প্রকাশিত হলো ‘পৃথিবীর পথে হেঁটে’

অর্থনীতিবিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত অলকনন্দা প্যাটেল। তবে অর্থনীতির গবেষণার পাশাপাশি ইতিহাস ও সংগীতে সমান আগ্রহী তিনি। ঢাকার ইডেন স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন সাতচল্লিশের আগে। এরপর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিদ্যায়তনে। বিচিত্র এবং বিস্তৃত জীবনে তিনি অবলোকন করেছেন ইতিহাস। সেই ইতিহাসের প্রামাণ্য কথক হিসেবে রচনা করেছেন স্মৃতিমথিত গ্রন্থ পৃথিবীর পথে হেঁটে। সম্প্রতি বেঙ্গল পাবলিকেশন্‌স থেকে প্রকাশিত হয় বইটি এবং গত ১৬ অক্টোবর, সোমবার অনুষ্ঠিত হয় বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান।

বাংলাদেশে জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ এম সাইদুজ্জামান, বেঙ্গল পাবলিকেশনসের নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসনাত এবং লেখিকা অলকনন্দা প্যাটেল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আনিসুজ্জামান বলেন, এ বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে এটি একটি ভালবাসার ফসল। ঢাকার যেসব জায়গায় গ্রন্থ রচয়িতা ছিলেন সে সব জায়গার কথাই তিনি ভালবাসায় উল্লেখ করেছেন। বইটি একই সঙ্গে তাঁর স্মৃতি ও গবেষণার নিদর্শন। বইটির পাতায় পাতায় গভীর মমতা জড়িয়ে আছে। বইটির ভাষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কথ্য ভাষায় লেখা নয়। লেখিকা যেমন করে ভাবেন তেমন করেই লিখেছেন। এটি তাঁর অনুভূতির প্রকাশ। গ্রন্থটিকে তিনি ‘একটি অসাধারণ মানবিক দলিল’ বলে উল্লেখ করেন।

প্রারম্ভ বক্তব্যে আবুল হাসনাত বইটির সৃজন ইতিহাস সম্পর্কে বলেন, এ গ্রন্থটির একটি অংশ প্রথম প্রকাশিত হয় কালি ও কলমের একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যায়। এরপরই সে লেখা নিয়ে পাঠকমহলে আগ্রহের সৃষ্টি হলে তিনি লেখিকাকে উৎসাহিত করেন তাঁর স্মৃতিতে থাকা ৩০-৪০ দশকের পূর্ব বাংলার চিত্র গ্রন্থরূপে লিপিবদ্ধ করতে। তিনি আরও বলেন, এরপর বহু সময় নিয়ে বারবার যাচাই-বাছাই পরিমার্জনের ফলে জন্ম নেয় এই গ্রন্থ।

অলকনন্দা প্যাটেল, বইটির প্রকাশকসহ এর পেছনের সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অনেক শ্রম করে এই বইটি করা হয়েছে। অনেক চিঠি লেখিকা উদ্ধার করেছেন এ বইটি করতে গিয়ে। অনেকের সাক্ষাৎকার তিনি গ্রহণ করেছেন, অনেক চিঠি তিনি উদ্ধার করেছেন, যা অনেক শ্রমসাধ্য। দেশভাগের কথা বারবার এখানে উঠে এসেছে। উঠে এসেছে সাম্প্রদায়িকতার কথা। লেখিকা তার পিতা অমিয়কুমার দাশগুপ্তের দুঃখতপ্ত স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন এ বইয়ে, যাঁর জন্ম বরিশালে। পরিমল রায়ের কথা বলা আছে, অর্থনীতিবিদ। যিনি দেশভাগের সময় চলে গিয়েছিলেন, তাঁর বাড়ি দখল হয়েছিল। আছে এক দুধাই মায়ের কথা, যিনি দেশভাগের জন্য সব হারিয়ে ঘুরে ফিরছিলেন বেনারসে এবং তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল লেখিকার মায়ের।

প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ

তিনি আরও বলেন, অলকনন্দা প্যাটেলের বইয়ে উঠে এসেছে দেশভাগের কারণ, যেখানে নিচু বর্ণের হিন্দুদের প্রতি উঁচু বর্ণের আচরণকেই মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। দেশভাগের প্রেক্ষাপট এবং হিন্দু-মুসলমান রেষারেষির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বইটিতে সংযোজিত লেখিকার বিভিন্ন চিঠিতে। এছাড়া ৩০ ও ৪০-এর দশকের ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। তৎকালীন ঢাকার গেন্ডারিয়া, ওয়ারী, বকশীবাজারসহ অপরাপর এলাকার বর্ণনা ফুটে উঠেছে এ গ্রন্থে। আলোচিত হয়েছেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, মাজহারুলক হকসহ বহু গুণী ব্যক্তিত্বের কথা। এছাড়া এ বইয়ে ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত সুন্দরভাবে করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

অর্থনীতিবিদ এম সাইদুজ্জামান বলেন, পৃথিবীর পথে হেঁটে আমার জন্য একটি অদ্ভুত সুন্দর বই। এ বইটি লেখিকার বাবা অমিয়কুমার দাশগুপ্তের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা কালের সময় ঘিরে রচিত। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে ভারতভাগ পূর্ববর্তী বাংলার বিভিন্ন এলাকার স্মৃতি। একই সঙ্গে সে সময়কার সমাজ ও পরিবারের চিত্রও ফুটে উঠেছে এ গ্রন্থে। তিনি বলেন, বইটির নাম পৃথিবীর পথে হেঁটে হলেও এর ৯০ ভাগ জুড়ে রয়েছে ঢাকা, বরিশাল ও গৈলা এবং ১০ ভাগ জুড়ে রয়েছে দিল্লি, কলকাতা, হার্ভার্ড, আহমেদাবাদসহ অন্যান্য অঞ্চলের বর্ণনা। এম সাইদুজ্জামান অধ্যায় ধরে ধরে বইটি বিশ্লেষণ এবং সে সময়কার প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন।

বইটির লেখিকা অলকনন্দা প্যাটেল প্রথমেই ধন্যবাদ জানান আবুল হাসনাত এবং বেঙ্গল পাবলিকেশনসসহ এই বইটি প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে। তিনি বলেন, বইটির নাম পৃথিবীর পথে হেঁটে কারণ আমাকে আমার ছোট্ট জগৎ ছেড়ে হঠাৎ বৃহৎ পৃথিবীতে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল। এ বোধ আমায় দুঃখ দিয়েছিল, কিন্তু আমি বা আমরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে দেশছাড়ার যে কষ্ট তা আমার সব সময়ই ছিল, এখনও আছে। দেশভাগের দুঃখের সেই দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের প্রণীত জীবনে’র কথা।

তিনি আরও বলেন, বইটি লেখা শুরু করেছিলেন তাঁর ভাইয়ের তাগিদে। পরবর্তীকালে তা বইয়ে রূপ নেয় আবুল হাসনাতের প্রেরণা ও তাগিদে। অবশ্য এখন তাঁর বোধ বইটি তিনি নিজের জন্যই লিখেছেন।

উল্লেখ্য, স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, দিল্লি; ডার্টিংটন কলেজ অফ আর্টস, ইংল্যান্ড এর মতো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে অধ্যানায় যুক্ত ছিলেন লেখিকা। তিনি দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন ইতালির মিলানে এনরিকো এনি ইনস্টিটিউটের সঙ্গে, গবেষণা করেছেন বহুত্বধর্মী সংস্কৃতির সমাজ ও তার টেকসই উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে। অলকনন্দার লেখায় ইতিহাস সন্ধানের প্রয়াস যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও সমসাময়িক বাস্তবতায় তার বিশ্লেষণ। তার লেখায় পাঠকের সামনে ধরা দেয় সে সময়ের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির নানা প্রবণতা। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় গবেষণাসহ ইতিহাসনির্ভর লেখা বেরিয়েছে তাঁর। সম্পাদনা করেছেন তিন খণ্ডে যশস্বী অর্থনীতিবিদ অমিয়কুমার দাশগুপ্তের গ্রন্থ ও প্রবন্ধ সংগ্রহ। রবীন্দ্রসংগীতে গুরু শ্রীশৈলজারঞ্জন মজুমদার, শাস্ত্রীয় সংগীত শিখেছেন রামপুর ঘরানার ওস্তাদ নিসার হুসেন খাঁ ও ওস্তাদ হাফিজ আহমেদ খাঁর শিষ্যা হয়ে। সংগীত বিষয়ে তিনি ঘরানারীতি ও সংগীতজগতে নারীর অবস্থান নিয়ে গবেষণা করেছেন।

অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বুলবুল ইসলাম এবং ইফ্ফাত আরা দেওয়ান।