বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের স্থাপত্যধারা

আমাদের দেশের জল-হাওয়া-মাটির সাথে পরিচয় না থাকলে খুব সহজেই বলে দেয়া যায় বাংলাদেশের স্থাপত্য বড় বেশী ছাড়া ছাড়া। বিচ্ছিন্ন ঘর বাড়ি একাকী দাড়িয়ে; সবে মিলে কোন পরিসরের আবহ দেয় না, তৈরি করে না সকলের জন্য বহিরাঙ্গন। কিন্তু একটু চিন্তা করলে, এই ভূ-প্রকৃতির গঠন, আলো-বাতাসের চলাচল, মানুষের জীবন যাত্রার ধরণ কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় এই অঞ্চলের জন্য এর চেয়ে সহজ স্বাভাবিক আর কিছু হতে পারে না। আমাদের জলবায়ু, আমাদের নির্মাণ সামগ্রী, আমাদের বসবাসের অভ্যাস সবকিছুর সরল বহিঃপ্রকাশ এই স্থাপত্যধারা। এটাই বাংলাদেশের স্থাপত্য।

এটা যেমন সত্য যে এই বোধ এক দিনে আসেনি। অনেকদিনের ব্যবহার আর অনুশীলনের ফলে এখন আমরা জোর গলায় বলতে পারি এটা আমাদের। চিত্রকলা বা সাহিত্যে আমাদের যে অবস্থান, স্থাপত্যে অগ্রগতি ততটা না হলেও আমাদের স্থপতিদের অর্জনও সামান্য নয়। শহর-নগর, বন্দর, গ্রাম, পাড়া-মহল্লা, ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, নানান পরিসরে নানান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বলয়ে তাঁদের কাজের বিস্তার। ছোট্ট দেশ। কিন্তু কাজ তো কম নয়। স্থপতি মাজহারুল ইসলামের মতে, “সমগ্র দেশ নিয়ে কাজ করতে হবে। পুরো দেশটাকে ঢেলে সাজাতে হবে।”  বাংলাদেশের সমকালীন স্থাপত্য দেখলে আস্থা জাগে, সেই মহাপরিকল্পনার অংশ হয়েই যেন কাজ করে চলেছেন সবাই। একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে অলিগলি, রাজপথ, প্রান্তর।

বন্যা আছে, খরা আছে; ঝড়ো হাওয়া, জলোচ্ছ্বাস, দারিদ্র্য আছে। সেই সঙ্গে আছে সবকিছু মোকাবেলা করার ক্ষমতা আর ঘুরে দাড়াবার শক্তি। উন্নয়ন গবেষকের ভাষায় একে বলে অভিযোজন; অভিযোজিত হবার এই ক্ষমতা আমাদের প্রচণ্ড। সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি তাই আমাদের দিকে। আমাদের থেকেও যে শেখার আছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এই কৌতূহল আর আমাদের স্থপতিদের প্রতিনিয়ত নিজেদের অতিক্রম করার প্রবল ইচ্ছা থেকেই যাত্রা শুরু করলো ‘বেঙ্গল স্ট্রিম’।

বেঙ্গল স্ট্রিম, বাংলাদেশের স্থাপত্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার প্রয়াস। সুইজারল্যান্ডের বাজেল শহরে অবস্থিত সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়াম এবং বেঙ্গল ইনষ্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শনগুলো নিয়ে শুরু হয়েছে এই প্রদর্শনী। যা ১ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের ৬ মে পর্যন্ত, পাঁচ মাসব্যাপী ইউরোপের বিভিন্ন শহরে চলবে।

স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর নকশা করা ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার।

বেঙ্গল ইনষ্টিটিউটের মহাপরিচালক প্রফেসর কাজী খালেদ আশরাফ বলেন, ‘প্রদর্শনীটির মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের সমকালীন স্থাপত্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা; এর গুরুত্ব নিজেরা অনুধাবন করা এবং অন্যদের ও জানানো যে, আমাদের স্থাপত্যচর্চা আজ এমন একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে একে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি এবং পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় আমাদের কাজ নিয়ে কথা বলতে পারি।”

বেঙ্গল ইনষ্টিটিউট কীভাবে জড়িত হলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইনষ্টিটিউটের কাজকর্ম নিয়ে জানতে হয়। বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের একটি ইনষ্টিটিউট করার পরিকল্পনা চলছিল। বিশেষ করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্থপতি এবং দেশে কর্মরত স্থপতিদের মাঝে একটা আক্ষেপ এমন একটি প্লাটফর্মের যেখানে আনাগোনা হবে স্থাপত্যর নানান শাখায় পারদর্শী ছাড়াও নানান পেশার মানুষ। নতুন নতুন ধারণার পারস্পারিক আদান প্রদানে বেরিয়ে আসবে জটিল সমস্যার যুগোপযোগী সহজ সমাধান। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে একদল গবেষক। কেউ স্থপতি, কেউ পরিকল্পনাবিদ, কেউ ভূগোলবিদ কিন্তু লক্ষ্য সবার এক। দেশের অগ্রগতির ধারক ও বাহক হিসেবে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। ইতিমধ্যে এই দল তাঁদের কাজ নিয়ে ‘আগামীর ঢাকা’ এবং ‘আগামীর সিলেট’ নামে দুটি প্রদর্শনী নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়েছিল। এর ফলে দারুণ সাড়া পড়েছিলো সবার মাঝে। আগামীতে অন্যান্য শহরের নাগরিক সমস্যা, যোগাযোগ, পরিবেশ আরও নানামুখী কাজ নিয়ে এধরণের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ইনষ্টিটিউটের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের তো ভীষণ আশাবাদী। নদীকেন্দ্রিক পরিকল্পনার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের স্থপতিগণ বিদেশি স্থপতিদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। প্রত্যন্ত চর অঞ্চল থেকে শুরু করে ছোট শহর ও বৃহত্তর নগরগুলোর বহুতল ভবন সর্বত্র তাদের সরব উপস্থিতি। নানান ধরণের ভবন, নানান শ্রেণির মানুষের অস্তিত্ব ও অধিকারের প্রতিভূ। এই সময়ের নগর এমনই হওয়া উচিত।’

স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুমের নকশায় বাইতুর রউফ মসজিদ।

এদেশের স্থপতিদের কাজ নিবিড়ভাবে বোঝা এবং আন্তর্জাতিক মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য প্রায় পাঁচ বছর ধরে অসংখ্যবার ছুটে এসেছেন প্রদর্শনীর প্রধান কিউরেটর ও সমন্বয়কারী সুইস আর্কিটেক্ট নিকোলাস গ্রাবার। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন- বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির মতোই বৈচিত্রপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখতে এবং ডকুমেন্ট করতে। তার মতে বাংলাদেশের স্থাপত্যর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বিদ্যমান পরিবেশের সাথে এর প্রাসঙ্গিকতা যা অন্যন্য দেশের স্থাপত্য থেকে একে আলাদা করে তুলেছে। তাছাড়া একজন স্থপতি তার কাজের মধ্য দিয়ে কীভাবে সমাজে অবদান রাখতে পারে তার নমুনা আছে বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পে। তিনি বহির্বিশ্বের সামনে এ দেশের স্থাপত্যর গুনমান তুলে ধরতে চান যাতে বেঙ্গল স্ট্রিম হয়ে উঠে একটি ‘নলেজ শেয়ারিং’ এর জায়গা। তাছাড়া বাংলাদেশে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা যা প্রাচীন কাল থেকেই সমৃদ্ধ। অতীতের ঐতিহাসিক স্থাপত্যিক নিদর্শনগুলোর সাথে সমসাময়িক স্থাপত্যের সেতুবন্ধন তৈরি করাও এই প্রদর্শনীর অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই ভীষণ যত্ন নিয়ে সেই সব স্থাপনার গল্পই বলা হয়েছে যারা প্রতিনিধিত্ব করবে পুরো দেশ, দেশের ঐতিহ্য।

বাংলাদেশের ৩০ জন স্থপতির কাজ নিয়ে এ প্রদর্শনী। অংশগ্রহণকারী ৩০ জন স্থপতির মধ্যে আছেন বশিরুল হক, শামসুল ওয়ারেস, নাহাস আহমেদ খলিল, সাইফ উল হক, জালাল আহমেদ, রফিক আজম, এহসান খান, সালাউদ্দিন আহমেদ, মেরিনা তাবাশ্যুম, কাশেফ মাহবুব চৌধুরীসহ আরও অনেকে। বাংলাদেশের ৬০টি স্থাপত্যশিল্প প্রদর্শিত হচ্ছে এখানে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইউরোপের দর্শকেরা বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্প দেখতে পাবেন। সুইজারল্যান্ডের পর এ প্রদর্শনী হবে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ও ফ্রান্সের প্যারিসে। ২০১৯ সালে প্রদর্শনীটি আসবে ঢাকায়।

পাঁচ মাসব্যাপী এই প্রদর্শনীর পাশাপাশি থাকছে নানা কার্যক্রম। ২ ডিসেম্বর হয়ে গেল ‘হোয়েন দ্য যমুনা মিটস দ্য রাইন—লার্নিং ফ্রম রিসেন্ট আর্কিটেকচার ইন বাংলাদেশ’শীর্ষক একটি সভা।

আগামী বছরের ১৯ জানুয়ারি হবে গাইড ট্যুর ‘বেঙ্গল স্টাইল—ফ্রম ওল্ড টু নিউ’। ‘কিপ দ্যাট পেপার’ নামের একটি কর্মশালাও হবে সেদিন। ২৪ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে হবে আর্কিটেকচার ট্যুর।

আছে অনেকগুলো বক্তৃতাও। ১৫ ফেব্রুয়ারি স্থপতি মাযহারুল ইসলামকে নিয়ে কথা বলবেন স্থপতি নুরুর রহমান খান। ১৫ মার্চ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান বক্তব্য দেবেন ‘দ্য পুওর ক্যাননট অ্যাফোর্ড পুওর সলিউশনস’ নিয়ে। ১২ এপ্রিল স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির কথা বলবেন ‘কো-ক্রিয়েটিং স্পেস’বিষয়ে। এ ছাড়া মার্চে হবে বাংলাদেশের স্থাপত্যবিষয়ক চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী।

সুইজারল্যান্ডে প্রদর্শনী দেখেছে দর্শনার্থীরা।

প্রদর্শনীর উদাহরণ হিসেবে বলা যায় স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের কথা। নদীভাঙ্গন কবলিত মানুষজন নিয়ে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ের নকশা জিতে নিয়েছে ২০১৬ সালের আগাখান অ্যাওয়ার্ড। কীভাবে? মহাস্থানগড়ের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধারণার সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রকল্পের পরিবেশ আর প্রতিবেশের অপূর্ব সংযোগই পিছনে ফেলে দিয়েছে ৩৮৪টি আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট, দেশের জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে অকুণ্ঠ প্রশংসা, বিরল সম্মান।

আশ্চর্য হলেও সত্যি সেই একই বছর স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুমের বাইতুর রউফ মসজিদও পায় আগাখান অ্যাওয়ার্ড। সুলতানি স্থাপত্যের অনুপ্রেরণায় মাত্র ৭২০০ বর্গফুট জমির উপরে নির্মিত এই মসজিদ ইট আর কংক্রিটে গড়া। একই বছরে একই দেশ থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাওয়া এই দুটি পুরুস্কার প্রমাণ করে আমাদের স্থাপত্যর স্বকীয়তা ও বৈচিত্র্য।

একটা সময় ছিল যখন বিভিন্ন রকম গাছ-গাছড়া যেমন- ফলের গাছ, ঔষধি গাছ, তক্তা করার গাছ, শাক-সব্জি ঝোপের মত ঘিরে থাকত বসত বাড়িকে। মাঠঘাট প্রান্তর ছিল সীমাহীন। কিন্তু ধীরে ধীরে নগরায়নের প্রভাবে গাছপালা দেখতে হলে যেতে হয় বহুদূর। এই যাওয়াটাকে একটু সহজ ও আনন্দময় করতে, ছোটো বড় সবাইকে নিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে স্থপতি জারিনা হোসেনের শুকতারা ন্যাচারাল রিট্রিটের সৃষ্টি।

খন্দকার হাসিবুল কবিরের স্থাপত্যালয়ের নাম কো-ক্রিয়েসন। মানুষের সাথে মিলেমিশে, মানুষকে সাথে নিয়ে, মানুষের জন্য কাজ করেন তিনি। তাঁর আশার মাচা, দিনাজপুর ও ঝিনাইদহ শহর উন্নয়ন প্রকল্প, জল ও জঙ্গলের কাব্য দেশজ স্থাপত্যর অনিন্দ্য উপাখ্যান।

প্রদর্শনী উপলক্ষে চলছে বিভিন্ন দেশের স্থপতিদের মাঝে মতবিনিময়।

স্থপতি বশিরুল হকের বাসস্থান এবং স্টুডিও একে অন্যর সাথে অঙ্গ-অঙ্গাঙ্কিক ভাবে জড়িত। বাহির থেকে দেখলে একটি ভবনই মনে হয়; লাল ইটের সাথে সবুজের সমাহার আর অন্দরে-বাহিরে নানা আকারের সংযুক্ত পরিসরের খেলা।

ঢাকা শহর জলের শহর। ঢাকা শহর উদ্যানের শহর। কিন্তু এখন আর সেটা বোঝার উপায় নেই। নাগরিক জীবনের প্রয়োজনে হারিয়ে গেছে সবুজ, বুঁজে গিয়েছে জলাধার। ভিত্তি স্থপতিবৃন্দের হাতিরঝিল প্রকল্প সেই হারানো শহর ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়।

এরকম হাজারো নমুনা জুড়ে আছে গোটা দেশে। স্থাপত্যর মানেই সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একজন দু’জন স্থপতি নয়; একটা দল দাঁড়িয়ে গেছে যারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বাংলাদেশের স্থাপত্যর একান্ত একটি ধারা আছে। চর্চা করে দেশজ উপাদানের সংস্থানে দেশীয় স্থাপত্যশৈলীর। আস্থা রাখে একে অপরের কাজের প্রতি, বিশ্বাস করে, দেশকে সাংঘাতিক ভাবে ভালবেসেই সৃষ্টি করে এই সব স্থাপত্য। এই বিশ্বাস অনুরণিত হোক দেশে এবং দেশের বাইরে, বেঙ্গল স্ট্রিমের এই প্রদর্শনী হোক এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।