বহুত্বের মধ্যেই নিহিত এককের পরিচয়

“মানুষ মাত্রেরই একাধিক পরিচয় থাকে। প্রসঙ্গক্রমে সে কোনো একটা পরিচয়কে তুলে ধরে বা গুরুত্ব দেয়। কিন্তু সেটিই তার একমাত্র পরিচয় নয়, আবার সবচেয়ে ‍গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় নাও হতে পারে। অনেক সময়ে একাধিক বর্গের পরিচয়কে একসঙ্গে যুক্ত করা যায়। কিন্তু এক বর্গের সঙ্গে অন্য বর্গ পরিবর্তনযোগ্য হয় না।” অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এ কথা বলেন।

গত ২৯ অক্টোবর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক গুণীজন বক্তৃতার তৃতীয় পর্ব। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ড. আহ্‌রার আহমদ এবং মূল বক্তা ড. আনিসুজ্জামানের জীবনকীর্তির মূল্যায়ন করে সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম।

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক গুণীজন বক্তৃতার এ পর্বের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘বাংলার মুসলমানের পরিচয়-বৈচিত্র্য’। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ বক্তৃতায় অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলার মুসলমানের পরিচয় এবং বৈচিত্র্য নির্ণয়ে ঐতিহাসিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করেন। এবং মুসলমান সমাজের বহুত্বধারার পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট সংকটের স্বরূপ তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বিভিন্ন সাহিত্য, প্রবন্ধ ও গবেষণাকর্মের উদাহরণ তুলে ধরেন।

পরিচয়ের সংকট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আত্মপরিচয়ের বহুত্ব উত্তেজনা বা সংকটের কারণ হতে পারে যদি আমরা একটিমাত্র পরিচয় সম্বল করতে চাই, অথবা পরিচয়-বর্গগুলোকে গুলিয়ে ফেলি। উনিশ শতকে বাংলার মুসলমান তেমনি সংকটে পড়েছিল তার বাঙালি সত্ত্বা ও মুসলমান সত্ত্বা নিয়ে, যদিও তার কোনো কারণ ছিল না।” তিনি আরও বলেন, “মনে রাখতে হবে যে, বাসস্থান ও বৈবাহিক মর্যাদার মতো ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনশীল, তবে উদ্ভব ও ভাষাগত পরিচয় অপরিবর্তনীয়। আমরা সে-পরিচয় কীভাবে ব্যবহার করি, তা নিয়ে অনেক কথা হতে পারে, তবে এটুকু বলা দরকার যে, পরিচয়ের বহুত্ব কিছুতেই অবজ্ঞেয় নয়।”

এক ঘন্টার দীর্ঘ বক্তৃতায় বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, “বাংলায় মুসলমান আগমনের সময় থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত, আমরা দেখি, ধর্মীয় পরিচয় বেশ গুরুত্বলাভ করেছে, সেটা দিয়েই সম্প্রদায়গত ভেদ চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু হিন্দু বললেই যেমন সে-পরিচয় পরিপূর্ণতা লাভ করতো না, তার বর্ণ, অঞ্চল, পেশা না বললে পরিচয় সম্পূর্ণ হতো না; তেমনি বাংলার মুসলমান সমাজেও নানারকম ভাগ ছিল।”

আবার সাম্প্রদায়িক-সাংস্কৃতিক বহুত্বের সম্প্রীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এ-কথা মনে করা ঠিক হবে না যে, আশরাফ ও আতরাফের জগৎ ছিল একেবারে আলাদা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের চাহিদা মেটাতে তাদের মধ্যে খানিকটা মিথস্ক্রিয়া ঘটত নিশ্চয়। এমন অনুমান করা অযৌক্তিক হবে না যে, সামাজিক অন্তরায় সত্ত্বেও, ধর্মীয় পরবে এবং সুফিবাদের দরগাহ ও মাজারে উভয় শ্রেণির মানুষ একত্র হতেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্প ও কৃষির ক্ষেত্রে খানিকটা পরস্পরনির্ভরতা ছিল- একের উৎপন্ন দ্রব্য ও সেবা অপরের প্রয়োজন মেটাত।”

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান প্রধান বক্তা আনিসুজ্জামানে অনুসন্ধানের মূল্যায়ন করেন। এবং স্বাগত বক্তব্যে ড. আহ্‌রার আহমদ বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে আমরা সম্পাদক এবং আলোচনার সভার সভাপতি হিসেবে দেখে আসছি। এবার তাঁর গবেষক রূপ দেখতে পাওয়া ইদানিং কালের এক ব্যতিক্রম ঘটনাই বটে।’

উল্লেখ্য, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের স্মরণে আয়োজিত এই বক্তৃতামালার প্রথম পর্বে প্রবন্ধ পাঠ করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান এবং দ্বিতীয় পর্বে বক্তৃতা করেন গবেষক ও লেখক বদরুদ্দীন উমর।