বিশ্বসাহিত্যের মিলনমেলায়

বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের ভেতরে তিলধারণের ঠাঁই নেই। বাড়তি দর্শকদের কথা বিবেচনা করে বর্ধমান হাউসের সামনে আলাদা করে বসানো হয়েছে প্রজেক্টর। সেখানেও বসবার জো নেই। গায়ে গা ঠেলে সবাই দাঁড়িয়ে আছে ভি এস নাইপলকে দেখার জন্য, কী বলবেন সেটা শোনার জন্য। এবারের ঢাকা লিট ফেস্টের মূল আকর্ষণই ছিলেন ভি এস নাইপল। টানা ষষ্ঠবারের মতো আয়োজিত এ উৎসবে এবারই প্রথম কোনো নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের দেখা পেল সবাই।
প্রথমে হে ফেস্টিভ্যাল নামে শুরু করলেও গত বছর থেকে ঢাকা লিটফেস্ট নামেই হচ্ছে দক্ষিণ এশীয় সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসবটি। আকারে আয়োজনে যা প্রতিটি ছাড়িয়ে গেছে আগেরটিকে। এবারও অবশ্য উৎসবের ব্যাপ্তি ছিল তিন দিনের। ১৭ নভেম্বর শুরু হয়ে উৎসবটি শেষ হয়েছে ১৯ তারিখে। এর মধ্যে ঘটে গেছে ৯০টি সেশন। বিষয়-বৈচিত্র্যে এসবের বিস্তৃতিও ছিল ব্যাপক।
সাহিত্যের এই উৎসবে এবার অংশ নিয়েছেন ১৮টি দেশের সাহিত্যিক, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক। আলোচকদের মধ্যে দেড় শতাধিক বাংলাদেশির পাশাপাশি ছিলেন ৬৬ জন বিদেশি অতিথি। প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্য তথা গোটা বিশ্বের সাহিত্যচর্চা জোরদারে বহুমুখী সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিনিময়ের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার অভিন্ন লক্ষ্যে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির লোকেরা তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে সমবেত হয়েছে হাজারো তরুণ। বিভিন্ন আলোচনায় যেমন উঠে এসেছে আমেরিকার নির্বাচন, তেমনি উঠে এসেছে আধুনিক সাহিত্যে নারীর উপস্থাপন। দেশি-বিদেশি লেখক-গবেষকেরা এক মঞ্চে আলোচনা লিপ্ত হয়েছেন সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও। ভিন্ন ভিন্ন মতের এক অভূতপূর্ব সম্মিলন ছিল ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৬।
এবারের সাহিত্য উৎসব উদ্বোধন করেন ভি এস নাইপল নিজে। সঙ্গে ছিলেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এবং ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায ও আহসান আকবর।
মোট সাতটি আলাদা মঞ্চে ভাগ করা হয়েছিল একাডেমি প্রাঙ্গণ। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন ছাড়াও আরও ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন মঞ্চে যুগপৎভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন আলোচনা। ভিন্ন ভিন্ন মঞ্চের পাশাপাশি ছিল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বইয়ের স্টল। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনার পাশাপাশি ছিল বুক ওয়ার্মের মতো প্রকাশনার স্টলও।
উৎসবের তিন দিনেই মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে বেশ কিছু বইয়ের এবং সেই সঙ্গে আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে। সদ্য প্রকাশিত বইয়ের আলোচনাতেও মুখর ছিল উৎসব প্রাঙ্গণ। তারই সম্পূরক হিসেবে সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল প্রতিটি দিনই। উৎসবকে পূর্ণতা দিতে ‘বেহুলার লাচারি’র মতো আয়োজনও ছিল। তা ছাড়া প্রতিদিনই প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র। তেমনি একটা চলচ্চিত্র ব্লকেড। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে রুখে দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানি রণতরী, তারই আখ্যান এই প্রামাণ্যচিত্র।
এই সম্মেলন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে- এমন প্রত্যাশাও ছিল আয়োজকদের। তাই সাহিত্যিকদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগাভাগি করেছেন বিজ্ঞানী এমনকি রাজনীতিবিদও। বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনার সেশন তো ছিলই, তার সঙ্গে বেশ কিছু আলোচনায় উঠে এসেছে সমকালীন বিশ্বরাজনীতির হালহকিকতও।
তিন দিনের এই সাহিত্য উৎসবের দরজা খোলা ছিল সবার জন্য। ঢাকা লিট ফেস্টের ওয়েবসাইট বা বাংলা একাডেমির বাইরে নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশ নিতে পেরেছেন সবাই। তাই প্রতিদিনই সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের পদভারে মুখর ছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ।
উদ্বোধনীতে উৎসবের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ যেমনটি বলছিলেন, ‘ভাষার ভিন্নতা আজ আর প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং সেতুবন্ধন।’ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের মিলনমেলা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পাবে ঢাকা লিট ফেস্ট- এমনটাই আশা আয়োজকসহ অংশগ্রহণকারী সবার।