বাংলার দুয়ারে বিশ্ব লোকসংগীত

লোকসংগীত মানেই শিকড়ের গান। হাজার বছর ধরে লোকসংগীতের সুর আলোড়িত করে যাচ্ছে শ্রোতাদের প্রাণ। দিনে দিনে লোকসুরেও লেগেছে আধুনিক যন্ত্রপাতির ছোঁয়া। উন্নয়নের কবলে পড়ে গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, সে পরিবর্তনের বাতাস লেগেছে লোকসংগীতের গায়েও। আর তাতেই লোকসুর, আধুনিক যন্ত্রসংগীতের সঙ্গে ফিউশন হয়ে জায়গা করে নিচ্ছে রক পপের কাতারে। অন্তত জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিচার করলে তেমনটাই মনে হবে। ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের দ্বিতীয় আসরেরও মূল তান ছিল ফিউশনের।
মেরিল আয়োজিত ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব এ বছরও ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসজাগানিয়া। তরুণ-প্রবীণ শিল্পীদের অংশগ্রহণে এই উৎসব হয়ে উঠেছিল সংগীতের প্রাঞ্জল এক আসর। এ প্রজন্ম যে শিকড়ের সন্ধানে অলস নয়, তা-ও প্রমাণ করেছে এই উৎসব।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান সান ইভেন্টসের ডাকে সাড়া দিয়েছিল পাঁচ দেশের স্বনামখ্যাত শিল্পীবৃন্দ। বাংলাদেশের শিল্পী ছাড়াও এই উৎসবে অংশ নিয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও কানাডার শিল্পীরা। আর প্রিয় শিল্পীদের টানে পায়ে ছুটে এসেছেন হাজারো দর্শক। অনুষ্ঠানের তৃতীয় রজনীর সমাপ্ত হওয়ার কথা যখন, তারও বেশ পরে যখন সুশীলা রমণ অ্যান্ড স্যাম মিলস মঞ্চে উঠল, দর্শকের উৎসাহে একটুও ভাটা পড়েনি। প্রবল করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায় সহস্র জনতা।
উৎসবের তিন দিনজুড়েই ছিল খ্যাতনামা শিল্পীদের পরিবেশনা। দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন মমতাজ বেগম, বারী সিদ্দিকী, টুনটুন বাউল, শফি মণ্ডল, আবদুর রহমান। আর বাইরে থেকে এসেছেন ভারতের পবন দাস বাউল, কৈলাস খের, সুলতানা নুরান ও জ্যোতি নুরান, পাকিস্তানের জাভেদ বশির, কানাডার প্রসাদ, স্পেনের কারেন লুগো অ্যান্ড রিকার্ডো মোরো, যুক্তরাজ্যের সুশীলা রহমান অ্যান্ড স্যাম মিলস প্রমুখ শিল্পী ও গানের দল। ১০ থেকে ১২ নভেম্বর তিনটি রাতই মঞ্চ মাতিয়েছেন তাঁরা।
বারি সিদ্দিকীর ‘পুবালি বাতাসে…’, ইসলামুদ্দিনের ‘উতলা সুন্দরী’ পালা যেমন মোহাবিষ্ট করেছিল তেমনি নুরান বোনদের ‘মাস্তকালান্দার’ শুনে কৈলাস খেরের ভাষায় ‘পেয়ার মে দিওয়ানা হো গ্যায়া’। এরকম দর্শকপ্রিয় একটি আয়োজনের আভাস আয়োজকেরা অবশ্য আগে থেকেই দিয়ে রেখেছিলেন।
আয়োজক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী উৎসব শুরুর আগেই সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত ক্ল্যাসিক্যাল ফেস্ট দেখেই আমরা এই অনুষ্ঠানটি আয়োজনের আইডিয়া পেয়েছি। বিনা মূল্যে মানুষকে গান শোনানোর ওই আয়োজনটি আমাদের ভালো লেগেছিল। আমরা তাই শিকড়ের গান নিয়ে উৎসবের আয়োজন করেছি। প্রথমবার মানুষ যেভাবে সাড়া দিয়েছেন, তাতে আমরা অভিভূত। আমরা এ উৎসব চালিয়ে যেতে চাই।’ উৎসবে উপস্থিত থাকার জন্য বিনা মূল্যে অনলাইনে নিবন্ধন করে উৎসবে যোগ দিয়েছেন শ্রোতারা। যাঁরা নিবন্ধন করতে পারেননি, তাঁরাও ঠিক ‘মিস’ করেননি। মাছরাঙা টেলিভিশনে, ফেসবুকে এবং ইউটিউবে সরাসরি দেখা গেছে পুরো সংগীতায়োজন।
ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের টাইটেল স্পনসর মেরিল। এ ছাড়া নানা দিক থেকে সহযোগিতা করছে জিপি মিউজিক, ঢাকা ব্যাংক, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ, রাঁধুনী, বেঙ্গল ডিজিটাল, আমরা কোম্পানিজ, রেডিও দিনরাত, স্কয়ার হসপিটালস লিমিটেড, এইজিস সিকিউরিটি ফোর্স, দ্য ওয়েস্টিন ও সহজ ডটকম।
উৎসবের সমাপনীতে অঞ্জন চৌধুরী বলছিলেন আমাদের লোকসংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে দেওয়ার কথা। সে লক্ষ্যেই বোধ হয় অগ্রহায়ণের তিনটি স্নিগ্ধ সন্ধ্যা উপহার দিলেন তিনি। কিন্তু বিষয়-বৈচিত্র্যে বরং মনে হলো, বিশ্বদুয়ার বাংলার লোকসংগীত নয়, বাংলার মঞ্চে বিশ্বের বিস্তৃত লোকসংগীতের এক জমজমাট উপস্থিতি।