‘প্রাণের খেলা’য় উচ্চাঙ্গসংগীত সন্ধ্যা

যে কোনো সংগীতের ভিত্তি উচ্চাঙ্গসংগীত। যুগ-যুগ ধরে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় এ সংগীতের ধারা এখনো এদেশে বহমান। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট করতে হবে উচ্চাঙ্গসংগীত শিক্ষা ও চর্চায়। নবীনদের মাঝে এই সংগীতের বীজ বপন করা গেলে বেঁচে থাকবে এ দেশের হাজার বছরের সংগীত ঐতিহ্য। এরই আলোকে গত ১৮ মে সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিত হলো বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নিয়মিত সংগীত আসর ‘প্রাণের খেলা’। এতে একই মঞ্চে উচ্চাঙ্গসংগীত পরিবেশন করলেন গুরু ও শিষ্যরা।

ছায়ানট মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের শুরুতে টাংগাইলের ষড়জ-পঞ্চম সংগঠনের শিক্ষার্থীরা দলীয়ভাবে ছোট আলাপে সুরফাক তালে মালকোষ রাগে ধ্রুপদ পরিবেশন করেন। পরপর ত্রিতালে ইমন রাগে খেয়াল এবং তারানা গেয়ে শোনান তাদের সম্মেলক পরিবেশনায়। ষড়জ-পঞ্চমের শেষ পরিবেশনা ছিল গুরু ড. অসিত রায়ের, তিনি শংকরা রাগে প্রথমে আলাপ, জোড় এবং ঝালা পরিবেশন করে পরে তিনি ধামার এবং সুরফাঁক তালে বন্দিশ পরিবেশন করেন। ষড়জ-পঞ্চমে’র শিল্পীরা হলেন দেবাঞ্জনা দেব, জয়িতা পণ্ডিত, দেবার্পন বসাক, শ্রেয়সী চক্রবর্তী, প্রাচী চাকী ও অর্পিতা রায়।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়াংশে ছিল গুরু মর্তুজা কবীর মুরাদ ও তাঁর সংগঠন ‘আরোহ’ এর শিক্ষার্থীদের দলীয় বাঁশি পরিবেশনা। গুরু ও শিষ্যরা দলগতভাবে ত্রিতালে রাগ হংসধ্বনি বাজিয়ে শোনান, আলাপ দিয়ে শুরু করে সমবেতভাবে মধ্যলয়ে বাজিয়ে দ্রুতলয়ে শেষ করেন। এরপর পাহাড়ী ধুন বাজিয়ে গুরু মর্তুজা কবির মুরাদ অনুষ্ঠান

শেষ করেন। আরোহ’র বাঁশি শিল্পীরা রিয়াদ-উল-কবীর, প্রনব দাস, শৈবাল সাহা, নিশাত আফরোজ, নইতা নার্গিস, সোনিকা ইসলাম, সফিকুল ইসলাম তানজীব, মো. জাকারিয়া হোসেন, মো. ইফতেখার হাসান, আমিয়া সাদনাম চৌধুরী এবং মো. মোহ্তাসিম জাহিন সিমন।

যন্ত্রানুষঙ্গ সহযোগে রয়েছেন তবলায় স্বরূপ হোসেন এবং রতন কুমার দাশ, পাখোয়াজে আলমগীর পারভেজ সুমন, হারমোনিয়ামে অসিত রায়, তানপুরায় জ্ঞানসংকর পাল ও তাপস বৈরাগী।

সবার জন্য উন্মুক্ত এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

 

ড. অসিত রায়

কিশোরগঞ্জ জেলার এক সংগীত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা জনার্দন রায় নিজেও একজন সেতার শিল্পী এবং মা সংগীত শিল্পী। তাই সংগীতে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিলো পারিবারিক পরিবেশে। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি সংগীতে তালিম গ্রহন করেন তপন কুমার চক্রবর্তী, পরেশ ভট্টাচার্য ও গোপাল দত্তের কাছে। ড. অসিত ভারতীয় বৃত্তি নিয়ে কলকাতায় রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে অধ্যয়ন শুরু করেন। এই সময়ে তিনি খেয়াল এর তালিম নেন বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রখ্যাত সংগীতাচার্য অমিয় রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ও পণ্ডিত জগ্দীশ প্রসাদ মহাশয়ের কাছে। তারপর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ডাগর ঘরানার প্রখ্যাত শিল্পী ও শিক্ষক শ্রীমতি কাবেরী করের ত্বত্তাবধায়নে ধ্রুপদ বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি অমূল্য সান্নিধ্য লাভ করেন ডাগর ঘরানার দাদাগুরু প্রবাদ প্রতিম পুরুষ ওস্তাদ রাহিম ফাহিমউদ্দীন ডাগর সাহেবের। অধ্যাপক অসীত রায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন। টাঙ্গাইল জেলার সংগীত সংগঠন ‘ষড়জ-পঞ্চম’ এর প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

 

মর্তুজা কবীর মুরাদ

১৯৬৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার জনপ্রিয় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ডাক্তার আলী আহমেদ সাহেবের পরিবারের জন্মগ্রহন করেন। আহমেদ পরিবারের এই সন্তানটিই একমাত্র যিনি শুধু সংগীত বিষয়েই তাঁর মনোনিবেশ তৈরী করে আজ “আরোহ” নামে বাংলাদেশে শুধু বাঁশি বিষয়ক সংগঠন এবং নিজ গৃহে বাঁশি শিক্ষার জন্য বিদ্যায়তন তৈরী করেছেন। অল্প বয়সে, ১৯৮৬ সালে ওস্তাদ খন্দকার খায়রুল আনামের কাছে তবলায় হাতেখড়ি দিয়ে সংগীত জীবন শুরু করলেও তার দুই বছর পর থেকেই মর্তুজা কবীর বাঁশিতে তালিম নিতে থাকেন আলাউদ্দীন সাহেবের কাছে এবং তারও কিছু পরে ১৯৯২ সাল থেকে সানাই-এ তালিম গ্রহন করেন শামসুর রহমানের কাছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পৃথিবীখ্যাত গুরু পণ্ডিত হরি প্রসাদজ্বী’র অতি অল্প সময়ের সান্নিধ্য পেলেও শিল্পী মর্তুজা মনে করেন এটাই তাঁর সংগীত জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া।