পাহাড়ি ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলছে নগরের আধুনিকতা

পার্বত্য বান্দরবান জেলার ধমনীর মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে দুটি নদী- সাঙ্গু ও মাতামুহুরী। নদীর পাড় ঘিরেই বাস করে মুরং জনগোষ্ঠী। এই নদীই তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, জীবন জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু পূর্বের ক্ষুরধার স্রোতে বাধ সাধছে ক্রমাগত জমতে থাকা পলি। আর তাতেই নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে এসব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সদস্যদের। দীর্ঘদিনের আবাস ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে কেউ কেউ। পেছনে ফেলে যেতে হচ্ছে বহুদিনের গড়ে তোলা জীবনভঙ্গি। এভাবেই ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে আদিবাসী ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ। তাছাড়া আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হারিয়ে যাচ্ছে নানা রকম হস্তশিল্প। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সংরক্ষিত হচ্ছেনা এসব শিল্পকর্ম। এমন তাগিদ থেকেই এগিয়ে এসেছে সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বি ক্র্যাফট। গত অক্টোবরের শুরুতেই কক্সবাজারে আয়োজন করে একটি অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালার। অক্টোবর মাসের ৫ থেকে ৭ তারিখ এ তিন দিন কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয় ইনানি হিল রিসোর্টে।
প্রথাগত জীবীকা পদ্ধতি চলমান থাকলে এক সময় হয়ত তাদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের সঙ্গে সঙ্গে তারাও বিলুপ্ত হয়ে যাবেন। তার আগেই প্রজন্মের মধ্যে হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখা জরুরি সেটা বেশ জোর দিয়েই বললেন ডিজাইনার এবং বি ক্র্যাফট এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওশীন খায়ের। তিনি জানান, মূলত, এই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কর্ম উৎসাহ ও দক্ষতা বাড়ানো, বনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার হার বাড়ানো, উদ্ভাবনী দক্ষতাসহ আরও অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাই এ কর্মশালার উদ্দেশ্য। এ কর্মশালার মাধ্যমে বনের উপর যেমন মানুষের নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে, তেমনি তাদের বিকল্প জীবিকারও ব্যবস্থা হবে। এর ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে, একইসঙ্গে বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আবার পার্বত্য এলাকায় বন ও বণ্যপ্রাণি সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পাহাড়িরা যেনো ভিন্ন কোনো টেকসই পেশা সৃষ্টি করতে পারেন, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য তারা জোর দিচ্ছেন, হস্তশিল্পের দিকে। কিন্তু হস্তশিল্প বানালেই তো চলবে না, তাকে বাজারজাত করা চাই। ঠিক এখানেই এগিয়ে এসেছে বি ক্র্যাফট। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে হস্তশিল্পকে তুলে ধরবেন তারা।
এজন্য এ দুই প্রতিষ্ঠান মিলে আয়োজন করেছে এই কর্মশালা যার সমর্থন সহযোগীতায় আছে আরো একটি প্রতিষ্ঠান অরণ্য। একে আয়োজকরা বলছেন, জ্ঞান বিনিময় কর্মশালা। আরও পরিষ্কার করে বললে, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা বিনিময়। একদিকে, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক নিপুণতা নিয়ে এসেছে মুরং সম্প্রদায়ের ১৩ জন অন্যদিকে, স্মৃতি-শ্রাবণী-মাইমোনাদেরর মতো পেশাদার আধুনিক ডিজাইনার।
একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ম্যাপিং ও ডকুমেন্টেশনের কাজও চলছে। কোন এলাকায় কী ধরনের হস্তশিল্প রয়েছে, কী পরিসরে রয়েছে প্রভৃতি সংরক্ষিত তথ্য আকারে লিপিবদ্ধ করছেন তারা। যেন পরবর্তীতে বিষয়ভিত্তিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে সুবিধা হয়।
আদিবাসীদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, হস্তশিল্প এখন বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের পূর্ব প্রজন্মের কাছ থেকে শিখেছেন, কিন্তু নতুন প্রজন্ম এই কাজগুলো শিখতে আগ্রহী নয়। এর নানামুখী যৌক্তিক কারণও রয়েছে। যেমন, দিন দিন ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পগুলো বাজার হারাচ্ছে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করলেন বি ক্র্যাফটের সিনিয়র ক্রিয়েটিভ সুপারভাইজার জাফরুল হাসান লিমন। তিনি বললেন,‘মুরংরা দুই থেকে তিন ধরনের ঝুড়ি তৈরি করেন। তাদের জীবনযাপন ও প্রয়োজন অনুযায়ী ঝুড়িগুলো বানানো হয়। সেগুলো আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না। তাই এসব পণ্য আধুনিক বাজারে পৌঁছতে পারছে না। ঝুড়ি তারা বানাতে পারেন কিন্তু আধুনিক ডিজাইন তাদের নেই। বি ক্র্যাফট তাদেরকে নানা ধরণের ঝুড়ির নকশা দিচ্ছে। এভাবে তাদের হাতে তৈরি জিনিসপত্র আমরা আধুনিক বাজারের উপযোগী করে তুলছি। তাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হবেন।’
এ প্রসঙ্গেই নওশীন খায়ের যোগ করেন,‘নকশা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ফাংশনালিটিটাও আমরা শিখছি এবং ডকুমেন্টেশন করছি। তাদের জুয়েলারি খুবই সূক্ষ্ম কারুকাজের। জুমচাষের পর মাটির নিচ থেকে তোলা এক ধরনের মধুকে তারা আঠা হিসেবে কাজে লাগিয়ে সুতায় পুঁতি গেঁথে গেঁথে গয়নাগুলো তৈরি করেন। কতো ইউনিক একটি ব্যাপার। তাদের প্রাকৃতিক সুতায় তৈরি কম্বল-কাপড়ে জোড়া ফোড় কতো নান্দনিক দেখায়! এগুলোতেই যদি বৈচিত্র্য আনা যায় তাহলে বাজারের পরিসরটাও বেড়ে যায়।’
অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী যেমন- চাকমা, মারমা, মণিুপুরীরা সমতলের জনসাধারণের সঙ্গে মিশতে শুরু করার ফলে তাদের হস্তশিল্পের বেশ পরিচিতি রয়েছে। সেদিক দিয়ে মুরংরা এখনও তেমনটা মিশে উঠতে পারেননি। তাদের হাতে তৈরি গয়না, বাঁশের জিনিস, তাঁতের কাপড় সবদিক দিয়ে ভিন্ন। সিসিএ টিম দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে মিশে আন্তরিকতা ও বিশ্বাসের সেই জায়গাটি তৈরি করেছে। সেই পাটাতনের দাঁড়িয়েই আয়োজিত হয়েছে এই কর্মশালা।
তিন দিনব্যাপী এ কর্মশালা দুই বিপরীতধর্মী জ্ঞান বিনিময়ের পাশাপাশি আদিবাসীদের পণ্যের বাজার তৈরির পরিকল্পনাও হয়েছে এই কর্মশালার মাধ্যমে। সেইসঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক দিক যেমন- গান, নাচ প্রভৃতিও ডকুমেন্টেশন করা হয়েছে।
চুংদুই ও মররিং মুরংদের লোকচর্চার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অরণ্য ও বি ক্র্যাফটের আধুনিক ডিজাইনারদের নকশা। এতে আদিবাসী ঐতিহ্যের উপযোগ বাড়ছে আধুনকি বাজারে। মূলধারার বাজারে আরও বেশি চাহিদা ও আগ্রহের সঞ্চার হচ্ছে। তাতে করে অনগ্রসর আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিকল্প জীবিকার পথও খুলবে বলেই আশা করছেন আয়োজকরা।