নৈঃশব্দের গল্প, হারিয়ে যাবার আগে

এই তো সেদিন জন্মেছিলেন এই ঘরে। এই তো সেদিন গুটি গুটি পায়ে হেঁটেছিলেন বারান্দায়। কত গল্প ঘরজুড়ে। ভাইবোনেরা ছুটে বেড়িয়েছেন রোদ-খেলা বারান্দায়। জানালা-খোলা বাতাসে কেটেছে কত সুন্দর বিকেল। বেলা গড়িয়েছে কত। এই আঙিনায় আর আসা হয়না রোজ। একটু যেন ফাটল ধরেছে দেয়ালে? বাড়িতে এখন অনেক মানুষ। চারপাশে সব ইটের দালানের সঙ্গে বেমানান ঠেকছে শতবর্ষী এই বাড়িটিকে। তাই নতুন করে সাজিয়ে নেবার জন্য নিশ্চিহ্ন করতে হচ্ছে এই দ্বিতল ভবনকে। নতুনকে বরণ করে নিতেই হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে পুরাতনের অস্তিত্ব। বাস্তবতা কেড়ে নিচ্ছে মধুর স্মৃতিগুলো। নতুন করে ঢেলে সাজানোর পূর্বে চট্রগ্রামের আন্দরকিলার পুরোনো  বাড়িটিকে ঘিরে তাই আয়োজিত হয়েছিল ‘নৈঃশব্দ্যের শব্দ’ শিরোনামের সাইট স্পেসিফিক শিল্প প্রকল্প ।  ১৯১০ সালে নির্মিত এই বাড়িটি এখন শুধুই স্মৃতির অংশ হতে চলেছে। শেষবেলায় যেন এক বিদায়ী আয়োজন করেছে সন্তরণ আর্ট অর্গানাইজেশন।

১০ আগস্ট এর ভাঙার কার্যক্রম শুরু হবার আগে গত ৪ এবং ৫ আগস্ট ১২ জন শিল্পী একত্রে সাজিয়েছিলেন বাড়িটিকে। সেই উপলক্ষ্যে পরিবারের সবার আগমন ঘটেছিল। বাড়ির বর্তমান উত্তরাধীকারদের মাঝে একজন ওমর ফারুক ইউসুফ এসেছিলেন শেষবেলায় স্মৃতিগুলোকে বিদায় জানাতে।

হাহাকার কি কেবলই মানব হৃদয়ের? মানুষের সঙ্গে স্থাপত্যের যে নিবিড় বন্ধন সেই স্থাপত্যের কি কোন অনুভূতি নেই? আছে হয়তোবা। সেই উপলদ্ধি থেকেই শিল্পী সঞ্জয় চক্রবর্তী বাড়ির প্রবেশ দ্বারের ঘরটিতেই কালো আর লাল রঙে এঁকেছেন শিরা-উপশিরা। একদম মাঝে ঝুলন্ত লাল ফিতার গুচ্ছ গুলো বাড়িটির যেন রক্ত ক্ষরণের প্রতীক। তিনি জানান  স্থাপত্যের সঙ্গে মানুষের একরকম ‘অর্গানিক’ সম্পর্ক রয়েছে। আর তাই শুধু মানব হৃদয় নয়, তিনি চেয়েছেন বাড়ির সেই জড় অনুভূতিকেও প্রকাশ করতে।

দেয়াল জুড়ে রক্তক্ষরণ

কত সময়তো কেটেছে এই বাড়িতে। শত বছরের এই সময় গুলোকে কি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব? হয়তো নয়। আর তাই এই বাড়িরই কিছু পুরোনো ডায়রিকে সাজিয়েছেন শিল্পী আহমেদ রাসেল। প্রবেশ পথের ডানপাশের ঘরে এভাবেই সাজিয়েছেন আরও কিছু ফটোগ্রাফকেও।

পালঙ্কের অংশবিশেষ। স্মৃতির ছাপ, সাদা পর্দায়।

দ্বিতল বাড়িটির উপরের স্নানের ঘরটিকে বেছে নিয়েছেন শিল্পী মেহেরুন আক্তার। নীল রঙয়ের আভায় যেন প্রকাশিত বাড়ির কান্না। শুধু কান্না? বাড়ির? একটুখানি মানব চক্ষু দেখছি না সেখানে? জলের উৎপত্তি তো সেখানেও।

মেহেরুন আক্তারের শিল্পকর্ম- নীল কান্না

দিনে দিনে বদলেছে ইতিহাস। কালের স্বাক্ষী শুধু এই বাড়িই নয়, এই চট্রগ্রাম শহরও। তাই ‘চট্রগ্রাম’ নামের আদি আদ্যপন্তো আর ইতিহাসের উপস্থাপনা করেছেন শিল্পী মনজুর ইসলাম।

দেয়ালে ঝুলছে স্মৃতির ফ্রেম

সময়ের সাথে সাথে স্বপ্ন বড় হয়। সংখ্যায় বাড়ে স্বপ্নচারীরা। ডানা মেলে আকাশে, সেই প্রয়াসে একঝাক প্রজাপতি। আকাশপানে ছুটছে স্বপ্নের নেশায়। ঠিক এমনই ক্ষণে পতন ঘটছে এই আদি বাড়ির। সাজিয়েছেন শিল্পী শতাব্দী সোম।

 

ঘরজুড়ে কেবলই স্মৃতির মায়া

শিল্পী বিভল সাহা দেয়ালে রেখেছেন আয়না। সময়ের প্রতিচ্ছ্ববি। মৃত্যুর উপলদ্ধি থেকে সাইট স্পেসিফিক কাজ করেছেন শিল্পী সুচয়ন পাল। তার মায়ের মৃত্যুর সাথে যেন নিবিড় এক সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন এই বাড়িটির হারিয়ে যাবার।