পুবালি বাতাসে

 

প্রথম পরিচয়ের সাদাচোখে হাওরের জীবন বেশ চমকপ্রদ আর বৈচিত্র্যময় ঠেকেছিল। সময়ের সাথে সাথে এই জলাভূমিকে যত দেখেছি-বুঝেছি, ততই অবাক হয়েছি। প্রকৃতির উপর নির্ভরশীলতা আর কঠিন বোঝাপড়ায় চলে হাওরের মানবজমিন। পানিবেষ্টিত এ অঞ্চলের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে খুব বেশি প্রস্তুতির দরকার হয় না। সড়কপথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো হওয়ায় পথের ক্লান্তিও ভোগায় না খুব একটা। কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি, মৌলভীবাজারের হাকালুকি কিংবা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার জলে এখন বছরজুড়েই পর্যটকের ভিড়। এদের মধ্যে সাইট সিয়িং অভিজ্ঞতা নিতে যান যারা (টুরিস্ট) তাদের বেড়ানোর প্রধান বাহন ট্রলার বা নৌকা। নৌযানে চেপে দুপাশে চোখ রাখলেই দেখা মেলে বিস্তীর্ণ জলাভূমির। ৮ মাস পানি আর এক ফসলি জমি, এই নিয়েই হাওরের জীবন। সে জীবনের মাঝখানে থেকে হাওরকে বুঝতে এখন সেখানে থাকার ব্যবস্থাও চালু হচ্ছে ধীরে ধীরে। থাকার মতো ট্রলার আর ক্রুজের সংস্থান তাই আর বিরল নয়। চাইলে তাঁবুও টাঙানো যায়। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও হাওরে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হয়।

বিশাল হাওর দর্শনে যোগাযোগ ব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। চাইলেই পাশের দোকানে মিলবে না নিত্যপণ্য। যেতে হবে দূরের কোনো দ্বীপ কিংবা বাজারে। তবে এসব দোকানেও আবার মাসে একবার পণ্য তোলা হয়। তাই অনেক সময় সাধ্য থাকলেও সাধ মেটানোর ছাড় দিতে হয়। দরকারি তেল, মশলা ছাড়াই এখানে রান্না চলে হরদম। কেননা সূর্য হেলে পড়লে দূরের বাজারে যাওয়া-ফেরার হিসাব কষতে হয় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দাকে।

বেশির ভাগ কৃষকই এক ফসলের পাশাপাশি মনোযোগী হাঁস-মুরগি লালন আর বাড়তি ফলনের দিকে। কেননা হাওরে বর্ষায় নাও আর শুকনায় পাও- প্রবাদ সবারই জানা। হাকালুকি, টাঙ্গুয়া থেকে আজমিরিগঞ্জ বা ইটনা। প্রধান দুই মৌসুমে হাওর-বাঁওড়ে ঘুরে মনে হয়েছে, পায়ে হাঁটা মানেই কয়েক কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া। বর্ষার শেষভাগে দেখলাম গায়ে-গতরে সবল হয়ে উঠেছে ধান। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে তার পরিপক্বতাও চোখে পড়ার মতো। অগ্রহায়ণে ফসল ওঠার পর ধূসর হতে থাকে নীল হাওর প্রকৃতি। ধুলিধূসরতার সে ক্রমপালা টিকে থাকে বৈশাখ অবধি। পালাক্রমে হাওরের বিভিন্ন অঞ্চলে ধান ওঠে। কেননা সব জায়গা থেকে একই সময়ে পানি নেমে যায় না। অবশ্য হাওরাঞ্চলে সবারই লক্ষ্য থাকে নবান্নের মধ্যেই ঘরে ধান তোলা আর বিয়ে-শাদির আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলার। তাই তো এই সময় নিয়ে লেখা পল্লীকবির চরণ এখানে যথার্থই মনে হয়। কবি বলছেন,

‘সারাটি বরষা কে কবি বসিয়া বেঁধেছে ধানের গান,

কত সুদীর্ঘ দিবস রজনী করিয়া সে অবসান।

আজকে তাহার মাঠের কাব্য হইয়াছে বুঝি সারা,

ছুটে গেঁয়ো পাখি ফিঙে বুলবুল তারি গানে হয়ে হারা।

কৃষাণীর গায়ে গহনা পরায় নতুন ধানের কুটো;

এত কাজ তবু হাসি ধরে নাক, মুখে ফুল ফুটো ফুটো!

আজকে তাহার পাড়া বেড়ানোর অবসর মোটে নাই,

পার খাড়গাছি কোথা পড়ে আছে, কেবা খোঁজ রাখে ছাই’

বেশ কিছু বিলের সমন্বয়ে যে বিশাল জলক্ষেত্র হাওরের প্রধান পরিচয়, সেই বিলগুলো দৃশ্যমান হতে থাকে হেমন্ত থেকে। মিঠাপানির আধার হাকালুকি হাওরেই বিল আছে অন্তত ২৩৮টি। ১২ মাসই মাছ এ অঞ্চলের প্রধান আকর্ষণ। আর পানি আছে বলেই হাঁসের সংখ্যা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে অনেকের। দলবেঁধে শামুকের খোঁজে চলা হাঁসের দুলদুলে ভঙ্গি চেয়ে দেখার মতো। বর্ষায় চলতি পথে হিজল, করচ আর হেলেঞ্চার যে বন মাথা তুলে কোনোমতে অস্তিত্ব জানান দেয়, সেই দলের শেকড়ে পা পড়ে শুকনো মৌসুমে। পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে তৃণভূমি দৃশ্যমান হতে থাকে। সাথে পুষ্ট হতে থাকে গবাদিপশু। গরু-মহিষের এই চারণভূমি বাথান নামে পরিচিত। শত শত গবাদিপশু কচি ঘাসের আকর্ষণে বিচরণ করে দিনের পর দিন। তাদের সঙ্গ দিতে উত্তরের বাতায়নে যখন হিমেল ঝিরি বাতাস বয়, তখন দলবদ্ধ কিচির-মিচিরে হাজির হতে থাকে পরিযায়ীরা। দেশীয় পাখির আবাসস্থল হলেও পরিযায়ীরা অগ্রহায়ণের শেষভাগে জায়গা নেয় হাওড়ের গাছ আর মাটিতে। একটু খোঁজাখুঁজি করতেই কালিম পাখির ছোটাছুটি চোখে পড়ল। নলখাগড়ার ঝোঁপে দেখা মিলল খঞ্জনার ডিম। অবশ্য অদূরেই মা খঞ্জনার সতর্ক দৃষ্টি আমাদের দিকে।