বেঙ্গল ইনস্টিটিউটে মধুর প্রেমতিলক

ছেলেবেলার মিশনারি স্কুলের লম্বা বারান্দা আর টালির ছাদ, অপরূপ কারুকার্যময় কলামের ছন্দোবদ্ধ সারি; এ সবই মনে হয় মনের কোণে স্বপ্ন বুনেছিল এই শ্রীলঙ্কার স্থপতি। আঁকাআঁকির ঝোঁক আর কৌতূহলী মন কিছুতেই গৎবাঁধা পড়াশোনায় বন্দি হতে চাইছিল না। ডাক্তার মায়ের ইচ্ছা- ছেলে ডাক্তার হোক, প্রতড়বতাত্ত্বিক বাবার ইচ্ছা ইঞ্জিনিয়ার। শেষমেশ বাবার স্থপতি বন্ধুদের দলেই যোগ দেবেন ঠিক হলো। লিখিত ভর্তি পরীক্ষার পর বলা হলো এমন কিছু একটা তৈরি করতে, যেটা প্রদর্শনীতে স্থান পায়। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরবাড়ি, গাড়ি-ঘোড়া বানাতে, মাধুরা বানালেন মোবাইল। ম্যাগাজিনে ছবি দেখে এতটাই ভালো লেগেছিল যে আস্ত একটা মোবাইলের মডেল জমা দিয়ে এলেন। সদ্য কলেজ পেরোনো তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে স্থাপত্য ও গোলকধাঁধার সমাধান ছিলেন মধুর প্রেমতিলক। মোরাতুওা ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যাচেলর শেষ করে তিনি চলে যান হেলসিঙ্কি। বহির্বিশ্বের সঙ্গে এই তার যোগাযোগের শুরু। একে একে কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হয় ফিনল্যান্ড, চীন, ওমান, মালদ্বীপ এবং নিজ দেশ শ্রীলঙ্কায়। দেশ-বিদেশের নামকরা ম্যাগাজিন; যেমন Phaidon Atlas of ontemporary Architecture, Beyond Bawa, Architecture Review, Architectural Design, A+U, Asian Design Destinations -এ স্থান করে নেয় তাঁর জাফফিনা কালচারাল সেন্টার (২০১০), কলম্বো টাউন হল (১৯৯৯) প্রজেক্টসমূহ।
বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রণে মে মাসের Landscape Forms & Formation সেশনে তিনি শোনান তাঁর কাজ, অনুপ্রেরণা আর স্থপতি হয়ে ওঠার গল্প। গত ১১ মে ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দেন। সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল অনুষ্ঠানটি। এই স্থপতির সঙ্গে আলাপচারিতার কিছু অংশ প্রকাশ হলো বেঙ্গল বারতার পাঠকদের জন্য।
আমরা যেভাবে, যে পরিবেশে বড় হই; আমাদের চিন্তায়-কাজে-কর্মে তার একটা প্রভাব থেকে যায়। আপনার ক্ষেত্রে এটা কতটুকু সত্যি?
শৈশব খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। এই সময়ের স্মৃতি সব সময় মস্তিষ্কের কোষে অনুরণিত হয়। প্রশ্নে উত্তর খুঁজে দেয় স্মৃতির গহ্বর থেকে। আমিও তাই করি। মিশনারি স্কুলের শৃঙ্খলার বন্ধন, আর বিরাট বেদিমূলের ওপর স্থাপিত প্রকাণ্ড ভবনের সুনিপুণ জ্যামিতিক বিন্যাস এখনো আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, আমার সব ডিজাইন জটিলতার সমাধান দেয়।
পড়াশোনা বা কাজের ক্ষেত্রে দেশের গণ্ডি পেরোনো কতটা জরুরি?
ভীষণ, নিজের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে আমরা স্বাবলম্বী হতে শিখি। চেনা মানুষ, চেনা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, গৎবাঁধা জীবনাচরণ থেকে বেরিয়ে এই পরিবর্তন আমাদের মানুষ চিনতে, সহজভাবে অন্যের ভাবনা গ্রহণ করতে এবং নিজেকে পরিশীলিত করতে শেখায়। যেকোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নানান বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি থেকে আসা বিভিন্ন রকম মানুষের নানা মত, নানা পথ দেখে দেখে পৃথিবী চিনতে সাহায্য করে। কোনো সন্দেহ নেই, এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে প্রিয় জায়গা শ্রীলঙ্কা। কিন্তু যখন আমি হেলসিঙ্কিতে পড়ি, কাজ শুরু করি পৃথিবীর নানা দেশে, আমি বুঝতে শিখি আমি যেভাবে সমস্যা দেখি বা চিন্তা করি, অন্যভাবেও করা যায়। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে বদলে যায় সমস্যার চালচিত্র। বদলে যায় সমাধান।
শুনেছি, আপনার একটা ডিজাইন মেনিফেস্টো আছে, যদি মেনিফেস্টো নিয়ে কিছু বলতেন?
আমার মনে হয় আমরা আমাদের প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বিল্ডিং নির্মাণ করে ফেলেছি। ধ্বংস করে ফেলেছি প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই আমি সব সময় চেষ্টা করি যত অল্প পরিসরে, ন্যূনতম আকারে বিল্ডিং ডিজাইন করতে। সংক্ষিপ্ত প্রোগ্রাম, সংক্ষিপ্ত নির্মাণ। এই আমার ভবিষ্যতের জন্য টেকসই নির্মাণ বিধিমালা।