বাংলার লোকবাদ্য

যদি বলি মানুষের শরীরই পৃথিবীর আদিতম বাদ্যযন্ত্র, তাহলে ভুল হবে কি? প্রাচীনকালের সংগীতরসিকগণ কণ্ঠকে বলতেন ‘গাত্রবীণা’। সংগীতের প্রধান উপাদান সুর হলেও তাল অনিবার্য। সেই তালেরও সৃষ্টি হয়েছে হাতের তালি বা তুড়ি থেকে। তাছাড়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছাড়া কোনো বাদ্যই বাজানো সম্ভব নয়। যে বস্তু সুর উৎপন্ন করতে পারে তাকেই যদি বাদ্যযন্ত্র বলা হয়, সেই বিচারে মানবদেহ সুর-তাল-ছন্দ-নৃত্য সবকিছুরই প্রতিভূ। তবুও বিভিন্ন পক্ষ থেকে বাদ্যযন্ত্রের চরিত্রগত শ্রেণিবিভাগে মানবদেহের স্থান মেলেনি।

ভরতের নাট্যশাস্ত্রে (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০) বাদ্যযন্ত্রকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল। তা হলো ‘ঘনবাদ্য’, ‘অবনদ্ধ বাদ্য’, ‘শুষির বাদ্য’ ও ‘ততবাদ্য’। এই বিভাজনের মধ্যে উপাদানগত, বৈশিষ্ট্যগত ও আঙ্গিকগত দিক থেকে সুচারু পর্যবেক্ষণ করা হলে মানবদেহ এই শ্রেণির কোনোটাতে স্থান পায় না। চীনাদের শ্রেণিকরণের ভিত্তি হলো বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের উপাদান, অর্থাৎ কিন (ধাতু), চে (পাথর), তু (মাটি), চু (বাঁশ) ইত্যাদি, এর মধ্যে ‘তু’-এর সঙ্গে দেহের সম্পর্ক অবান্তর নয়। তবে তামিলদের সঙ্গম সাহিত্য মতে বাদ্যকে (করুভি) পাঁচ শ্রেণিতে বিভাজন করা হয়েছে, যথা- তোলে (চামড়া), নরাম্পু (তার), তুলাই (গর্ত-ফাঁপা), কাঞ্চা (ধাতু) এবং মিতাত্রু (মানুষের দেহ)। অতএব তামিলদের সংস্কৃতিতে সরাসরি মানবদেহকে বাদ্যযন্ত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। যে সকল শ্রেণিবিভাগে মানবদেহ বাদ্যের মর্যাদা পায়নি, সেখানে প্রধান কারণ হতে পারে বাদ্যযন্ত্রকে স্বয়ংসিদ্ধ করা। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় বাদ্যযন্ত্রকে বিনির্মাণ করতে করতে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে উন্নীত করা হয়। আদি সমাজ আধুনিক সমাজে রূপান্তরিত হতে গিয়ে যে সকল জাতি তার প্রাচীন সংস্কৃতির সঙ্গে অন্যান্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ করেছে (যেমন হিন্দুস্তানি সংগীতে পাখওয়াজ ভেঙে তবলায় রূপান্তর করা হয়েছে), তাদের বাদ্যযন্ত্রও স্বয়ংসিদ্ধ হয়ে উঠেছে। বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের যোগসূত্র এমন যে, আদিম যুগে মানুষ বাঁশের ওপর আরেকটি বাঁশ ঘষে বা পাথরে পাথর ঘষে আগুন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে শব্দ উৎপাদন করতেও শিখেছিল। ধনুকের তারে আঙুলের টংকার হয়তো বিবর্তিত হয়ে বেহালা, হার্প, সরোদ কিংবা সারেঙ্গিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা আজ বিশেষ কায়দায় দীর্ঘ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে আয়ত্তে আনতে হয়। এর বিপরীতে রয়েছে অনুগতসিদ্ধবাদ্য, এগুলো এখনো জটিল বাদনপ্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হয়নি; অর্থাৎ সভ্যতার বিবর্তনে যন্ত্রের ওপরে নকশা কিংবা উপাদানের তারতম্য ঘটলেও বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন হয়নি খুব একটা। যেমন- খমক, একতারা, মন্দিরা, ঝাঁজ, সারিন্দা ইত্যাদি। পৃথিবীতে প্রাচীন নৃগোষ্ঠী তাঁদের আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব-পার্বণকে আদিরূপে অক্ষত রাখতে চায়, একইভাবে অনুষ্ঠানের নিয়ম রক্ষায় নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের প্রথা রক্ষায়ও অন্যথা করে না। ভারতের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী, চীন, জাপান, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল প্রভৃতি অঞ্চলের লোকেরা অনুগতসিদ্ধ বাদ্যকেই অধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। বাংলাদেশেও প্রায় ৩০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আছে, যাদের কাছে রয়েছে অনন্য কিছু অনুগতসিদ্ধ বাদ্য।

সব স্বয়ংসিদ্ধবাদ্যই যেমন শাস্ত্রীয় নয়, আবার সব অনুগতসিদ্ধই লোকবাদ্য নয়। তাল-সুর এবং ভাষা প্রকাশে শাস্ত্রীয়বাদ্য অনেকটা স্বাধীন এবং তা লোকসংগীতেও ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু লোকবাদ্য শাস্ত্রীয় সংগীতে সঙ্গত করা বা নিজেই বেজে ওঠার ক্ষেত্রে ততটা বৈশিষ্ট্যধারী হয়ে উঠেনি। সহজ করে আবার বলা যায়, শাস্ত্রীয়বাদ্যকে শিল্পীর অনেক শ্রমসাধন করে বশে আনতে হয়। লোকবাদ্যে এমন দীর্ঘশ্রম সাধনের প্রয়োজন হয় না। এক্ষেত্রে লোকবাদকের দক্ষতার প্রকাশ হিসেবে আচার-অনুষ্ঠানের ঐশ্বর্য রক্ষায় লোকবাদ্যের যথার্থ সমন্বয় সাধন করাকেও গুরুত্ব বিবেচনা করা যায়। প্রাচীনকাল থেকে শুধু লোকসংগীতই নয়, পূজা-পার্বণ, ক্রীড়া-উৎসব, ব্যবসা, শিক্ষা, যোগাযোগ, প্রজ্ঞাপন সর্বক্ষেত্রেই লোকবাদ্যের অপরিহার্যতা লক্ষ করা যায়। নৌকা পারাপারে শিঙার ব্যবহার, বেদের সাপখেলার কালে বীণবাদন, রাজা-জমিদারের প্রজ্ঞাপনে ঢাক-ঢোল বাজানো, লোকক্রীড়ায় নাকারা, কাঁসর, দুন্দুভি ইত্যাদি, যুদ্ধে দাদামা, উৎসবে ঢোল-ঢাক-কাঁসি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘণ্টা, প্রার্থনায় জগঝম্প, সিংগিঙ বোল, ঘণ্টা, মন্দিরা-খোল, হিজড়াদের খাদ্যসংস্থানের জন্য হিজড়া ঢোল, হাতবায়া, ভিখারিদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এক ধরনের চুড়ি- এভাবে লোকজীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে লোকবাদ্যের পরিবেশনানির্ভর সম্পর্ক সভ্যতার সূচনা থেকে।

এদেশে প্রথা ভাঙার রীতি উন্মুক্ত থাকায় অথবা অনেকগুলো আদি নৃগোষ্ঠীর বৃহৎ সংস্থা গড়ে ওঠায়, কিংবা ধর্মান্তরিত হয়ে একটি বৃহৎ ধর্মীয় সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবার কারণে লোকবাদ্যের আদলে ঢুকে পড়েছে বিদেশি বাদ্যের চরিত্রাংশ। এ কারণে অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে গেছে পরিচর্যার অভাবে। যেকোনো লোকবাদ্যের উপাদান, কাঠামো, বাদন-পদ্ধতি ও শব্দের স্বাতন্ত্র্য দিয়ে সেই জাতির ইতিহাসের অনেক সূক্ষ্ম অধ্যায়কে নির্ণয় করা যায়। বাংলাদেশ ও তার পার্শ্ববর্তী ভূ-খণ্ডগুলোর সংস্কৃতি প্রাচীনকাল থেকে দেশি গানের ওপরই বিকশিত হয়েছে। সেই বিচারে বাংলার লোকবাদ্য বলতে আদি বঙ্গীয় সংস্কৃতি সঞ্জাত বাদ্যকেই বোঝানো হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু বাদ্যযন্ত্র আছে যা দেশের বাইরে গিয়ে বিকশিত হয়েছে। যেমন, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মপ্রচারের সূত্র ধরে অষ্টম-দশম শতকে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গেছে। ফলে ইন্দোনেশিয়ার পদহি পটহের সঙ্গে, মূরভ মূরজের সঙ্গে, বঙগসি বংশির সঙ্গে, কলহ, ঘণ্টা ইত্যাদি নামে ও কাঠামোর মিল পাওয়া যায়, বাংলার পোহলের সঙ্গে জাপানের সুজুমির হুবহু মিল পাওয়া যায়। কোনো কোনো বাদ্য বিদেশে বিকশিত হয়ে আবার  দেশে ফিরেছে স্বনামে-বেনামে বাউলদের ব্যবহৃত ডুগি-তবলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বায়া নাম ধারণ করেছে। কিছু বাদ্য বহির্বিশ্ব থেকে এসে নতুন নামে দেশজ হয়েছে। যেমন ভায়োলিনের নাম হয়েছে বেহালা। কিছু বাদ্য বিদেশি হিসেবে জানা যায়, যা এককালে দেশি ছিল। কিছু বাদ্য খেলনা হিসেবে পড়ে আছে বা বিলুপ্তির পথে। যেমন, মাটির পাখি, টমটম গাড়ি, ভেঁপু, টুনটুনে, কাশের বেনু ইত্যাদি।

বাংলার লোকবাদ্য বাজানো হয় বাংলার সংগীতাঙ্গনে। কবিগান, পালাগান, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, মারফতি, মাইজভাণ্ডারি, সাঁওতালি, বাউল, ঝুমুর, ভাদু, টুসু ইত্যাদি গানে আবার দুর্গাপূজা, রাস উৎসব, লীলাকীর্তন, দোতরাগান, গম্ভীরা, কুষাণ, যাত্রাগান, বিচারগান, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, মেয়েলিগীত, বিবাহযাত্রা, শোভাযাত্রা, নাটগীত, মনসার ভাসান ইত্যাদি অনুষ্ঠানে বাংলার বাদ্য বাজানো হয়। এদেশে কত ধরনের বাদ্য ছিল তা হিসাব করে বলা যাবে না। অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখনো যা আছে তাও দুই শতের কম হবে না। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাগীতিতে যে সকল বাদ্যযন্ত্রের নাম জানা যায়, তা হলো পটহ, একতারা, ঢোল, হেরুক বীণা, ডমরু, বাঁশি, মাদল, নেউর বা নূপুর, করণ্ড, কশালা, দুন্দুভি, ডমরুলি ইত্যাদি। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে সবচেয়ে বেশি লোকবাদ্যের নাম জানা যায়। দামামা, দগড়, রগড়, ঢাক, ঢোল, খোল, ডম্ফ, বীণা, কাঁশি, বাঁশি, ডুগডুগি, করতাল, ঘণ্টা, মৃদঙ্গ, ভেউরি, ঝাঁঝরি, কাড়া, জয়ঢাক, শঙ্খ, তাসা, ঢেমচা, খেমচা, পাখোয়াজ, মাদল, রামসিঙ্গা, জগঝম্প, শানাই, মুহরি, রাক্ষসী ঢাক, দুন্দুভি, খঞ্জনি, খমক, তবল, তুরি, ভেরি, রণসিঙ্গা, টিকারা, টঙ্কার, মোচঙ্গ, কাহাল, পটহ, বরগা, মন্দিরা, মুহরি, মুরলি বা বংশি, নূপুর, ভেউর, করনাল, পিনাক, সাহিনী, স্বরমণ্ডল, দোতারা, সেতারা, কাংশ্য, সানি, দড়মসা, ভেউর, বিষাণ, মরুজ, পাঢ়া, করড়া, টিকারা, ধাঙসা, কাকল, সারিন্দা, খটক, কিঙ্কিনি-কঙ্কণ, ভরঙ্গ, চুড়ি, তম্বুরা, কপিনাশ, ঘুঙুর, নৌবত, সিংহা, বিপঞ্চা, ঝাম, বর্গেল প্রভৃতি। পরবর্তী সময়ে পুঁথি সাহিত্য, বিভিন্ন গল্পগাথায় উপরোক্ত বাদ্যগুলোর নাম জানা যায়। দক্ষিণারঞ্জন মজুমদার সংগৃহীত ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদাদার ঝুলি ইত্যাদি গল্পকথায় প্রায় ২৬টি লোকবাদ্যের প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে জানা যায়। গ্রামীণ ধাঁধা ও বচনের মধ্যেও বিভিন্ন বাদ্যের নাম ও চরিত্র সম্পর্কে জানা যায়। শক্সখ সম্পর্কে যেমন ধাঁধা আছে ‘জল থেকে তুলে এনে সুডাক ডাকে, মঙ্গল কামে লোকে নিয়ে যায় তাকে’, আবার ঢোলের বোলের রীতি সম্পর্কে প্রবাদ রয়েছে ‘দুর্গাপূজায় শাঁখ বাজে না, ষষ্ঠীপূজায় ঢোল’। এভাবে বাংলার প্রবাদ-প্রবচনের ভাবার্থ করেও বাদ্যযন্ত্রের চরিত্র উন্মোচন করা যায়।

আধুনিক সাহিত্য এবং লোকজীবনের নানা অনুষ্ঠানে উপরোক্ত বাদ্যের ব্যবহার খুব সামান্যই পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলায় শত শত বাদ্য যেমন ছিল তার প্রয়োগও ছিল মহা সমারোহে। আমরা পশ্চিমা অর্কেস্ট্রার কথা বলি, যেখানে শত শত বাদ্যের কথা রয়েছে। কিন্তু এই বাংলায় যে লাখ লাখ বাদ্যযন্ত্রের অর্কেস্ট্রা হতো, একসঙ্গে বাজানোর রীতি সম্পর্কে প্রাচীন সাহিত্য নিদর্শনে রোমহর্ষক বর্ণনা শুনলে আশ্চর্য হতে হয়ে। কবি কৃত্তিবাসের রামায়ণে রাবণের যুদ্ধ-বাদ্যর আয়োজন কেমন বিশাল ছিল তার বর্ণনা করা হয়েছে এরূপ:

‘রাবণের বাদ্যভাণ্ড সাত অক্ষৌহিণী

এক লক্ষ দগড় দুই লক্ষ করতাল,

দুই সহস্র ঘণ্টা বাজে মৃদঙ্গ বিশাল\

ভেউরি ঝাঁঝরি তিন লক্ষ কাড়া

চারি লক্ষ জয়ঢাক ছয় লক্ষ পাঁড়া\

বাজিল চৌরাশি লক্ষ শক্সখ আর বীণে

তিন লক্ষ তাসা বাজে দামামার সনে\

ঢেমচা খেমচা বাজে বাজে দুই লক্ষ ঢোল

তিন লক্ষ পাখোয়াজ বিস্তর মাদল\

জয়ঢাক রামসিঙ্গা বাজে জগঝম্প

শানাই মাহরী বাজে ত্রিভুবন কম্প\

বাজিল রাক্ষসী ফাক পঞ্চাশ হাজার

দুন্দুভি ডম্বুর শিঙা সংখ্যা করা ভার\ …

তুরী ভেরী রণসিঙ্গা বার লক্ষ বাঁশী

দগড়ে রগড় দিতে দশ লক্ষ কাশী\’

বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে যুদ্ধকৌশলের পাশাপাশি নৃত্যকৌশলও যে কম ছিল না, তার প্রমাণ চর্যাপদ থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত হয়ে নাচাড়ি, পালা, পাঁচালি, ভাসানযাত্রা, পূজা-পার্বণের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৃত্যের প্রচলন লক্ষণীয়। তাই এদেশের বেশিরভাগ বাদ্য তালবাদ্য ও ঘনবাদ্য।

বাংলা ভূখণ্ডে বাঙালি ছাড়াও বেশকিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। যেমন, চাকমা, মারমা, টিপরা, গারো, হাজং, দলাই, সাঁওতাল, মণিপুরি, মুরং, রাখাইন, লুসাই, খাসিয়া প্রভৃতি। এদের প্রত্যেক জাতির রয়েছে নিজস্ব কিছু বাদ্যযন্ত্র। চাকমাদের জুমনৃত্য ও বিজু উৎসবে ব্যবহৃত প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রের বাইরে খেংগ্রং, ধুধুক, ওকিং অন্যতম। মারমাদের পাংকো যাত্রানৃত্যে ঢোল জাতীয় বুংপাই, মং, পাইওয়ানা, চিং চোয়াক, বাংগ্য বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। টিপরাদের জুমনৃত্য, মাইলুমা নৃত্য, গরইয়া নৃত্যে সুমুর, মুরলী, সাইন্দা, চংপ্রেং, খ্রাম, দাংদুং, তট্টমা, ফকির ডাঙ গয়সা, জুরি ইত্যাদি বাজানো হয়। মণিপুরিদের লাই হারাউবা নৃত্য এবং সাঁওতালদের ঝুমুর, মোড়ক, লাগরেক্র নৃত্যে মৃদঙ্গ, মাদলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। গারোদের বেশকিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। যেমন, ক্রাম, দামা, রাং, আদুরি, বাংশিকা আল, দুমচাং, গংগেন্দ, ইম্বাংগি, গং, মেকুর, ঘুঙুর ইত্যাদি। তঞ্চঙ্গ্যাদের খেংখং, বেলা, ধুধুক উল্লেখযোগ্য। এছাড়া মুরংদের গং, লাং, রাখাইনদের সাইং ক্রিং ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাংলারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র বলা যায়। মোটকথা প্রাচীনকালের সাহিত্য নিদর্শনে পাওয়া অধিকাংশ বাদ্যযন্ত্রের এখন আর তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তারপরও গ্রামাঞ্চলে অনুসন্ধান চালালে এখনো অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের সন্ধান মিলবে, যা পৃথিবীর কোনো দেশের সংগীত প্রচলনেই এত বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এত বিচিত্র বাদ্যযন্ত্র পাওয়ার কারণ প্রচুর পরিমাণ নির্মাণের সহজলভ্য উপাদান- বাঁশ, কাঠ, লোহা, তামা, চামড়া, মাটি, বেত ইত্যাদি। অন্যদিকে প্রতিটি গ্রামে একেক ধরনের পরিবেশনারীতি রয়েছে। একদিকে ভাববাদী গানের চর্চা, অন্যদিকে ধর্ম, বিনোদন ও মানবিক বিকাশের জন্য অবারিত সৃষ্টির নেশা। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সংগীতের সঙ্গে গভীর সম্প্রীতি থাকা সত্তে¡ও নতুনভাবে প্রাণ সঞ্চার করা শিল্পীদের নৈমিত্তিক অভ্যাস, বাদ্যযন্ত্রের নির্মাণ ও প্রয়োগ এই অভ্যাসেরই আংশিক প্রতিফলন। বহির্বিশ্বে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোয় দক্ষ শ্রমিকের মাধ্যমে নির্ধারিত কিছু প্রধান সারির বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়, এদেশে সেই ধরনের কারখানা গড়ে উঠেনি। তাই অঞ্চলভেদে লোকশিল্পীরাই তৈরি করেছে নিজেদের পরিবেশনের উপযোগী বাদ্যযন্ত্র। তবে ভিন্ন কিছু তথ্যও আমাদের বিস্ময় সৃষ্টি করে। যেমন, ব্রিটিশ আমলের সূচনালগ্নে ঢাকা থেকে অতি উৎকৃষ্টমানের বেহালা বানিয়ে বিদেশে রফতানি করা হতো বলে প্রমাণ রয়েছে। আজ ঢাকাই মসলিনের মতো সেই সব কর্মদক্ষ কৌশলও বিলুপ্ত হয়ে গেছে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে।

বাদ্যযন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে আগ্রাসন বা উদাসীনতা যা-ই থাকুক না কেন, এর বাদন পদ্ধতি ও নির্মাণ-কৌশল জানা গেলে হয়তো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতো। সেকালে শত-সহস্র দক্ষ কারিগর ছিল, প্রতিটি আদর্শ গ্রামেই বাদ্যযন্ত্র নির্মাণ করা হতো। আর এখন সারা বাংলাদেশ খুঁজেও হয়তো ৫০ পরিবার মিলবে না। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা শহর ও তার আশপাশের সকল বাদ্যযন্ত্রের নির্মাতা এখন নারায়ণগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জের গোটা পনের পরিবার হবে কি না সন্দেহ।

ধ্রুপদী বাদ্যযন্ত্র শেখার জন্য প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী বিদেশে যায়, কিন্তু তুলনামূলক এদেশের সহজ ও শ্রুতিমধুর বাদ্যগুলোর প্রতি কারোর আকর্ষণ লক্ষ করা যায় না। টেলিভিশন, রেডিও ও মঞ্চে বিদেশি বাদ্যের উচ্চৈঃস্বরের ঝনঝনানির মধ্যে দু-একটি বাংলার বাদ্য রাখলে কী এমন ক্ষতি হতো। আধুনিক গান কম্পোজিশনের জন্য সিনথেসাইজারের কৃত্রিম স্বর নিয়ে এত মাতামাতি হয়, অথচ সহজে প্রাপ্য বাদ্য থেকে শব্দ সংযোজন করার মানসিকতা কারোর নেই। এই ধরনের উপেক্ষার পেছনে প্রধান অন্তরায় হলো উচ্চশিক্ষায় সংগীতের গুরুত্ব না থাকা। আজকের মোবাইল ও অনলাইন টেকনোলজির যুগে প্রতিটি তরুণের হাতে রয়েছে গান শোনার অস্ত্র। বিনোদনে এর কোনো বিকল্প নেই। অথচ সংগীত শিক্ষার প্রতি ঔদাসীন্য খোদ প্রজাতন্ত্রের কোনো কোনো মহল থেকে। অথচ মনে রাখা দরকার একটি বাদ্যযন্ত্রের বিলুপ্তি মানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি স্তম্ভের বিলুপ্তি। ছয় হাজার বছর আগে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার নিদর্শনে সাতটি ছিদ্রওয়ালা হাড়ের বাঁশি থেকে প্রমাণ করা সম্ভব হয় যে, তখনকার মানুষ সাত সুরে গান করতো। বাদ্যযন্ত্র কিন্তু ব্যক্তির খেয়ালখুশিতেই তৈরি হয় না। অন্তত লোকবাদ্যের সঙ্গে সেই লোকজীবনের ভাব-দর্শন ও সত্তার যুগ-যুগান্তরের যোগ থাকে। তাই বাদ্য বিলুপ্ত হলে জাতিসত্তার পরিচয়ও বিলুপ্ত হতে পারে। অন্যভাবে বললে জাতিসত্তার বিবর্তন হলে বাদ্যযন্ত্রও বিলুপ্ত হতে পারে। এ কারণে এদেশে একটি শক্ত সামর্থ্য লোকবাদ্যের সংরক্ষণমূলক পরিচয় ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

একটি জাতির পরিচয়দানের জন্য লোকবাদ্য ভাষাশক্তির ন্যায় কাজ করে। ভাষার ধনাত্মক রূপই বোল বা বাণী। প্রতিটি বাদ্যেরই নিজস্ব একটা বোল-বাণী থাকে, যা ভাষার ভাবার্থকে ধনাত্মক উপায়ে প্রকাশ করে। তাই বাদ্যযন্ত্র আন্তর্জাতিক ভাষার ন্যায় বিশ্বভুবনে আত্মবিকাশের সুযোগ করে দেয়। এছাড়া বাদ্যের যথার্থ প্রয়োগ না থাকলে বিনোদন ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ ও পরমুখাপেক্ষী হয়ে ওঠে; আজ যেমন আমাদের সংগীত জগৎ বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের পুরোটা মুখাপেক্ষী হয়ে গেছে। এদেশের বিশেষ কিছু বাদ্যযন্ত্র আছে যেমন তবলা, বীণা, সেতার, সরোদ, পাখওয়াজ ইত্যাদি বাদ্য বহু দূর দেশের মানুষকে অতি আগ্রহ নিয়ে শিখতে দেখা গেছে। ভবিষ্যতে হয়তো এগুলো তারা আরো উন্নত করে নির্মাণ করবে, যেভাবে বাংলার প্রাচীন অনেক বাদ্যের সঙ্গে চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। তাই বলি, আত্মপরিচয়ের সংকট লাঘব হবে না যতদিন পর্যন্ত লোকবাদ্যের পাশাপাশি দক্ষ কারিগরদেরও পুনর্বাসন করা না হবে। সংস্কৃতির ঐশ্বর্য ফিরিয়ে আনতে ও সমাজের মুক্তির প্রশ্নে পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন একটি কঠিন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।