প্রকাশনার সম্পাদনা পরিষদ থাকা জরুরি

বৈরী পরিবেশের মাঝেও নতুন বই লিখছেন লেখকরা আর তা পাঠকের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রকাশকরা। গ্রন্থের মাধ্যমে মানুষের মেধা-মননকে এগিয়ে নেয়ার প্রবল প্রত্যয়ে তাঁরা কাজ করে চলছেন। এমনই একজন মাহরুখ মহিউদ্দিন। বাবা, প্রকাশনার প্রবাদপুরুষ মহিউদ্দিন আহমেদ ১৯৭৫ সালে গড়ে তোলেন দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড- ইউপিএল। ২০০৯ সাল থেকেই ইউপিএলের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত তাঁর কন্যা মাহরুখ।

জন্ম থেকে বই আর প্রকাশনার পরিবেশে বেড়ে ওঠা মাহরুখের রক্তেই ছিল প্রকাশনার ধ্যানধারণা। সৃজনশীল প্রকাশনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা হয় তাঁর সঙ্গে

প্রকাশনার সম্পাদনা পরিষদ

বলা হয়ে থাকে, প্রকাশকদের মূলত তিনটি দায়িত্ব- পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করা, নির্ভুলভাবে বই মুদ্রণ আর লেখকের সম্মানী প্রদান। আমার মনে হয় লিপি সম্পাদনা করাই প্রথম ও প্রধানতম দায়িত্ব। সামাজিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধসহ নানা মাত্রিক দায়বদ্ধতা নিয়েই কাজ করতে হয় সম্পাদকদের। অনেক ক্ষেত্রে লেখকের চেয়েও প্রকাশনার খুঁটিনাটি বিষয়ে সম্পাদনা পরিষদকে অধিক শ্রম দিতে হয়, সতর্ক থাকতে হয়। সম্পাদনা বিষয়টি তাই যতটুকু ক্রিয়েটিভ, তার চেয়ে অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল। ইউপিএল শুরু থেকেই পরিশ্রমী সম্পাদনা পরিষদ নিয়ে কাজ করে চলছে। যদিও গবেষণামূলক ও তথ্যনির্ভর বই প্রকাশনার ক্ষেত্রে এখন অনেকেই এগিয়ে আসছে। তবে সম্পাদনার মান বাংলাদেশে এখনো খুব একটা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের নয়।

ফিকশন কিংবা জনপ্রিয় নন-ফিকশন নয়, এমন বই প্রকাশের জন্য ইউপিএলের সুনাম অনেক দিনের

গবেষণাধর্মী এমন অনেক বই আছে, যার খুব কাটতি থাকবার কথা নয় যেমন ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’, কিন্তু বিশেষ মহলে এটি অত্যন্ত আদৃত। ইউপিএল বিভিন্ন ধারার বই প্রকাশ করে আসছে শুরু থেকেই। অন্য অনেক প্রকাশনী থেকে এদিক থেকেই ব্যক্রিম আমরা। শুরু থেকেই গবেষণা, ভূতত্ত্ব, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, জেন্ডার, প্রশাসন ও সামাজিক বিজ্ঞানচর্চাসহ ‘সিরিয়াস’ ঘরানার বই করছি আমরা। অবশ্য আশার বিষয় হলো, এখন অন্য অনেকেই গবেষণামূলক বই প্রকাশ করছে। তার মানে ইউপিএল যে ধারাটা সৃষ্টি করেছে, তা অন্যরাও অনুসরণ করছে। বিষয়টি আমাদের জন্য প্রতিযোগিতা ও আনন্দের। এতে করে নির্দিষ্ট বিষয়ের বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে। আর্থিকভাবে লেখক উপকৃত হচ্ছেন, উপকৃত হচ্ছেন পাঠকও।

পাঠক কি কমছে?

শুধু বিদেশেই নয়, দেশেও বই বিক্রির হার কমছে। অনেকেই দাবি করছেন, সেই সাথে কমে যাচ্ছে পাঠকও। আমার ব্যক্তিগত মত, এটা একধরনের অতিসরলীকৃত ধারণা। বাংলাদেশে আমার জানা মতে, এ বিষয়ে কোনো গবেষণা হয়নি; নেই কোনো পরিসংখ্যানও। তাই পাঠক কমছে এটা বলা অনুচিত হবে। তবে অনলাইনের প্রতি পাঠকদের পক্ষপাত দৃশ্যমান। বিশেষত, তরুণরা অধিকাংশ বিষয়ে জানার জন্য অনলাইনকেই বেছে নিচ্ছেন। পৃথিবীজুড়েই এখন এটা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণামূলক বইয়ের বিক্রি কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ফটোকপি পড়ার অভ্যাস একটা বড় ভ‚মিকা রাখছে। তবে সেটা কোনোভাবেই পাঠাভ্যাসকে ক্ষয়িষ্ণু করছে বলে মনে হয় না।

পাইরেসি

গত বইমেলার সময়েও বাইরের ফুটপাতে, এমনকি বইমেলার বিভিনড়ব স্টলেও প্রকাশ্যে বিক্রি হয়েছে পাইরেটেড কপি। এবারের চিত্র অবশ্য ভিন্ন এবং সেটা প্রকাশনাশিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জন্য সুখকরও।

এবং ই-বুক

এটি সময়ের দাবি। আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে এখন অবধি লেখকরা ই-বুকের চেয়ে হার্ডবাইন্ড বই-ই বেশি পছন্দ করেন। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সাথে আমরা কথা বলছি। আমাদের কয়েকটি প্রকাশনা আমাজনে পাওয়াও যাচ্ছে। আমরা নিজেরাও কিন্তু লেখকদের এ ব্যাপারে উৎসাহিত করছি। কারণ, বিশেষায়িত গবেষণমূলক গ্রন্থ ই-বুক হিসেবে প্রকাশ পেলে ব্যবসার জন্যও সেটা খানিকটা স্বস্তিদায়ক। কাগজের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে তথাকথিত অজনপ্রিয় ধারাগুলোতে কাজ করার সুযোগ বাড়বে, যদি ই-বুক নিয়ে সবাই আগ্রহী হয়ে ওঠে।

দাম: কমা কিংবা বাড়া

বেশি বই না বিক্রি হলে দাম কমানো সম্ভব নয়, আর বেশি বই পাঠক না কিনলে বেশি বই ছাপাই সম্ভব না। সেই সৈয়দ মুজতবা আলীর কৌতুকের মতো। একধরনের দুষ্টচক্রের মতো। আর এই পুরো বিষয়টায় আসলে কাগজের দাম বেশি হওয়াটা একটা বড় অন্তরায়। আমি জানি না, কাগজের দাম বেশি রেখে সরকারের আসলে কী উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে!

ভবিষ্যৎ

প্রকাশনার ব্যবসাটা সারা বিশ্বেই একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদেশের চেইন বুক স্টোরগুলো নানাবিধ জটিলতার সাথে লড়াই করছে। বাংলাদেশে তরুণরা এ শিল্পে জড়িত হচ্ছেন, সেটা আশার কথা। তবে পাশের দেশ ভারতেও কিন্তু বিশেষায়িত প্রকাশনার একটা বড় চল শুরু হয়েছে। তারা বিষয়ভিত্তিক দারুণ সব কাজ করছে। সে তুলনায় আমরা কিন্তু এখনো বিশেষায়িত কোনো প্রকাশনা গড়ে তুলতে পারিনি।