‘বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চার অবস্থা নিম্নগামী’

বাংলাদেশে পানির স্তর আর বায়ুর মান যেমন নিম্নগামী, আমরা খবর রাখি না, জ্ঞানচর্চার অবস্থাও সেই রকমেরই। বিশ্ব এখন ভীষণ রুগ্ন, তাকে বদলানো চাই, জ্ঞানবুদ্ধির প্রয়োগ দরকার বদলানোর জন্য। ‘জাতি ও শ্রেণী প্রশ্নে চিন্তা ও দুশ্চিন্তা উপমহাদেশে, বাংলাদেশে’ শীর্ষক ৫ম জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন গুণিজন বক্তৃতায় এ মন্তব্য করেন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এ বক্তৃতানুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘জ্ঞানের চর্চা কমছে তার প্রথম কারণ তার বাজার নাই। দ্বিতীয় কারণ, বিদ্যমান শ্রেণীব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা ও সুবিধাসন্ধানীরা চায় না মানুষের চোখ খুলে যাক। তবে অনিবার্য সার কথাটা এই যে জাতীয়তাবাদীরা তাদের পক্ষে যা দেওয়া সম্ভব তা ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছেন, তাদের কাছে মহৎ কিছু প্রত্যাশা করাটা অন্যায়, করণীয়টা এখন তাই সমাজতন্ত্রীদেরই।

প্রাসঙ্গিকভাবে তিনে বলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আশা জেগেছিল যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ মুক্তি পাবে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশকে আমরা পাই নি। কারণ যে ঐক্য, উদ্দীপনা, উদ্ভাবনা ও অঙ্গীকার মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখা গিয়েছিল সেটা অক্ষুণ্ণ থাকেনি। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর অর্থনীতিকে সমাজতন্ত্র অভিমুখী চালনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, শক্তিশালী একটি প্ল্যানিং কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তার সদস্যরা অনেক পরিশ্রম ও গবেষণা করেছেন, কিন্তু তাঁদের প্রস্তাবগুলো কার্যকর হয়নি। উল্টো প্ল্যানিং কমিশন নিজেই ভেঙে গেছে। সদস্যরা সবাই বলেছেন যে অভাব ছিল রাজনৈতিক অঙ্গীকারের। রাজনৈতিক অঙ্গীকার কিন্তু ছিল, তবে সেটা নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তনের নয়, ছিল পুরাতন ব্যবস্থাটাকেই সক্রিয় ও উন্নত করবার জন্য।

দীর্ঘ এক ঘন্টার একক বক্তৃতায় তিনি আরও বলেন, জাতি ও শ্রেণীর প্রশ্নে উপমহাদেশে এবং বাংলাদেশেও চার ধরনের চিন্তা ও দুশ্চিন্তার তৎপরতা দেখা যায়- জাতীয়তাবাদী, উদারনৈতিক, ধর্মীয় মৌলবাদী, এবং সমাজতান্ত্রিক। জাতীয়তাবাদী, উদারনৈতিক ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা একে অপরের থেকে দূরেই থাকেন, কিন্তু তবু অন্তর্গতভাবে তিনধারাই এক ধারা এই অর্থে যে তিনটিই পুঁজিবাদে বিশ্বাসী। পুঁজিবাদের ভেতরের খবরটা হলো সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানায় বিশ্বাস। সমাজতান্ত্রিক মতবাদের কেন্দ্রে আছে ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। সমাজতান্ত্রিক ধারাটি তাই অন্য তিনধারার কেবল প্রতিপক্ষই নয়, শত্রুপক্ষও বটে।

জাতি ও শ্রেণি প্রশ্নে সমাজতন্ত্রীদের ভূমিকাটা প্রধান হতে পারতো, এবং তা হলে উপমহাদেশের ইতিহাস ভিন্ন ভাবে লেখা হতো। সেটা ঘটে নি তার কারণ ছিল বহুবিধ- বাইরে থেকে তাদের ওপর সরকার ও সরকারবিরোধী উভয় পক্ষের ছিল সমান ক্রোধ। ব্রিটিশের রাষ্ট্র তাদেরকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে চেয়েছে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই ছিল কমিউনিস্টবিরোধী। ভেতরের দুর্বলতা ছিল আরও ক্ষতিকর। এই দুর্বলতার মূল উৎস পরাধীন বাংলায় প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির পেটি বুর্জোয়া চরিত্র। আরেকটা বড় কারণ ছিল পরনির্ভরতা। পার্টির প্রতিষ্ঠা ১৯২০ সালে, দেশে নয় দেশের বাইরে, সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থন ও অর্থানুকূল্যে। তখন থেকেই এর যে বিদেশনির্ভরতা শুরু পরে তা থেকে আর মুক্তি ঘটে নি। লেনিন মার্কসবাদকে তাঁর দেশের বাস্তবতায় স্থাপন করে কৃষককে পাশে টেনে নিয়েছিলেন, এবং সেজন্যই তাঁর দেশে বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল। আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মাও সে-তুঙ মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে নিজের দেশের বাস্তবতায় নিয়ে গিয়ে কৃষককেই সামনে নিয়ে এলেন। ভারতের বিপ্লবীরা তেমনটা করতে পারেন নি, শাস্ত্রের এবং সোভিয়েত-দৃষ্টান্তের ওপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণেই।

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে আব্দুর রাজ্জাক গুণীজিন বক্তৃতামালার এই ৫ম আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাাপক অজয় রায়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ড. আহরার আহমদ এবং অধ্যাপক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পরিচিতি পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এর আগে চারটি পর্বের মধ্যে প্রথম পর্বে বক্তৃতা পাঠ করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান, দ্বিতীয় পর্বে বক্তৃতা করেন গবেষক ও লেখক বদরুদ্দীন উমর, তৃতীয় পর্বে বক্তব্য রাখেন এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং চতুর্থ পর্বে বক্তব্য রাখেন ড. রওনক জাহান।

 

ছবি: আফজালুর রহমান জেলন