বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে হবে

অর্থনীতি চর্চা ও সাধনার মাধ্যমে খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত অলোকনন্দা প্যাটেল। বর্তমানে ভারতের আহমেদাবাদের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ এর সঙ্গে। অর্থনীতির জটিল চর্চার পাশাপাশি সংগীত ও সাহিত্যের আনন্দভুবনেও তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। রামপুর ঘরানার শাস্ত্রীয় সংগীতে তিনি রীতিমতো বিশেষজ্ঞ। ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় ১৯৩৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন অলকনন্দা প্যাটেল। শৈশব এবং কৈশর কাটিয়েছেন বাংলাদেশেই। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডসহ বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। শিক্ষা দান করেছেন খ্যাতনামা সব প্রতিষ্ঠানে, গবেষণা করেছেন বহুত্বধর্মী সংস্কৃতির সমাজ ও তার টেকসই উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে। তাঁর পদচারণা ভুবনময় হলেও বরিশাল এবং ঢাকার শৈশবস্মৃতি এখনও পরম যত্নে লালন করেন হৃদয়ে। সম্প্রতি তাঁর স্মৃতিমথিত একটি গ্রন্থ পৃথিবীর পথে হেঁটে’ প্রকাশিত হয়েছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্‌স থেকে। বেঙ্গল বারতার সঙ্গে কথা বললেন সেসব নিয়েই   

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টা স্বচক্ষে দেখেছেন। তারপর ভারতবর্ষ ভেঙে একে একে জন্ম নিল তিনটি রাষ্ট্র। আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এর কেমন প্রভাব পড়েছে বলে আপনার মনে হয়?

সাহিত্যের প্রতি দেশ-বিভাগ একটা আঘাত হিসেবে এসেছে। স্বভাবতই সাহিত্যে এর ব্যাপক প্রভাব। অনেক বই লেখা হয়েছে এসব নিয়ে। যেমন, আমার বইয়ে (পৃথিবীর পথে হেঁটে) রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নেই কিন্তু এতে করে আমাদের জীবন কীভাবে বদলে গেল সেসব কথা আছে। এছাড়া আমি উর্দু, বাংলা উভয় ভাষার সাহিত্যেই প্রচুর বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব দেখেছি। বিশ্বযুদ্ধ ছিল এক যন্ত্রণাবিধুর দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। তার সঙ্গে আমরা দুর্ভিক্ষও দেখেছি। এই দুঃসময় শেষ হতে না হতেই এল দেশ বিভাগ। এর প্রভাবও আবার গোটা ভারতবর্ষে একরকমভাবে পড়েনি। আমরা যারা পূর্বের দিকের তাদের মনের ওপর প্রভাবটা বেশি আবার যারা পশ্চিমের দিকে তাদের ওপর প্রভাব কিছুটা কম। যুদ্ধে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ মারা গেছে। সেটা আমাদের ওপর যতটা প্রভাব ফেলেছে ওদের ওপর ততটা ফেলেনি। আবার দেশভাগের সময় অনেক মানুষ দেশান্তর হয়েছে। কাজেই সমাজে পরিবর্তন হয়েছে, সংস্কৃতিতে পরিবর্তন হয়েছে। যার প্রভাব সাহিত্যেও পড়েছে।

চল্লিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন ছিলো? সেসময়কার ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কেমন ছিলো?

আমি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছি এবং অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজে তো পড়েছিই, বাবা-মা, কাকাদের কাছেও শুনেছি। একেবারেই তুলনাহীন। শুধু যে বড় বড় মনীষীরা এখানে পড়াতেন সেজন্য নয়। এখানে এমন একটা পরিবেশ ছিলো যে মাস্টারমশাইদের জীবনই ছিলো শিক্ষকতা। শুধু গবেষণা করা বা প্রবন্ধ লিখে নাম করার চেয়ে পড়ানোর দিকে ওনাদের মনোযোগ অনেক বেশি ছিলো। ছাত্রদের তৈরি করার ব্রত ছিলো তাঁদের মধ্যে। আমার বাবা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রখ্যাত অধ্যাপক অমিয় কুমার দাশগুপ্ত) বলতেন, ‘যারা মেধাবী ছাত্র আমি শুধুমাত্র তাদের শিক্ষক নই। যেমন, অর্থনীতিতে যে ছাত্রটির আগ্রহ নেই, তাকেও অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা করতে শেখানোই আমার কাজ।’ ছাত্রদের মধ্যে মৌলিক চিন্তার উদ্রেক ঘটানোই ছিল সেসময়কার শিক্ষকদের কাজ। ওই সময়কার ছাত্রদের মধ্যে সবাই যে খুব বড় গবেষক হয়েছেন তা নয় তবে ছাত্র হিসেবে তাঁরা অনেক ভালো ছিলেন, তাঁদের পড়াশোনা অনেক ছিলো। আর শিক্ষকদের কাছে তাঁদের ছাত্র-ছাত্রীরাই ছিল জীবন। প্রাণ দিয়ে অধ্যাপনা করতেন তাঁরা। এখন যে পরিবর্তনটা দেখি তা হলো দেশে বিদেশে বিভিন্ন কনফারেন্স, মিটিং-এ যাওয়ার দিকে মন ছিলো না তখনকার শিক্ষকদের। পড়ানোকেই মূল কাজ বলে মনে করতেন তাঁরা। এখন যেটা সম্ভব হয়না তা হলো, তখনকার ছাত্ররা শিক্ষকদের বাড়িতে যেতেন। আমাদের বাড়িতে একটা নিয়ম ছিল, যেকোনো ছাত্র এসেই বাবার লাইব্রেরিতে বই পড়তে পারতেন, কিন্তু বাড়িতে বই নিয়ে যেতে পারতেন না। বই পড়া, খাওয়া দাওয়া করে সবাই বাড়িতে ফিরে যেতেন। এমনটা আমি কোথাও দেখিনি। জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সব ছাত্রকে বাড়ির ছেলে মনে করার মতো একটা নিকট সম্পর্ক ছিলো শিক্ষক ও ছাত্রদের মাঝে। রাজ্জাক সাহেব (জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক) একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গেছেন, তখনকার জেষ্ঠ অধ্যাপকরা, যারা বিভাগীয় প্রধান বা ডিন ছিলেন, প্রসাশনিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন, সবসময় ছাত্রদের সময় দিতে পারতেন না। ছাত্রদের সত্যিকার অর্থে তৈরি করতেন ক্লাস ওয়ান, ক্লাস টু লেকচারাররা। তাঁদের কাজ ছিলো গবেষণা করা আর ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো। এবং সত্যিকার অর্থে, ছাত্ররা তাঁদেরই বেশি মনে রেখেছেন। কারণ, তাঁদের সঙ্গটাই বেশি পেয়েছেন ছাত্ররা।

আপনার বাবা অধ্যাপক ড. অমিয় কুমার দাশগুপ্ত ছিলেন বাংলাদেশে অর্থনীতি চর্চার একজন মাইলফলক ব্যক্তিত্ব। আপনারও অধ্যয়নের বিষয় ছিলে অর্থনীতি। তো বাবার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?

আমার ডাকনাম ছিলো বিবি। বাবাও এই নামেই ডাকতেন। আমার উপর ভীষণ আস্থা ছিলো বাবার। শেষ বয়সে যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন, সারাক্ষণ বলতেন, বিবি কাছে থাকলে আমার আর চিন্তা নেই, ও সব ঠিক করে দেবে। বাবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো বলব না, তবে অর্থনীতি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হতো।

বাবা কখনও ঢাকা ভুলতে পারেননি। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার ৪০ বছর পরেও শেষ বয়সে বলতেন, ‘আমাদের ঢাকা’। সবকিছুর সঙ্গে তুলনা করে বলতেন আমাদের ঢাকায় এটা এরকম ছিলো, সেটা ওরকম ছিলো। আমরা কিন্তু দেশভাগের আগেই ঢাকা থেকে চলে যাই। ফিরব বলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু দেশভাগের কারণে আর ফেরা হয়নি। তবু ঢাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কখনওই ভুলতে পারেননি তিনি। তাঁর প্রিয় ছাত্র পরিমল রায়, আব্দুর রাজ্জাক, এম এন হুদার কথা বলতেন সারাক্ষণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চিরকাল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন।

আমার সঙ্গে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের মতোই দারুণ সম্পর্ক ছিলো বাবার সঙ্গে। সৌভাগ্যবশত অর্থনীতিতে আমার আগ্রহের বিষয় ছিল অর্থনীতির তত্ত্বের ইতিহাসে। আর বাবা তো ছিলেন মস্তবড় তাত্ত্বিক। বলা হয় ভারতবর্ষে থিওরিটিক্যাল ইকোনমিকসের চর্চা তিনিই শুরু করেন। ইতিহাস বাবা খুব ভালো জানতেন। তাঁর কাছে শুনে শুনেই মূলত আমার আগ্রহ জন্মে। বাবা আমার শিক্ষকও ছিলেন। তাই কথা বলার অনেক বিষয় ছিলো। বাবা ভীষণ মনযোগ দিয়ে বাগান করতেন। আমিও সাহায্য করতাম সেখানে। বাবার আদর্শে বড় হয়ে আমিও হয়েছি বাবার মতো।

চল্লিশের দশক পর্যন্ত আপনারা সপরিবারে ঢাকায় ছিলেন। সেসময় ঢাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ কেমন ছিলো?

ঢাকা সাংস্কৃতিক পরিবেশ অন্তত কুড়ির দশক থেকে অনেক জাগ্রত ছিল। আমার বইয়ের মধ্যে (পৃথিবীর পথে হেঁটে) আমি লিখেছি। তখন বুদ্ধদেব বসু, মন্মথ রায় এরা সব নবীন লেখক। সবাই মিলে লেখালেখির ভুবনে নতুন একটা যুগ এনে দিচ্ছে। অবাক হয়ে দেখেছি শাস্ত্রীয় সংগীত এখানে কতটা জনপ্রিয় ছিল। আমি নিজেও জানতাম না। তবে এ বইটি লেখার সময় পড়তে গিয়ে খুঁজে পেয়েছি। কোথায় ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুর, কোথায় গোয়ালিয়র সেখান থেকে মস্তবড় সব ওস্তাদ এখানে আসতেন, গান শেখাতেন, থাকতেন। সুতরাং নিশ্চই পৃষ্ঠপোষক অনেক ছিলেন। ঢাকার নবাব বাড়ি এবং রূপলাল হাউজের শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর খুব বিখ্যাত ছিলো। তাছাড়া মন্দিরগুলোতে ধ্রুপদ, খেয়াল পরিবেশন করা হতো। এমনকি আমার নানাবাড়িতেও দেখেছি শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর বসতে। এ অঞ্চলে শাস্ত্রীয় সংগীতের ব্যপক বিস্তৃতি ছিলো। ত্রিশের দশকে নজরুল সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত চর্চা বৃদ্ধি পায়। চল্লিশের দশকে আমি নিজেই লায়লা আরজুমান্দ বানুর গান শুনেছি। অত্যন্ত জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন তিনি। আরও অনেকেই ছিলেন যাদের নাম আমি জানি না। এছাড়া লেখালেখি তো হতোই। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়টা ছিলো একটা কেন্দ্র। সেটাকে কেন্দ্র করে সাহিত্য পত্রিকা বের হতো। শতদল আর বাসন্তিকা নামে দুটো পত্রিকা ছিলো। যতদূর মনে পড়ে একটা ঢাকা হল আরেকটা জগন্নাথ হল থেকে প্রকাশিত হতো। তাদের মাঝে রেশারেশি ছিলো। এই প্রতিযোগীতার মাধ্যমে সাহিত্য খুব উন্নত হতো। এর বাইরেও চর্চা ছিলো। প্রচুর সাহিত্যসভা হতো। সাহিত্য ও সংগীত চর্চা হতো খুব। তবে নাচের চর্চা কেমন হতো আমি বলতে পারি না। হিন্দু সমাজেও মেয়েদের নাচকে সহজভাবে নেওয়া হতো না। তাই হয়ত অতটা শেখা হতো না। তবে প্রচলণ ছিলো। কারণ, আমার বইয়ে আছে, উদয় শংকর যখন এসেছিলেন তখন ব্যপক আলোড়ণ সৃষ্টি হয়েছিলো।

নাটক হতো প্রচুর। কলকাতা থেকে নাটকের দল তাদের নাটক নিয়ে আসতো। তখন নিজেদের নাটক কম ছিলো। তবে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সারাক্ষণ সাহিত্য, নাটক এবং গানবাজনা নিয়ে মেতে থাকতো। ছাত্রদের মধ্যে একটা পারম্পরিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। নতুনরা এলে সাংস্কৃতিক চর্চার আগের ধারা চলমান রাখতেন।

ঢাকায় একটা মিশ্র সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ ছিলো। আমরা যদি এরকম বহুত্ব ধারার সাংস্কৃতিক চর্চায় ফেরত যেতে চাই তাহলে আমাদের করণীয় কী হবে?

এজন্য বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে হবে। একজন যাতে অন্যের ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, বুঝতে পারে এবং একসঙ্গে একটি সমাজে মিলেমিশে বাস করতে পারে সেরকম পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

আপনার পরিবারে সংগীতের একটা সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে। আপনি নিজেও একজন গুণী শিল্পী। ধ্রুপদী সংগীতের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা কীভাবে গড়ে উঠলো?

আমার মামাবাড়িতে গানের খুব চল ছিলো। মামা খুব ভালো গাইতেন। বাইরে গাইতেন না। বাবা সংগীত ভালোবাসতেন, বিশেষ করে নজরুল গীতি। তখনকার দিনে সবার বাড়িতে গান শোনার যন্ত্র থাকতো না। যাদের ছিলো তাদের বাড়িতে গিয়ে সবাই গান শুনতো। আর গাইয়ে কেউ যদি বাড়িতে আসতো তাকে বলা হতো, এই গুনগুন করে একটু গান শুনিয়ে যাও না। গান আমাদের ঘিরে থাকতো। বলতে গেলে জন্ম থেকেই গান শুনছি, শিখছি। ছোটোবেলায় মায়ের কাছে, মামার কাছে অল্প অল্প শিখেছি। তবে সত্যিকার অর্থে গুরুজীর কাছে শিখেছি শান্তিনিকেতনে, ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে। এখানেই আমার গানের শুরু। তারপর দিল্লীতে গিয়েও শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে থাকি। এভাবে অর্থনীতির চেয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতই জীবনের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিলো। এমনও হয়েছে টানা আট সপ্তাহ দৈনিক আট ঘন্টা করে রেওয়াজ করেছি। তখন গানই ছিলো ধ্যান জ্ঞান। আমার বাপের বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি দুটোই অত্যন্ত সহনশীল এবং প্রগতিশীল হওয়ায় কখনও বাধা আসেনি। তবে সংগীত এবং অর্থনীতি এ দুয়ের চর্চা করতে গিয়ে দুয়ের মধ্যে সম্পর্কও খুঁজে পেয়েছি। শাস্ত্রীয় সংগীতের ঘরানার ধারণার পেছনে যে অর্থনীতি আছে সেগুলো নিয়েও কাজ করেছি।

শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে অর্থনীতির যোগ কী রকম?

ধরো, আমি একটা ছবি আঁকলাম। সেটার স্বত্ত্ব আমার। যদি বিক্রি করে দেই তাহলে স্বত্ত্বটা চলে যাবে অন্যের কাছে। আমার আঁকার ধরণ একদমই আমার নিজস্ব। প্রতিটি তুলির আচড় বা রঙের মিশ্রণ সবার থেকে ভিন্ন। সংগীতের ক্ষেত্রেও একই রকমভাবে ভিন্ন ভিন্ন গায়কী থাকে। একে বলে ঘরানা। প্রত্যেক ঘরানার শিল্পীরা একটি নির্দিষ্ট অঙ্গে বন্দিশগুলোর চর্চা করেন। তাতে বন্দিশগুলোও ঘরানাভেদে নিজস্ব হয়ে যায়। কতগুলো বন্দিশ আছে একদমই নিজেদের। পারম্পরিকভাবে এসেছে, আমরা লিখে রেখেছি। যেমন আমাদের রামপুর ঘরানার গঠন আগ্রা ঘরানার বন্দিশের গঠন থেকে একদমই ভিন্ন হবে। এরকম প্রত্যেক ঘরানার একেকটা নিজস্ব শৈলি আছে। এই শৈলির সত্ত্ব রক্ষা করার জন্যই ঘরানার ধারণা চলমান আছে। অনেক ওস্তাদের কাছে এমন গল্পও শুনেছি যে, ভিন্ন ঘরানার কেউ এসে বন্দিশ চাইলে ‘স্থায়ী’ ঠিক রেখে ‘অন্তরা’ বদলে দিত। ঘরানার এ বিশুদ্ধতা রক্ষা করার পেছনের কারণ একেবারেই অর্থনৈতিক।

লেখালেখির প্রসঙ্গে আসি। পৃথিবীর পথে হেঁটে বইটি কেন লিখলেন? স্মৃতির তাড়ণায়?

স্মৃতির তাড়ণা বলবো না। একটা সময় আসে যখন স্মৃতিটা বেশ বড় হয়ে যায়। মোহাম্মদ শামসুর রহমান নামে আমার এক ভাইজান ছিলেন, ঢাকাতে। তাঁর বাবা ১৯২৯ সালে আমার বাবার ছাত্র ছিলেন এবং আমার বাবার খুব ভক্ত ছিলেন। ২০০২ সালে আমি একবার দেশে এসেছিলাম। তিনি সংবাদ পেয়ে তার ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন আমাকে নিয়ে যেতে। বাবা সেই অল্প বয়সে কীভাবে পড়াতেন সেসব গল্প তিনিই আমাকে বলেছিলেন এবং লিখতে বলেছিলেন। সেটা একটা বড় অনুপ্রেরণা আমার কাছে। আরেকটা কারণে স্মৃতিটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। বাবার সব লেখা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের জন্য সম্পাদনা করেছি। তখন ওরা বলেছিল বাবার একটা জীবনী লিখতে। সেটা লিখতে গিয়েই আমার ঢাকা সম্পর্কে কিছু জানতে হলো। তাও বইটি লেখা হতো না। ভাইজান (মোহাম্মদ শামসুর রহমান) আমাকে বললেন যে আমি তো ঢাকার কথা এত বলি এটা নিয়ে যেন লিখি।

তখন হিন্দু এবং মুসলিম সমাজের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক থাকতো। ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে কোনো ভেদাভেদ ছিলো না। বাবার সব ছাত্রকেই নির্দ্বিধায় দাদা ডাকতাম। কাজে কর্মেও কোনো বিভেদ ছিলো না। সামাজিকভাবেও বিদ্বেষ ছিলো না। যদিও একে অন্যের ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছু জানতো না। খুব দুর্ভাগ্যের কথা হলেও একজন অন্য ধর্মের লোকজনের জীবন যাপন সম্পর্কে কিছুই জানতো না। ভাইজান বললেন যে এসব তো আমরা বিশেষ জানি না, আপনার স্মৃতি থেকে আপনি লেখেন। কারণ, নয় বছর বয়সে চলে গেলেও আমার ঢাকার কথা, বাড়ির কথা (৫ নম্বর পুরানা পল্টন) বেশ মনে আছে। সেরকম স্মৃতি থেকেই লিখেছিলাম। কালি ও কলম ছেপেছিলো সেই লেখা। পরে মুনতাসির মামুন খুব পছন্দ করেন লেখাটি। তারপর হাসনাত ভাইয়ের (কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত) সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে লেখা শুরু হলো। উনি না থাকলে লেখা শেষই হতো না। তাছাড়া, আগে কখনও বাংলায় লিখিনি তো। তাই আত্মবিশ্বাস ছিলো না। হাসনাত ভাই পুরোটা সময় সাহস দিয়েছেন, লিখতে বলেছেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমি আসলে নিজের তাড়নায় লিখেছি। আমার শেকড় চিরকাল ঢাকায়। আমার ভাইয়ের শেকড় অন্য জায়গায়। কারণ ও মাত্র চার বছর বয়সে ঢাকা ছাড়ে। অবশ্য আমি অন্যকোথাও বেশিদিন থাকিনি। অনেক জায়গায় থেকেছি, অনেক কিছু দেখেছি, শিখেছি। কিন্তু ঢাকার স্মৃতি কখনওই মুছে যায়নি। ২০০২ এ বাংলাদেশে এসে আমার গ্রাম গৈলা গিয়ে বুঝতে পারে ওটা আমার কত আপন। এর অন্য কারণও আছে। তা হলো, ঢাকা বা পূর্ব বাংলার মানুষ অন্যকে আপন করে নিতে জানে। এমনটা আমি অন্য কোথাও দেখিনি। এইযে একজনকে কাছে টেনে নিতে পারার ক্ষমতা বাংলাদেশ ছাড়া আর কারও নেই। ঢাকায় এলেই সবাই খুব আপন করে নিয়েছে। এতেই আমার শেকড়হীন ভাবটা কেটে গিয়েছে এবং লিখতে ইচ্ছে করেছে। বইটি ঠিক আমার আত্মজীবনী নয়, আমার সময়কার একটা সমাজচিত্র। তখনকার প্রচলিত কিছু ছড়া কবিতা যেগুলো এখন আর শোনা যায় না। আবার কিছু পূজা অর্চনা হতো সেগুলোও এখন আর হয় না। এসবই লিখতে আমার ভালো লেগেছে। কারণ ওগুলো লেখা নেই কোথাও। কেউ না লিখে রাখলে একদম হারিয়ে যাবে। এটা দেশ বিভাগ বা রাজনীতি নিয়ে লেখা বইও না। দেশ বিভাগের জন্য মানুষের জীবনে কী কী পরিবর্তন এসেছে সেটাই বরং ধরতে চেয়েছি এ বইয়ে। ঢাকার জীবনে একটা লালিত্য ছিলো। এই লালিত্য বা ‘আপনাপান’ আর কোথাও পাইনি। আজকে যেমন হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান বলে আলাদা আলাদা পরিচয় করতে শুনি। এটা আমি এখনও বরদাস্ত করতে পারি না। কারণ আমি সেভাবে বড় হইনি। হিন্দু সমাজেই বড় হয়েছি, কারণ আসেপাশে অন্য সমাজ ছিলো না। ধর্মটা আমাদের সময় ছিলো একদমই পারিবারিক ব্যাপার। তাই বলে বাইরে গিয়ে ধর্মীয় পরিচয় বড় করে দেখানোর চল ছিলো না। ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা গণ্ডগোল হয়। চারিদিক থেকে চেয়ার ছোড়াছুড়ি হচ্ছে; তার মাঝখানে পড়ে গেছি আমি। তখন বাবার কিছু ছাত্র সত্যব্রত বোস, মোজাম্মেল হক, এনামুল কবির এবং অন্যান্যরা মিলে আমাকে একজন আরেকজনের কাছে ছুড়ে দিয়ে আমাকে ওখান থেকে বের করে আনেন। তো এতদিন পরে এসেও যখন ওনাদের কথা মনে করি তখন কে হক কে বসু এসব তো মনে আসে না। কিন্তু আজকালকার দিনে অনেকে সেটা মাথায় নেন। এই পার্থক্যটা আমি ধরতে চেয়েছি। আবার তৎকালীন বিধবাদের প্রতি তৎকালীন হিন্দু সমাজের যে বৈষম্যমূলক আচরণ ছিলো সেই পুরুষতান্ত্রিক আচরণও তারা মেনে নিয়েছিলো। একদম পরনির্ভর জীবন যাপন করতেন তারা। এগুলোও লিখেছি বইয়ের মধ্যে।

বইটির এপিগ্রাফে জীবননান্দ দাশের একটি কবিতা উদ্ধৃত করেছেন আপনি। তিনি কি আপনার প্রিয় কবি?

ভীষণ প্রিয়। বাংলা আমার কাছে সবসময় রূপসী। তাই রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতাটা তুলে নিয়েছি। তাছাড়া জীবনানন্দের কবিতা পড়লেই বাংলার এই রূপের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁর কবিতা পড়ি। রূপসী বাংলা পড়লে বিশেষ করে গৈলার ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে।

ফিরতে ইচ্ছে করে?

সবসময় ইচ্ছে করে। তবে সেটা আর সম্ভব না। আমাদের সবার মনে চাপা দুঃখই এটা। যারা ছেড়ে গিয়েছেন বা থেকে গিয়েছেন তাদের আসা যাওয়ার পথটা এখন আর সোজা নয়।

পাঠকের কাছে আপনার প্রত্যাশা কতখানি?

প্রত্যাশার কথা বলাটা মুশকিল। কারণ আমি তো লেখিকার মতো বইটি লিখিনি। লেখকের প্রত্যাশা থাকে। আমার সেরকম কোনো অভিপ্রায়ও ছিলো না। শেষ পর্যন্ত বইটি আমি নিজের জন্য লিখেছি। আমার নিজের শেকড়হীনতার শেকলটা ছাড়াবার জন্যই লিখেছি। কাজেই আমার কোনরকম প্রত্যাশাই ছিলো না। তবে পাঠকের উদ্দেশ্যে বলব, অল্প যে ক’জনেই পড়ুকনা কেন, তারা যেন ভালো করে পড়ে। কারণ বইয়ের মধ্যে অনেক খুটিনাটি কথা আছে। বইটি লিখে শেষপর্যন্ত আমার যে শেকড়হীন ভাবটা ছিলো তা কেটে গেছে। এজন্যে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এবং হাসনাত ভাইয়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

 

ছবি: আফজালুর রহমান