বায়োস্কোপের নেশায়…

ইয়া লম্বা লাল টুপি, রঙিন জামা আর পাজামায় সঙ সেজেছেন একজন। তাঁর হাতে ডুগডুগি। নানা ছন্দ ও সুরে আহ্বান জানাচ্ছেন হাটের ক্রেতাদের। তিনি গাইছেন-

‘ওরে কাকা-কাকি জেঠা-জেঠি দাদা-দাদি ভাই,

তাজমহল মোর বাক্সে কোনো ভুল নাই,

আরে দেখো দেখো।

মাত্র দুই টাকায় দেখো তোমরা কত অবাক কাণ্ড,

না দেখলে ভুল করবা পস্তাইবা আর তো পাইবা না।’

লাল বাক্সের বায়োস্কোপকে ঘিরে ততক্ষণে জমে উঠেছে আসর। সঙ সাজা মানুষটির চারপাশে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। লাল বায়োস্কোপের ফুটোতে চোখ রেখেছে শিশুরা। বাক্সের ভেতর রঙিন ফিতায় ঘুরছে নানা ছবি। বাক্সের ভেতর যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে রঙিন দুনিয়ার মানুষ। শিশুদের কী আনন্দ! সঙ সাজা মানুষটি বলে চলেন রহিম বাদশা-রূপবানের কাহিনী। ততক্ষণে প্রথম পর্ব শেষ। দ্বিতীয় পর্বে ডালিমকুমার আর মালকাবানুর গল্পে হাস্যরসে মাতোয়ারা দর্শক-শ্রোতা। ইতিহাসের নানা গল্পও মেলে ধরেন তিনি। সুরে সুরে শোনালেন শাহজাহান-মমতাজ, ক্ষুদিরাম ও বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের গল্প।

এ গল্প খুব বেশি দিন আগের নয়। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎসেবা পৌঁছানোর আগে প্রতি হাটবার ও মেলায় বায়োস্কোপের আসর বসত। আকাশসংস্কৃতির বিস্তারে হারাতেই বসেছে বিনোদনের এই ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম। তবু পারিবারিক ও দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি নিবিড় মমতা আর ভালোবাসায় সে বায়োস্কোপকে টিকিয়ে রেখেছেন কিছু মানুষ। শত প্রতিবন্ধকতা সত্তে¡ও তাদের স্বপ্ন আবর্তিত হয় বায়োস্কোপকে ঘিরে।

বরিশালের বানারীপাড়ার কুন্দিহাট গ্রামের আবদুল হক। ছোটবেলাতেই বায়োস্কোপের নেশায় বিভোর। পড়া ফেলে ছুটতেন বাজারে। প্রতি হাটবারে বসত বায়োস্কোপ। রঙিন ফিতে ঘুরছে, একের পর এক দৃশ্য আসছে- ব্যাপারটা বেশ ভাবাত তাঁকে। রঙিন বাক্সে বিনোদনের কত উপকরণ। মনের কোণে উঁকি দেয় রঙিন স্বপ্ন। ভাবতেন, বড় হয়ে বায়োস্কোপওয়ালাই হবেন। কিন্তু অভাবের সংসারে টানাপড়েন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় রিকশা চালিয়েছেন, আইসক্রিম বিক্রি করেছেন। ১৯৯৮ সালে জীবনের তাগিদে চলে আসেন ঢাকায়। মিরপুরে বেনারসি পল্লীর কালাপানির ট্যাঙ্কি এলাকায় বসত গড়েন। আবদুল হক প্রথমে রিকশা চালিয়েছেন। পরে আইসক্রিম বিক্রি করেছেন; নাইটগার্ডের চাকরি করেছেন কিছুদিন। কিন্তু কোনো পেশাতেই মন বসে না। বায়োস্কোপের নেশা এমনভাবে পেয়েছে যে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করলেন বায়োস্কোপের গুরুকে। গুরুর দেখা মেলা ভার। হতাশ হলেন না আবদুল। পল্লবীর কালাপানি এলাকায় দেখা মিলল গুরুর। ময়মনসিংহের কালামের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। গুরুর প্রদর্শনীর সাথি হলেন আবদুল। একদিন শিখে গেলেন বায়োস্কোপের খেলা। পুরনো কাঠ দিয়ে বানালেন বায়োস্কোপ। এবার ছবি সংযোজনের পালা। ছুটলেন পুরান ঢাকার চকবাজারে। সেখানেই মিলল সিনেমার পরিত্যক্ত রিল। সেগুলো বাছাই করে নিয়ে এলেন। ঘরে এসে ফের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলে। তারপর পরিমাপমতো কেটে ছবি সংযোজন করেন। আবদুল জানালেন, দর্শকপ্রতি পাঁচ টাকা করে নেন তিনি। প্রথম দিকে বায়োস্কোপের দর্শকের অভাব হতো না। দৈনিক আয় হতো ১০০-১৫০ টাকা। বিনোদনের এই প্রাচীন মাধ্যমটির প্রতি ছিল মমত্ব ও ভালোবাসা। বায়োস্কোপওয়ালার খবর ছড়িয়ে পড়ে নগরে। বিভিন্ন আয়োজনে বায়না করতে আসেন বিত্তবানরা। বাংলা সংস্কৃতির নানা আয়োজনে আবদুল ছুটেছেন বায়োস্কোপ নিয়ে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, করপোরেট হাউস, তারকা হোটেলে তিনি প্রদর্শনী করেছেন। গিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদের নুহাশপল্লীতে। প্রিয় মানুষটির কথা ভীষণ মনে পড়ে তাঁর। শিশু থেকে বৃদ্ধ- সবাই প্রাণভরে উপভোগ করেছেন বায়োস্কোপের প্রদর্শনী। ভিনদেশি দর্শকও মুগ্ধ হয়ে বকশিশ দিয়েছেন তাঁকে। সেই বকশিশ সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন আবদুল।

অতীত থেকে ফিরে আসি বর্তমানে। এখন কেমন কাটছে, প্রদর্শনীর কী হাল- প্রশ্ন শুনে রাজ্যের আঁধার ভর করল তাঁর মুখে। গোমরা মুখে বললেন, ‘আগের মতো বায়োস্কোপের প্রদর্শনী হয় না। প্রতিদিন বের হই না। এখন কেউ বায়োস্কোপ দেখতে চায় না। দেখলেও টাকা দিতে চায় না। মাসে তিন-চারটি প্রদর্শনী থাকে। এ দিয়েই চলছে সংসার।’

আবদুলের সংসারে স্ত্রী ও চার ছেলে। বড় ছেলে বাবার পেশা ভালোবেসে শিখেছেন বায়োস্কোপের নানা বিষয়। বাবার বিভিন্ন প্রদর্শনীতে তিনিও সাথি হন। আবদুলের সব কৃতজ্ঞতা তাঁর স্ত্রী কুলসুমের প্রতি। টানাপড়েনের সংসারে বায়োস্কোপের নেশায় পেয়ে বসা আবদুলকে উৎসাহ দেন তিনি। তাঁর ছোট্ট ঘরে বউ হয়ে এসেই কখনও বায়োস্কোপ নিয়ে অভিযোগ ও হতাশা প্রকাশ করেননি। কুলসুম বলেন, ‘স্বামীর পেশাকে আমি সম্মান জানাই। এমন একটা ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখছেন আমার স্বামী। তাঁর পাশে থাকা আমার কর্তব্য।’ পাশে বসা আবদুল কৃতজ্ঞচিত্তে স্ত্রীর হাতটি লুকালেন নিজের মুঠোয়। প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও ভালোবাসার এমন নিবিড় বন্ধনই স্বপ্ন দেখায় তাঁকে।

এবারের পহেলা বৈশাখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বায়োস্কোপ নিয়ে এসেছিলেন মাদারীপুরের সালাম মিয়া। তিনি জানালেন, বায়োস্কোপ তাঁদের পারিবারিক পেশা। তাঁরা তিন ভাই এ পেশায় আছেন। সালামের একমাত্র পেশা বায়োস্কোপ। বাকিরা অন্য পেশায় জড়িত। সালাম শোনালেন ফেলে আসা দিনের কথা, ‘মেলা-পার্বণ ছাড়া কখনও কখনও বায়োস্কোপের বাক্স কাঁধে নিয়ে ঘুরতাম পাড়ায় পাড়ায়। টাকার সঙ্গে মিলত ধান-চাল। সেদিন আর নাই। এখন ছেলেমেয়েরা বায়োস্কোপ দেখে না।’ প্রতি হাটবারে সালাম ছোটেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ঐতিহ্যের টানে অনেকেই আসেন বায়োস্কোপ দেখতে। পাঁচ টাকার বিনিময়ে সালাম বলে চলেন ইতিহাস-ঐতিহ্য আর রূপকথার নানা গল্প। আক্ষেপের সুরে সালাম বলেন, ‘ঘরে ঘরে টিভি চলে। নানা রঙ-বেরঙের ছবি দেখা যায় তাতে। আমাদের কাঠের বাক্স এখন আর চলে না। কেউ আমাদের খবর রাখে না। মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে বাক্সখান গাঙে ভাসাইয়া দিই।’ কিন্তু পারেন না। বাপ-দাদার স্মৃতিটুকুই যে তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সালামের দৈনিক আয় ৫০-৬০ টাকা। আত্মীয়দের অনেকে বায়োস্কোপ ছাড়তে বললেও সালাম রাজি নন। তাঁর সাফ কথা, ‘না খাইয়া মইরা যামু, বায়োস্কোপ ছাড়মু না।’ নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় চৈত্রসংক্রান্তি মেলায় কথা হলো বায়োস্কোপওয়ালা নূর হোসেনের সঙ্গে। রূপগঞ্জের নূর হোসেন পেশায় সবজি বিক্রেতা। পারিবারিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে মূল পেশার পাশাপাশি বায়োস্কোপের প্রদর্শনী করেন তিনি। ১৮ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। নূর হোসেন বলেন, ‘প্রথমে বায়োস্কোপ দেখিয়েই সংসার চলত। দৈনিক আয় হতো ৩০ টাকা। সে টাকায় দিব্যি চলে যেত। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বায়োস্কোপের জনপ্রিয়তা কমেছে।’ রূঢ় বাস্তবতায় বায়োস্কোপওয়ালা নূর হোসেন পেশা বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। সে গল্প বড় নির্মম। তিনি বলেন, ‘পেটের ক্ষুধা বড় খারাপ জিনিস। ছেলেমেয়েরা না খেয়ে থাকে। তাদের স্কুলের বেতন দিতে পারি না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেক আশা। তারা লেখাপড়া শিখে ভালো কিছু করবে। তাই পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছি।’

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের বায়োস্কোপওয়ালা শাহজাহান মিয়া। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বেছে নেন বায়োস্কোপের পেশা। মুক্তিযুদ্ধের পর দেড়শ’ টাকায় বায়োস্কোপ কেনেন তিনি। এরপর বায়োস্কোপের আয়েই চলছে তাঁর সংসার। বায়োস্কোপ নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে যান দেশের আনাচে-কানাচে। বায়োস্কোপের মালিক শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘সিলেট, চট্টগ্রামসহ সব জায়গাতেই ঘুরি। বায়োস্কোপে নতুন ছবি ও গান দেখাই। তাই দর্শকও মজা পায়। আয়ও বাড়ে। এই কইরাই আমার সংসার চলে। মরার আগ পর্যন্ত এ কাজই করমু। তারপর পুলাপাইন করব। এই পেশা টিকাইয়া রাখমু। কারণ মানুষ খুব মজা পায়, আমারে সম্মানও করে। মানুষরে আনন্দ দেওয়ার চাইতে পুণ্যের কাজ আর কী আছে?’ বায়োস্কোপে শাহজাহান মিয়া নায়ক-নায়িকার বিচ্ছেদই নয়, দর্শক চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ভাষণ, পীর-ফকিরের মেলার বিভিন্ন ছবিও প্রদর্শন করেন। প্রদর্শনীতে জনপ্রতি পাঁচ টাকা নেন। এ কাজ করেই জীবনের ৪০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। প্রযুক্তির দাপটে দেশীয় সংস্কৃতি যখন হুমকির মুখে, শাহজাহান মিয়া তখন আশায় বুক বাঁধেন। বায়োস্কোপের রঙিন বাক্সটি ঘিরে তাঁর স্বপ্ন আবর্তিত হয়। শাহজাহান মিয়া স্বপ্ন দেখেন- বায়োস্কোপের চাহিদা বাড়বে। ঐতিহ্যের টানে ছুটে আসবে দর্শক। তাঁর কদর বাড়বে, সংসারে সচ্ছলতা আসবে।

বায়োস্কোপকে ঘিরে স্বপ্ন বোনা এই মানুষগুলো জীবনের তাগিদ বা ঐতিহ্যের টানে টিকিয়ে রেখেছেন বায়োস্কোপ। সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশসংস্কৃতির কারণে বায়োস্কোপ হারিয়ে গেছে- কথাটি মিথ্যা। মানুষের সদিচ্ছা থাকলে বায়োস্কোপ টিকিয়ে রাখা কোনো ব্যাপার নয়। নতুনকে গ্রহণের পাশাপাশি পুরনো ঐতিহ্য লালনের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তবেই টিকে থাকবে এই বায়োস্কোপ।

 

ছবি: আবীর হাসান উল্লাস

তথ্যসূত্র: মোহনা ইসলাম নিশি