোনো বিশিষ্ট ব্যবস্থা নয়। ‘পয়লা বৈশাখ’ (অর্থাৎ গ্রীষ্ম ঋতুর আগমনের তথা সারা বৈশাখ মাসের প্রতীকরূপী এই দিনে) বাঙালি স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তচাঞ্চল্যের বহুমুখী অভিব্যক্তিতেই বড়-ছোট নানা অনুষ্ঠানে রূপ গ্রহণ করে থাকে।
‘পয়লা বৈশাখে’ বাংলা জনসমষ্টি অতীতের সুখ-দুঃখ ভুলে গিয়ে নতুনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওঠে। তারা জানে, এ নতুন অনিশ্চিতের সুনিশ্চিত সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। তাই মন সাড়া দেয়, চঞ্চল হয়, নতুনকে গ্রহণ করার প্রস্তুতি নেয়। তারা সেদিন প্রাত্যহিক কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে, ঘরবাড়ি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে, আটপৌরে জামাকাপড় ছেড়ে, ধোপদুরস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ পরে, বন্ধুবান্ধব-আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা করে আহারে মেতে ওঠে।
এই উৎসবে চৈত্র মাসের শেষ দিন এবং নববর্ষ বিদায় ও আবাহনের মধ্যে আমরা আত্মানুসন্ধানের এক বোধকে প্রত্যক্ষ করি। রাষ্ট্র, সমাজ ও আপামর জনসাধারণ এই আত্মানুসন্ধানে হিসাব-নিকাশ করে প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি এবং স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার বিষয়গুলো। সেদিক থেকে এই নববর্ষ কেবল হয়ে থাকে না আনন্দ উৎসব। নবীন বোধ ও স্বপ্নসঞ্জাত এক সড়ক তৈরি হয়। নববর্ষ উদ্যাপনের সার্থকতা এখানেও নিহিত। একালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এ দেশে নববর্ষ উদ্যাপন বা আবাহনে এক সাংস্কৃতিক তাৎপর্য লক্ষ করেছেন এবং এই জাগরণকে ঐতিহ্যিক প্রবাহে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ বলেছেন। তাঁর এ বিশ্লেষণ ও মনোভঙ্গিতে গহন গভীর এক উপলব্ধির প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, ‘একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটা আরও সর্বজনীন রূপ পায়, যেখানে রাজনীতির গন্ধ নেই, ধর্মের গন্ধ নেই। এটা এমন এক উৎসব হয়ে উঠল, যেখানে প্রতিটি লোক তার নিজস্ব চিন্তা-রুচি-ভালো লাগার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে।’
লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ শামসুজ্জামান খান এ প্রসঙ্গে যে কথাটি বলেছেন, তা বেশ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে উৎসব নতুন ধরণ ও নব তাৎপর্য লাভ করেছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক জীবনবোধ ও জীবনজিজ্ঞাসার নানা প্রতীকী অর্থ ও উদ্ভাবনাময় ব্যঞ্জনা। বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় উৎসব। জাতীয় সংহতি ও ঐতিহ্যের বিস্তার ও নবায়নে উৎসবের গুরুত্ব তাই অসামান্য।’
বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে ফসলকে কেন্দ্র করে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন শত শত বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই একটি সর্বজনীন উৎসব, যা হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আলোড়িত হয়ে কত ধরনের অনুষ্ঠানই যে হয়ে থাকে। এই সম্মিলন ও ঐতিহ্যিক ধারায় নিমজ্জনে আমাদের জাতীয়তাবোধও নবীন প্রাণ পেয়ে যায়।