ভালো লাগা থেকেই গান করে যাচ্ছি

ছাত্রজীবন শেষ না হতেই শিক্ষক জীবনে পা দিয়েছেন। তরুণ শিল্পী সেমন্তী মঞ্জরীর শিখন এবং শিক্ষণ উভয়ই ছায়ানট ঘিরে। এমাসেই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার দ্বিতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম। তার সঙ্গীত যাত্রার গল্প শোনা যাক নিজের মুখেই

গানের অ্যালবাম

আমার প্রথম অ্যালবাম রাঙিয়ে দিয়ে যাও প্রকাশিত হয় তিন বছর আগে, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে। আর দ্বিতীয় অ্যালবাম দেখো রে চিত্তকমলে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে এ মাসেই (২৯ জুলাই)। যখন প্রথম অ্যালবাম বের হয় তখন কণ্ঠ কিছুটা কাঁচা ছিল। গত এক দেড় বছরে মনে হয়েছে এখন আরেকটি কাজ করা জরুরি। গায়কিতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে এর মধ্যে। তাছাড়া আমি ছায়ানটে শিক্ষকতা করছি প্রায় পাঁচ বছর ধরে। সে কারনেও গানের সঙ্গে বোঝাপড়া আগের থেকে ভালো হচ্ছে। দ্বিতীয় অ্যালবাম করতে গিয়ে নতুন আত্মোপলব্ধিও হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রেম পর্ব পূজা পর্ব থেকে বিচ্ছিন্নভাবে গান নির্বাচন না করে নিজের ভালো লাগে যে গানগুলো করতে সেগুলো নিয়েই এই অ্যালবাম।

পড়াশোনা

লন্ডনে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনিস্টারে ‘কালচারাল স্টাডিজ’ নিয়ে মাস্টার্স করছি। তবে স্নাতক শেষ করেছি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, অর্থনীতিতে। তবে ‘এ’ লেভেল পর্যন্ত পড়েছি সায়েন্স নিয়ে। আসলে গান নিয়ে কখনও পড়াশোনা করার ইচ্ছা ছিল না। বাবা মা চেয়েছিলেন আমি শান্তিনিকেতনে গিয়ে সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা করি। কিন্তু আমি চাইনি। তবে গান নিয়ে পড়াশোনা না করলেও শিখেছি। ছায়ানটে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছি আট বছর।

গান নিয়ে পরিকল্পনা

যতদিন পারব ছায়ানটে শিক্ষকতা করবো। এছাড়াও নিজের একটা স্কুল করার ইচ্ছা আছে। পড়াশোনা শেষ করে এসে সমমনা বন্ধুদের নিয়ে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা আছে। আমি একটু ভিন্ন ধারায় গান শেখাতে চাই। বাধাধরা একঘেয়ে নিয়ম ধরে গানের শিক্ষা না দিয়ে আমি কিছুটা ভিন্নভাবে গান শেখাতে চাই যেখানে সবাই মনের আনন্দে গান শিখতে পারবে। আর আমৃত্যু গান করে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাইরে তিন কবির গান (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন) নিয়েও কাজ করার ইচ্ছা আছে।

স্বরলিপির কানুন ভেঙে রবীন্দ্রসঙ্গীত

সত্যি বলতে, আমাদের ঘরানার কেউ এটাকে ভালোভাবে দেখে না। আমার কাছে শুনতে ভালো লাগলে সেটা ভালো। তবে মূল গানের সঙ্গে নতুন সুর বা কথা আরোপ করা ঠিক না। যেমন, অর্ণব, শাহানা বাজপেয়ী কিংবা ভারতের জয়তি চক্রবর্তীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে বেশ ভালো লাগে। যদিও তারা হুবহু স্বরলিপি অনুসরণ করেননি। একবার ‘রক উইথ রবীন্দ্রনাথ’ নামে একটা প্রকল্প দেখলাম। এরকম হলে আমরা যারা রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা করি তাদের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন। কারন শুনতেও ভালো লাগেনি। মোটকথা, শুনতে ভালো লাগলে আমার কিছুতেই আপত্তি নাই।

রবীন্দ্রসঙ্গীত ভবিষ্যতে

আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের গান স্বভাবতই সর্বসাধারণের জন্য না। এর একটা বাঁধা গণ্ডি আছে, নির্দিষ্ট শ্রোতাগোষ্ঠি আছে। কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে আমার শ্রোতাগোষ্ঠী সীমাবদ্ধ। যেমন, আমার গানেরও বেশ ক’জন অনুরাগী আছেন। আমার আগের সিডি যিনি কিনেছেন তিনি হয়ত এবারও কিনবেন। কিন্তু নতুন কেউ কিনবে কিনা আমি নিশ্চিত নই। আমার মনে হয় সবাই মিলে কিছু ‘ইন্টারেস্টিং’ কাজ করতে হবে এ বিষয়টা নিয়ে। নাহলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের খুব বেশি নতুন শ্রোতা তৈরি হবে না। আমার নতুন স্কুল করার যে পরিকল্পনা তারও অন্যতম কারণ হলো ‘ট্রেডিশনাল’ পদ্ধতিতে না শিখিয়ে কিছু মজার প্রক্রিয়ায় রবীন্দ্রসঙ্গীত করা যাতে নতুন প্রজন্ম আকৃষ্ট হয়। যদিও রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবেদন কখনওই হারাবার নয়। পশ্চিমা গান বা সংস্কৃতির প্রতি আমাদের অনেক ঝোঁক। তাই এসব থেকে নিজেদের স্বকিয়তা ধরে রাখতে হলে নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে ‘ইন্টারেস্টিং’ কাজ করতে হবে।

ছায়ানট শুদ্ধ সঙ্গীতের উৎসব করে আসছে ৭ বছর ধরে। কিন্তু খুব অল্প মানুষই এ সম্পর্কে জানে। আবার উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উৎসবে হাজার হাজার মানুষ গিয়ে শুনছে। এতে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এরকম আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের উচিৎ হবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্রোতাদের গণ্ডিটাকে আরো বিস্তৃত করা। আর কীভাবে করা যাবে তা আসলে সবার মিলে ভাবতে হবে।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাইরে

রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরেই আমার সবচেয় প্রিয় নজরুল সঙ্গীত। তিন কবির গানও খুব পছন্দ। আবার লোকগানের সঙ্গেও আমি খুব ঘনিষ্ঠতা বোধ করি। আমার বাবাও লোকসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। এর বাইরে শচীনদেব বর্মণের গান করি। ক্ল্যাসিকাল থেকে পুরোনো দিনের হিন্দি গান সবই শোনা হয়।

পছন্দের শিল্পী

মিতা হক। আমার গান শেখাও ওনার কাছে। ওনার কোলে বসেই আমি অনেকগুলো গান শিখে ফেলেছি। তিনি যতরকম গান করেন তার মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। বন্যা খালার (রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা) গান ভালো লাগে। অদিতি মহসিনের গানও খুব ভালো লাগে। ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে জয়তি চক্রবর্তী, শ্রীকান্ত আচার্য, মুহম্মদ রাফি, কিশোর কুমার, শচীনদেব বর্মণ এনাদের গান সারাক্ষণ শুনি। তরুণ শিল্পীদের মধ্যে ইমন চক্রবর্তীর গলাটা খুব ভালো লাগে। আমাদের দেশে অভীক দেব এর কণ্ঠ ভালো লাগে।

নতুন মাধ্যম, নতুন সুযোগ

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার একদিকে যেমন খারাপ দিক আছে তেমন ভালো দিকও আছে। এতে করে যেমন অ্যালবামের সিডি বিক্রি কমে যাচ্ছে। বড় বড় সিডির দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার নতুন এসব মাধ্যমের কল্যাণে বাজারটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আরও কম খরচে অনেক বেশি দর্শক-স্রোতার কাছে পৌছানো যায়। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের কারণে প্রচার প্রচারণা অনেক সহজ হয়ে যায়।

গান শেখা গল্প

বাবা-মা দুজনই গান করতেন। বাবা সোহরাব উদ্দীন উদিচী শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, শিল্পকলা অ্যাকাডেমীর সঙ্গীত ও নৃত্যকলা বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। আমার নিজেও বড় হয়েছেন সঙ্গীতপ্রিয় পরিবারে। নানা, মামা সবাই গান করতেন। বড় মামা খালেদ খান বিয়ে করেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হককে। তো আমাদের গোটা পরিবারেই সারাক্ষণ সাংগীতিক একটা আবহ বিরাজ করে। সঙ্গীতে আমার হতেখড়ি হয় বাবার কাছে। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতে আগ্রহ হয় বড় মামীকে (মিতা হক) দেখে। বাবা অবশ্য চাইতেন আমি লোকগান করি। ছোটবেলাতেই গান শুনে সবাই খুব আদর করত। আমার মায়ের ইচ্ছায় ভর্তি হই ছায়ানটে। প্রথম বছর শেষেই ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে যাই। আরেকটু বড় হওয়ার পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ পাই। আগে দর্শকের সামনে গাইতে ভয় লাগতো। ছায়ানটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর থেকে সেই ভয় কেটে গিয়ে ভালো লাগতে শুরু করলো। তখন থেকেই পারফর্মার হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হয়।

এখন শেখাতে গিয়ে নতুন করে অনেক কিছু শিখছি। আমি মূলত রবীন্দ্রনাথের ভাঙ্গা গান আর মূল গান শেখাই। এর জন্য নিজেরও অনেক রেওয়াজ করতে হয়, অনেক কিছু জানতে হয়। এভাবেই আসলে দিন দিন শিখে চলছি।

অনুপ্রেরণার উৎস

ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত যে পরিবেশে বড় হয়েছি সেই পরিবেশের কারণেই আসলে রবীন্দ্রনাথের গান ভালো লেগে গেছে। সেই ভালো লাগা থেকেই গান করে যাচ্ছি।