প্রকাশিত হলো মন জানালা

নান্দনিকতা ছাপিয়ে কখনও মুখ্য হয়ে ওঠে ইতিহাস। মহৎ কোনো শিল্পকর্ম সাক্ষ্য দেয় কালের। তেমনই ভাস্কর্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠা এই ভাস্কর্যটির নির্মাতা সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ধাতব বস্তু দিয়ে গড়া ভাস্কর্যটি নির্মাণের সময় এই ভাস্কর কোন গ্লাভস ব্যবহার করেননি। কারণ মুক্তিযোদ্ধরা যুদ্ধে যে কষ্ট করেছিলেন তা নিজে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলেন এই শিল্পী। আর এই ভাস্কর্যের নির্মাণকালের ছবি তুলেছিলেন বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক সাংবাদিকতার অগ্রজ ব্যক্তিত্ব প্রয়াত মিশুক মুনীর। সাদা-কালো আলোকচিত্রে ধারণ করেছিলেন ঐতিহাসিক ভাস্কর্য নির্মাণপর্ব। সেসব ছবিতে নানাভাবে উঠে এসেছে ভাস্কর্যটি নির্মাণের চিত্র। এমনকি শিল্পকর্মটিতে নানান অঙ্গনের মানুষের ভালবাসার দৃশ্যকাব্য উঠে এসেছে ছবিগুলোর মাধ্যমে। শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর সন্তান মিশুক মুনীরের ক্যামেরায় অমলিন হয়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধসহ সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রতীক অপরাজেয় বাংলার নির্মাণপর্ব। সেসব ছবি নিয়ে বেঙ্গল পাবলিকেশন্‌স প্রকাশ করছে মন জানালা নামের একটি আলোকচিত্র সঙ্কলন বা গ্রন্থ। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে সকল নারী-পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার উদ্দেশে। বইটিতে ৬৩টি ছবি স্থান পেয়েছে। সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের সেমিনারক কক্ষে এ গ্রন্থটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বিশেষ অতিথি ছিলেন অপরাজেয় বাংলার স্থপতি সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক আখতারুজ্জামান, নাট্যজন ম হামিদ এবং কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত ও মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জলী কাজী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মিশুক মুনীরের অনুজ আসিফ মুনীর। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাত।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘অপরাজেয় বাংলা বাংলাদেশের মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এর পেছনে কাজ করেছে সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের নিরলস পরিশ্রম। খালিদের সেই নির্মাণপর্বটি ফ্রেমবন্দী করেছিল মিশুক মুনীর। তার অগ্রজ ভাষণের উপহার দেওয়া ক্যামেরা দিয়ে মিশুক তখন ফটোগ্রাফি শেখা শুরু করেছিল। সেই শিক্ষানবীশ সময়ে তুলেছিল অপরাজেয় বাংলার নির্মাণপর্বের ছবিগুলো। ছবি তুলতে তুলতে এক সময় নিজেই ভাস্কর্যটির নির্মাণপর্বের একজন অংশীদার হয়ে যায়।’ এ ভাস্কর্যটিকে ঘিরে অশুভ শক্তির অপতৎপরতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীন দেশে এ ভাস্কর্যটি অপসারণেরও চেষ্টা করা হয়েছে। যারা অপসারণের চেষ্টা করেছিল সে মানসিকতার মানুষগুলো এখনো এ দেশে বাস করছে। তাদের মানসিকতারও পরিবর্তন হয়নি। সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় এ অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে।’ এ কাজ দিয়ে শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদ অমর হয়ে থাকবেন এবং অপরাজেয় বাংলা আজীবন বাঙালীর শৌর্যের চিরকালীন প্রতীক হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘পেশার প্রতি, পেশাগত দক্ষতার প্রতি, যে কোনো কাজ নিখুঁত করে তোলার প্রতি মিশুক মুনীরের যে একাগ্রতা ছিল তা অসাধারণ এক গুণ। মিশুক সময়ের অনেক আগে চলে গেছে সন্দেহ নেই। অসময়ে চলে গিয়েও কাজের প্রতি, দেশের প্রতি ভালবাসা ও মূল্যবোধের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছে তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পাথেয় হয়ে থাকবে।’
আপ্লুত হয়ে পড়েন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। তিনি বলেন, ‘মিশুকের সান্নিধ্য আমি ভুলতে পারি না। মিশুক চলে গেলেও তার সঙ্গে বন্ধনটা এখন অটুট আছে।’