বৈশাখের লোকশিল্প

একটা সময়ে গ্রামে গেলে দেখা যেত, নিজের বাড়ির দাওয়ায় বসে মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করছে কুমার, পাটি-কাঁথা বুনছে কোন গৃহবধূ কিংবা দা-কুড়াল তৈরি করছে কামার। সে সব আজ স্মৃতি হতে বসেছে। এখনকার লোকশিল্প তার স্বাধীন চেহারা বজায় রাখতে পারছে না বিশ্বায়ন আর আধুনিকতার চাপে । আবার পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের ধারক লোকশিল্পীরা। তবে যারা এখনো টিকে আছেন, বৈশাখ এলেই তাদের মধ্যে উৎসবের ভাব চলে আসে। কারণ বছরের এ সময়টাতেই তাদের ব্যস্ততা থাকে সবচেয়ে বেশি। বৈশাখ এলেই দেখা যায় টেপা পুতুল, মুখোশ, শোলা, বাঁশ, বেত আর পাটের তৈরি জিনিস, হাতপাখা, বাঁশি, শীতল পাটি, পটচিত্রসহ নানা জিনিসের সমারোহ।

বৈশাখের নাগরিক উদ্যাপনে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মুখোশের ব্যবহার। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, চৈত্র সংক্রান্তিতে সংয়ের নাচ ইত্যাদি উৎসবের মূল জিনিসই হলো এই মুখোশ। ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশের ব্যবহার প্রথম দেখা যায় ১৯৮৯ সালে। লোকজ ঐতিহ্য থেকে নেওয়া রূপকথার দেও-দানো থেকে শুরু করে আমাদের গর্ব বাঘের প্রতিকৃতিও ঠাঁই পায় এই শোভাযাত্রায়। অনেক বাড়িতে এসব মুখোশ ঘরের শোভা বর্ধনের কাজেও আসছে। আল্পনাও বৈশাখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আল্পনা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত আলিম্পন থেকে, যার অর্থ প্রলেপ দেওয়া। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রাগৈতিহাসিক কালে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে অস্ট্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল তারই ফল এই আল্পনা। ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র এই চিত্রের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেলেও বাংলার আল্পনার সমকক্ষ আর কোনটিই নয়। বিষয় বৈচিত্র্য ও অঙ্কন পারদর্শিতাই এর অন্যতম কারণ। সাধারণত চালের গুঁড়োর পিটুলিকে ঘন করে তাতে কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে নিয়ে হাতের অনামিকা আঙুল দিয়ে পুরু রেখায় দ্বিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যে এসব আল্পনা আঁকা হয়। আল্পনার রঙ সাদা হলেও বেলপাতা চূর্ণ করে সবুজ রং, কয়লাগুঁড়ো দিয়ে কালো, ইটের গুঁড়ো দিয়ে লাল, হলদি থেকে হলুদ রং নিয়ে আঁকা হয়। আল্পনা আঁকার উদ্দেশ্য দুইটি- কামনা আর নান্দনিকতা। নান্দনিকতার আল্পনাকে শহুরে মানুষেরা আপন করে নিয়েছে সামাজিক উৎসবের উপাদান হিসেবে। আবার মঙ্গল কামনাকেও বাদ দেয়নি। সে কারণেই পহেলা বৈশাখের উৎসবে এত বর্ণিল আল্পনা থাকে রাজপথ আর দেয়ালজুড়ে। তবে রং হিসেবে বাজারে কিনতে পাওয়া কৃত্রিম রঙই ব্যবহার করা হয়।

বৈশাখের অন্যতম উপাদান মাটির তৈরি জিনিসপত্র। মাটির তৈরি চিত্রিত ঘট, সরা, হাঁড়ি, পুতুল, খেলনা বৈশাখের অন্যতম উপাদানে পরিণত হয়েছে। ঘট বা কলস এমনিতেই পানি রাখার পাত্র হিসেবে ব্যবহার হয় আমাদের গ্রামীণ সমাজে সেই আদিকাল থেকে। আবার কুমোর সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে এর আবার ধর্মীয় উপযোগিতাও রয়েছে। বলা হয়, শিবের বিয়েতে একটি জলের ঘটের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তখন কেউই সেটা তৈরি করতে জানত না। শিব তার রুদ্রাক্ষের মালা থেকে দু’টি রুদ্রাক্ষ খুলে নিয়ে একটি থেকে সৃষ্টি করেন নর, আরেকটি থেকে নারী। এরাই কুমোর সম্প্রদায়ের পিতা-মাতা। সে কারণেই ঘট তৈরি কুমোরদের কাছে অনেক পবিত্র কাজ। আর সে কারণেই যে কোন পূজা বা লোকজ উৎসবে চিত্রিত ঘটের দেখা মেলে। দ্বারঘট, মঙ্গলঘট, দেবীঘট, ইতুঘট, শীতলাঘট, লক্ষীঘট, কার্তিকঘট, বারাঘট, নাগঘট, মনসাঘট উল্লেখযোগ্য।

তালপাতা দিয়ে তৈরি হাতপাখা

পোড়ামাটির পাত্রে নকশা বা চিত্র উৎকীর্ণ করবার সেই প্রাচীন রীতি আজও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এখন মূলত উৎসব বা পূজা-অর্চনার সময়ে হাঁড়িতে অলঙ্করণ করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। মঙ্গল হাঁড়ি, জাগরণ হাঁড়ি, আইবুড়ো হাঁড়ি, ফুল হাঁড়ি, ঝরা হাঁড়ি, শখের হাঁড়ি, রঙের হাঁড়ি ইত্যাদি নামে বাংলাদেশের সর্বত্রই এ ধরনের হাঁড়ির চল রয়েছে। তবে রাজশাহীর শখের হাঁড়িই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সম্ভবত সব ধর্মের মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজনে তৈরি বলেই এসব হাঁড়িতে ধর্মনিরপেক্ষ নকশার আধিক্য দেখা যায়। রাজশাহী ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এলাকায়ও এ হাঁড়ির প্রচলন রয়েছে। হাঁড়ি চিত্রণের আবার বিভিন্ন রীতিও আছে। হলুদ রঙের উপর লাল রঙে মাছ, পাখি, পান ইত্যাদি এঁকে নীল রঙের নকশায় শেষ হওয়া এক ধরনের রীতিতে। আবার আরেক রীতিতে হাঁড়ির লাল জমিনকে তিনটি চওড়া হলুদ রেখায় ভাগ করে তাতে মাছ, পাখি, পদ্ম, চিরুনী ইত্যাদি আঁকা হয়। আবার আরেক রীতিতে সাদা জমিনকে লাল, সবুজ, হলুদ রঙের রেখায় বিভক্ত করে তাতে ঘোড়া, পাখি, মাছ, লতা-পাতা ইত্যাদি আঁকা হয়। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ধারণা করেন, এগুলো শুধু অলঙ্করণের জন্যই আঁকা হয় না- এর অন্য অর্থ রয়েছে। যেমন মাছ উর্বরতার প্রতীক, হাতি সম্পদের। এই হাঁড়ি কেবল গ্রামের উৎসব আর পূজা-অর্চনার শোভা বর্ধন করে না, এখন শহরের উৎসব আর ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে এই হাঁড়ি। তাই ঢাকার বৈশাখী উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ এই হাঁড়ি। চারুকলা প্রাঙ্গণে উৎসবের সাজ আর মেলায় তাই এই মৃৎশিল্পের কদর একটু বেশিই। মৃৎশিল্পের আরেকটি অনন্য উপাদান হলো সরা। ঢাকনাসরা, এয়োসরা, ফুলসরা, ধূপসরা, তেলনিসরা, মুচিসরা, ছাতুসরা, আমসরা, নিয়াসরা, লক্ষীসরাসহ অনেক রকমের সরা আছে এই ব-দ্বীপে।

মৃৎশিল্পের আরেকটি উপাদান রয়েছে, যা আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত একই রূপ নিয়ে বেশ দাপটের সঙ্গে টিকে আছে। সেটি হলো মাটির পুতুল আর খেলনা। এগুলো হাতের চাপে তৈরি। মাটিকে গোল করে তারপর চ্যাপ্টা করে, চোখা করে এবং টিপে রেখা কেটে এবং মাটির ক্ষুদ্র গোলক জুড়ে আকার দেয়া হয় হাতের চাপে। জীব-জন্তুর মধ্যে বেশি দেখা যায় হাতি আর ঘোড়া। এই পুতুলগুলো মূলত তৈরি হয় কুমোর পরিবারের মহিলাদের হাতে।

মাটির তৈরি পুতুল ছাড়াও আরো দুই ধরনের পুতুল পাওয়া যায় বৈশাখী মেলাগুলোতে। কিছু হয় কাঠের তৈরি আর কিছু হয় শোলার। মাটির পুতুলের মতো কাঠের পুতুলও তৈরি হয় মহিলাদের হাতেই। কদম, আমড়া, জিত্তল, শ্যাওড়া, ছাতিম, শিমুল ইত্যাদি গাছের নরম কাঠ মাপ মতো কেটে তাতে খোদাই করে তৈরি হয় এসব পুতুল। খোদাই করা পুতুলের দেহে দেশীয় প্রথায় তৈরি রঙ লাগানো হয়। তবে ইদানীং কৃত্রিম রঙের সহজলভ্যতায় প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার কমে গেছে অনেকাংশে।

গ্রামবাংলার পুতুল নাচের পুতুল এখনও কাঠ খোদাই করেই তৈরি হয়। তবে কাঠের পুতুলের দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই কাপড়ের তৈরি পুতুল দিয়েই খেলা দেখান। শোলার তৈরি পুতুলও বৈশাখী মেলাগুলোর আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে। মূলত বর্ষাকালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিল-বাওড়ের ধারে শোলা জন্মে। শোলার টোপর বা মুকুটও বেশ বিখ্যাত। শোলা দিয়ে বৈচিত্র্যময় টোপর, প্রতিমার অলঙ্কার, মালা, খেলনা তৈরি করে চলেছে তারা। মালাকারেরা কদমফুলও তৈরি করে মেলায় বিক্রি করেন। তৈরি হয় বিভিন্ন আকার ও ঢংয়ের ফুলের ঝাড়। টোপর, কদমফুল আর খেলনা ছাড়াও মালাকারেরা তৈরি করেন বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের মুখোশ। মালাকারেরা মেলায় নিয়ে আসেন শোলার পাখি, ফুল, পালকি, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি এমনকি তাজমহলও। শোলার হাতি, ময়ূর, টুপি, ফুল ইত্যাদি তৈরি করেন তারা চৈত্র সংক্রান্তির মেলা আর বৈশাখী মেলায়। এসব শিল্পকর্ম এক সময়ে গ্রাম্য শিশু-কিশোরদের কাছে খেলনা হিসেবে বেশ আকর্ষণ করলেও এখন তা আর আগের মতো টানে না। তবে শহুরে লোকেরা প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যকে ড্রইংরুমে ঠাঁই দেয় বেশ চড়া দামেই।

 

ছবি: আলী মোর্শেদ নোটন দীন মোহাম্মদ শিবলী