নাটক থেকে দূরে থাকা হয়নি কখনও

থিয়েটার অঙ্গনের পরিচিত নাম আনিসুল হক বরুণ। সমানভাবে জনপ্রিয় টেলিভিশন নাটকেও। অভিনয় ও নির্দেশনা নিয়ে তার সঙ্গে জমে ওঠে আলাপচারিতা…

আপনার অভিনয় ক্যারিয়ার কত দিনের?
মঞ্চে অভিনয় শুরু করি ১৯৮৭ সাল থেকে। প্রথম মঞ্চনাটকের মহড়ার অভিজ্ঞতা যান্ত্রিক নাট্যগোষ্ঠীর ‘ঈশ্বর ফিরে যাও’ নাটকের মাধ্যমে। যদিও এটার স্টেজ শোতে আমি অভিনয় করতে পারিনি। তারপর কারক নাট্য সম্প্রদায়ের পথনাটক ‘টিয়া পক্ষীর সমাচার’ দিয়ে শুরু হয় অভিনয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের আঞ্চলিক নাটকে প্রথম অভিনয় করি ২০০৩ সালে। এরপর ২০০৭ সালে সালাহউদ্দিন লাভলুর ‘সাকিন সারিসুরি’ নামক একটা মেগা সিরিয়ালের মধ্য দিয়ে নিয়মিত অভিনয় শুরু করি।
কোন মাধ্যমে অভিনয় বেশি উপভোগ করেন- মঞ্চে, না টিভিতে?
দুটো মাধ্যমেই অভিনয়ের কিছু কৌশলগত পার্থক্য আছে। কিন্তু দুটো কাজই আমি সমানভাবে উপভোগ করি।
আপনি তো মূলধারার থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত আছেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে কাজ করছেন। আমরা জানি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি ‘যুদ্ধ পুরান’ নামে একটি থিয়েটার করেছেন। এ সম্পর্কে কিছু বলেন। 

এই নাটকের বিশেষত্ব হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদেরা এই নাটকের চরিত্র এবং এই চরিত্ররা তাদের নিজ নিজ শহীদ হওয়ার ঘটনাগুলো বিনিময় করেছেন আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে। এই নাটকের আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা। এ নাটকের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছিলাম, শুধু সম্ভোগেই নয়, উপভোগেও পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা সম্ভব।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে কাজ করছেন। নিয়মিত থিয়েটার করছেন। পেশা আর প্যাশনের সমন্বয় করছেন কীভাবে?
সমন্বয় করার প্রয়োজন তাদের হয়, যাদের পেশা ও প্যাশনের দূরত্ব থাকে অনেক। আমার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম এটাই যে আমার পেশা ও প্যাশনের দূরত্বটা কম। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন মূলত সংস্কৃতি বিকাশ ও বিকাশের সহযোগিতামূলক কাজ করে থাকে। তাই সংস্কৃতির যেকোনো মাধ্যমেই কাজ করার একটা বড় সুযোগ রয়েছে এখানে। সংস্কৃতিচর্চার বিষয়গুলো এখানে ভালোভাবেই সমাদৃত। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- চিত্রকলা, সংগীতকলা, নাট্যকলা, সিনেমা ও স্থাপত্যকলা।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে প্রধানত আমি দুই ধরনের কাজ করে থাকি। প্রথমত, অডিও-ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ এবং ডকুমেন্টেশন বিভাগের দায়িত্ববান হিসেবে কাজ করছি। দ্বিতীয়ত, নাট্যভূমি নামক একটি প্রকল্পের মধ্য দিয়ে থিয়েটার এবং থিয়েটারের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি। একদিকে চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি, আরেকদিকে থিয়েটার করছি। তাহলে নিশ্চয়ই পেশা ও প্যাশনের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমে আসছে।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ব্যানারে আপনার থিয়েটার-সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন।
২০০৭ সালে ‘নাট্যভূমি’ নামে একটি নাট্যোন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব নিই। যার আওতায় দুই ধরনের কাজ শুরু করি।
এক, মূলধারার নাট্যকর্মীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী নাট্য কর্মশালা।
দুই, শিশুদের সৃজনশীল মানসিক বিকাশ এবং আনন্দময় শিক্ষাপদ্ধতির উন্নয়ন ও চর্চা।
একই বছরে মূলধারার নাট্যকর্মীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী নাট্য কর্মশালার অংশ হিসেবে প্রথমে সিলেট এবং পরে ময়মনসিংহের নোভিস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে বেশ কয়েক দফা নাট্য কর্মশালা করেছি আমরা। এরপর ২০১০-এ থিয়েটারের কলাকৌশলকে শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীদের নিয়ে (হিজড়া, সমকামী ও উভকামীদের) টানা দুই বছর কর্মশালার মধ্য দিয়ে ২০১২ সালে ‘তাড়ক’ নামে একটা থিয়েটার করেছি। যেখানে তারা নিজেদের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনা অবলম্বনে গল্প লিখতে এবং অভিনয় করতে সক্ষম হয়েছিল। এ বছরের জানুয়ারি মাসের ৯ থেকে ১১ তারিখ আমরা সিলেটে থিয়েটারের কর্মশালা করেছি।
শিশুদের সৃজনশীল মানসিক বিকাশ এবং আনন্দময় শিক্ষাপদ্ধতির উন্নয়ন ও চর্চার লক্ষ্যে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে টাঙ্গাইলের আনন্দপাঠ নামক একটা প্রাথমিক স্কুলের সঙ্গে আমরা কাজ শুরু করি। তাদের মূলধারার পাঠ্যক্রমের সঙ্গে থিয়েটারের কলাকৌশলকে যুক্ত করে নতুন এক ধরনের পাঠ্যক্রম তৈরি করি এবং সেখানে আমরা হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের নাইটিংগেল গল্প অবলম্বনে আবুল মোমেনের নাট্যরূপ দেওয়া ‘গানের পাখি’ নাটকের একটা মঞ্চায়ন করি। একই পদ্ধতিতে নড়াইলে ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে কাজ করি। ‘নাট্যভূমি’ বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের একটি চলমান প্রকল্প। আগামীতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে থিয়েটার দল এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার ইচ্ছে আছে। এগুলো নিয়ে কিছু কিছু কাজ করে যাচ্ছি।