নব আলোয় জ্ঞানের বাতিঘর

শ্রেয়বোধের সংকল্পদাতা, জ্ঞানচর্চার প্রেরণাদাতা, বাংলা ও বাঙালিকে আমাদের চেতনায় স্থাপনকর্তা, গভীরতম শুদ্ধতম অর্থে আমাদের শিক্ষক, প্রাচীন আচার্যের মতো চিরকুমার জ্ঞানতাপস- আব্দুর রাজ্জাক। তৎকালীন পূর্ব বাংলা এবং বর্তমান বাংলাদেশ; এমনকি সমগ্র উপমহাদেশে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর যুগোপযোগী চিন্তাধারা, বিশ্লেষণ অনুপ্রাণিত করেছে সমসাময়িক চিন্তকদের।

আজীবন জ্ঞানপিপাসু অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। তাঁর শিক্ষাজীবন খুব সাদামাটাভাবে শুরু হলেও জ্ঞানপিপাসা তাঁকে স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দেয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য লন্ডনে যান। এই সময়ে তাঁর মানসভুবন পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞান নয়, মানববিদ্যার সব শাখা থেকে তিনি জ্ঞান আহরণ করেন। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি হয়ে ওঠে তাঁর আগ্রহের বিষয়। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর বিদ্যানুরাগ ও পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।

সমগ্র জীবন তিনি ব্যাপৃত ছিলেন শিক্ষকতায়। জ্ঞানদানে ও বিদ্যার্থীদের মধ্যে নিত্য নবজিজ্ঞাসা সঞ্চারে, এই কর্মকে ব্রত হিসেবে নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এ দেশের শিক্ষা ও মননজগতের এক প্রাণময় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। বহু বিদ্যার্থী তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের মানসভুবনকে করেছেন সমৃদ্ধ। জ্ঞানপিপাসা, পাঠাভ্যাস এবং শিক্ষাদানে তাঁর মতো তুল্য কোনো ব্যক্তি ছিলেন না এ দেশে। সে জন্য তাঁকে বলা হতো শিক্ষকদেরও শিক্ষক।

অকৃতদার এই মানুষটির জীবনসাধনা ও চর্চার সঙ্গে মিশে ছিল প্রাত্যহিক গ্রন্থপাঠ। কত ধরনের বই যে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। বিচিত্র বিষয়ে ছিল তাঁর আগ্রহ। গ্রন্থই ছিল তাঁর জীবনসঙ্গী ও জ্ঞান আহরণের উপায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সুবিদিত হলেও শিল্প ও সাহিত্যের সমকালীন গ্রন্থপাঠ তাঁর জীবনসাধনায় অঙ্গীভূত হয়েছিল। চিরায়ত সাহিত্যের তিনি ছিলেন বিশেষ অনুরাগী।

জ্ঞানতাপসের প্রয়াণের পর তাঁর দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা গ্রন্থভাণ্ডার বিশেষ যত্ন ও পরম মমতায় আগলে রাখেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। আবুল খায়ের দীর্ঘদিন স্বপ্ন দেখেছেন পিতৃব্যের সংগৃহীত বই নিয়ে একটি পাঠাগার স্থাপনের। তাঁরই উদ্যোগে ও সহায়তায় ‘জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ’ বাস্তবায়িত হয়েছে ২০১৫ সালের নভেম্বরে। আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের উদার সহযোগিতা ও নিরন্তর তাগিদ এ ক্ষেত্রে স্মরণীয়। লাইব্রেরি ও পাঠাগার- এই প্রচলিত বোধ থেকে বেরিয়ে আরও প্রসারিত চেতনাকে ধারণ করে এর নামকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যাপীঠ। এই শব্দটি বৃহত্তর চেতনাকে ধারণ করেছে। শুধু গ্রন্থপাঠ নয়, এই বিদ্যায়তনে গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে।

ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবর-সংলগড়ব, বাড়ি ৬০, সড়ক ৭/এ গত বছরের নভেম্বর থেকে যাত্রা শুরু করে আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ। এটি উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের, আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি ড. হামিদা হোসেন ও মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠের মহাপরিচালক পদে অধিষ্ঠিত আছেন অধ্যাপক ড. আহ্‌রার আহমদ।

গভীর অধ্যয়ন ও সক্রিয় গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার জন্য আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় লাইব্রেরি এবং তৃতীয় তলায় প্রদর্শনালয়। এখানে শিল্পী ও গবেষকদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও আবাসিক কর্মশালারও পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেখানে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিল্পীরা তাঁদের গবেষণা ও নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে পারবেন। ভবনের নিচতলায় স্থাপিত হয়েছে বরেণ্য শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ স্মরণে সফিউদ্দীন-বেঙ্গল প্রিন্টমেকিং স্টুডিও।

বিদ্যাপীঠ পাঠাগারে বর্তমান বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। এর মধ্যে রয়েছে ৩৬টি অভিধান, ১৯৬টি এনসাইক্লোপিডিয়া, ৩০টি অ্যাটলাস, ১১টি বিবলিওগ্রাফি, ১৬টি ইনডেক্স, ইংরেজি ও অন্যান্য সাহিত্যের ৩৭১টি বই, অর্থনীতির ২৩১টি, শিল্প ও সংস্কৃতি-সংস্কৃতির ১৬৬টি, বাংলা সাহিত্যের বই ৪০৫টি, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম ১১৮টি, পরিবেশ ও ভূগোল ২১টি, ইতিহাস ও রাজনীতি ২০২২টি, বিজ্ঞান ৭৭টি, ভাষা ৬৯টি, জীববিজ্ঞান ২০টি, রসায়ন ৪টি, সমাজবিজ্ঞান ৩৫৭টি, অন্যান্য ভাষার বই ২৫টি, জার্নাল ও ম্যাগাজিন ১৮৬টিসহ নানা বিষয়ের বিভিন্ন ধরনের বই।

শনি থেকে বুধবার প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রোববার বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই লাইব্রেরি। লাইব্রেরির ব্যবস্থাপক রাজীয়া সুলতানা জানালেন নিয়মকানুন। জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট কিংবা জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপি এবং ২ কপি পাসপোর্ট ও ১ কপি স্ট্যাম্প সাইজের ছবিসহ সদস্য ফরম পূরণ করে যে কেউ লাইব্রেরির সদস্য হতে পারবে। এবং সদস্যপদের মেয়াদ থাকবে এক বছর পর্যন্ত। আর সদস্য ছাড়া লাইব্রেরির কোনো সুবিধা নেওয়া যাবে না।

আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ একটি গবেষণা পাঠাগার। সংগ্রহের বইগুলো নির্দিষ্ট সময়ে এই ভবনেই পাঠ করতে হয়। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সংগৃহীত বইগুলো গবেষক, তরুণ পাঠক ও বিদ্যানুরাগী ছাত্র-ছাত্রীর মানসভুবনকে সমৃদ্ধ করবে ও জিজ্ঞাসু করে তুলবে, সে আশাই পোষণ করেন রাজ্জাক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ।

আহ্‌রার আহমদ

মহাপরিচালক

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন

আব্দুর রাজ্জাক স্যার ছিলেন জ্ঞানের বাতিঘরের মতো। প্রথাগত শ্রেণি শিক্ষকের বদলে তিনি আমাদের কাছে ছিলেন শিক্ষাগুরু। একজন আলোকিত মানুষের প্রতিমূর্তি বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন তা-ই। জ্ঞান অন্বেষণে এবং চর্চায় তিনি ছিলেন আমাদের সবার দিশারি। শুধু বিশেষ কোনো বিষয়ে দক্ষ হওয়ার জন্য নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনের পথে কীভাবে এগিয়ে চলা যায়, স্যার সেটা দেখিয়ে দিতেন।

স্যারের অনুপস্থিতিতে তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি রেখে গেছেন তাঁর সংগ্রহের বই। সেই সমৃদ্ধ বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ। লাইব্রেরির পাশাপাশি এখানে একটি ছাপচিত্র নির্মাণ কর্মশালা এবং একটি ওপেন স্টুডিও রাখা হয়েছে। শুধু লাইব্রেরির কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য বৃত্তি প্রদানসহ অন্যান্য সহায়ক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা নিয়েছে। যেমন গবেষকদের স্কলারশিপ দেওয়া, রিসার্চ ফেলোশিপ প্রদান, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের জার্নাল প্রকাশের পরিকল্পনা আছে। জ্ঞানচর্চাকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটাই এই ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যেসব গবেষণা হওয়ার কথা, তার সহায়ক হিসেবে কীভাবে কাজ করা যায়, সেই প্রচেষ্টাও থাকবে। সর্বোপরি, জ্ঞানচর্চার প্রক্রিয়াকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেই চেষ্টা থাকবে সব সময়। এ জন্য নিয়মিত আর্টিস্ট ক্যাম্প, কবিতাপাঠের আসর, আলোচনা ও সেমিনারের আয়োজন করা হবে। এর সঙ্গে নতুন বই প্রকাশ এবং তা নিয়ে আয়োজন করা হবে আলোচনার। সে কারণে এই লাইব্রেরিকে আমি বলব ‘A Center for Excellence in the Pursuit of Knowledge’।

রাজ্জাক স্যার আমাদের কী পড়িয়েছেন, তার চেয়ে বেশি জরুরি তাঁর আদর্শের চর্চা। কারণ, তিনি আমাদের এই শিক্ষাটা দিয়েছেন, ‘পড়ো, জানো, প্রশ্ন করো’। স্যারের এই স্বপ্ন ও আদর্শের চর্চা আরও বেগবান করতে সহায়ক হবে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ।