বরেণ্য দুই সঙ্গীতজ্ঞের স্মরণে…

গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে আমরা হারিয়েছি বাংলাদেশের দুই প্রবাদপ্রতিম সংগীত ব্যক্তিত্বকে; সঙ্গীতজ্ঞ সুধীন দাশ এবং সঙ্গীত গবেষক, অধ্যাপক ড. করুণাময় গোস্বামী। গতকাল, ১১ জুলাই, সন্ধ্যায় এই দুই মহারথীর প্রয়াণে একটি স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।

আয়োজনের শুরুতে তাঁদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তারপর বক্তব্য রাখেন মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাত। সংগীতে নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিবর্গের আলোকিত জীবনের কথা তুলে ধরেন তিনি।

স্মরণসভায় আলোচনা করেন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। প্রয়াতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের পূর্ণ ও সফল জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেন।

এই দুই কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে আমাদের সঙ্গী ছিলেন। তাঁদের প্রয়াণে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন মফিজুর রহমান। প্রথমে গাইলেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘নীলাম্বরী শাড়ি পরে’ পরের গানটি ‘ঝর ঝর বারি ঝরে অম্বর ব্যাপিয়া’। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় শিল্পী নাসিমা শাহীন গাইলেন ‘সাঁঝের পাখিরা ফিরিল কুলায়’ এবং ‘তুমি যখন এসেছিলে’ গানটি।

গানের মাঝে বিশিষ্ট চারুশিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর দুই মহান এই সংগীতজ্ঞদের সম্বন্ধে স্মৃতি থেকে বললেন বেশ কিছুকথা। অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামীর স্নেহধন্য ইকবাল সুমন গাইলেন ‘কেন ফোটে, কেন কুসুম ঝরে যায়’ এবং ‘বিদায় সন্ধ্যা আসিল ঐ’। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান শোনালেন লাইসা আহমদ লিসা। তিনি একে একে গাইলেন ‘পথে চলে যেতে যেতে’, ‘ধায় যেন মোর সকল ভালবাসা’ এবং অতুলপ্রসাদ সেনের ‘বাদল ঝুমা ঝুমা’ গানখানি। শেষ শিল্পী ছিলেন খায়রুল আনাম শাকিল। তিনি গাইলেন ‘যতই দহনা তুমি’ এবং ‘শ্যামা নামের’ গানগুলি।

শিল্পীদের সঙ্গে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন ইফতেখার আলম প্রধান ডলার (তবলা), দৌলতুর রহমান (কিবোর্ড), অসিত বিশ্বাস (এসরাজ) এবং নাজমুল আলম ঝরু (মন্দিরা)।

সবার জন্য উন্মুক্ত এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

 

সুধীন দাশ (৩০ এপ্রিল ১৯৩০-২৭ জুন ২০১৭)

বাংলাদেশেরে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও নজরুল গবেষক। জন্ম কুমিল্লার তালপুকুরপারের বাগিচাগাঁওয়ে। বাবা নিশিকান্ত দাশ ও মা হেমপ্রভা দাশের কনিষ্ঠ সন্তান সুধীন দাশের প্রথম তালিম তাঁর বড়ভাই সুরেন দাশের কাছে। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে প্রথম গান পরিবেশন করেন। তিনি ছিলেন এসই সঙ্গে সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং আদর্শ সংগীত শিক্ষক। নজরুলের গানের সংগৃহীত রেকর্ড থেকে করে গেছেন বহুসংখ্যক গানের স্বরলিপি। তাঁর তত্ত্বাবধানে লালনগীতির স্বরলিপিও প্রকাশিত হয়। সুর-সাধনায় নিবেদিত এই সংগীতজ্ঞ একুশে পদকসহ পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।

 

ড. করুণাময় গোস্বামী (১১ মার্চ ১৯৪২-৩০ জুন ২০১৭)

জন্ম ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার গোঁসাই চান্দুরা গ্রামে। বাবা রাসবিহারী গোস্বামী ও মা জ্যোৎস্না রাণী দেবীর প্রথম সন্তান তিনি। প্রস্তুত করেছেন সংগীতবিষয়ক অভিধান ‘সংগীত কোষ’, অডিও ক্যাসেটের সংকলন ‘বাংলাগানের শ্রুতি ইতিহাস’। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা’, ‘বাংলাগানের বিবর্তন’, ‘নজরুলগীতি প্রসঙ্গ’ ও ‘অতুলপ্রসাদের গান’। বেঙ্গল পাবলিকেশন্স  থেকে ‘বাংলা গানের বর্তমান ও আরো’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ হয়েছে ২০১৪ সালে। একুশে পদকসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী।