ভাষার গান

বাঙালি স্বভাবতই গীতল। তাই প্রতিবাদে কিংবা ভালোবাসায় তার কণ্ঠে উঠে আসে গান। সে গানে কখনও থাকে মিছিলের তীব্র স্লোগান কিংবা মুক্তির আহ্বান। মধ্যযুগের বাঙালি কবি আবদুল হাকিম থেকে ঔপনিবেশিক আমলের রামনিধি গুপ্তর কলমে তাই বারে বার এসেছে নিজ ভাষার প্রতি ভালোবাসার কথা। দেবভাষা সংস্কৃত আর ফার্সির মতো রাজচর্চিত ভাষার বন্দনার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে নিজ ভাষাকে নিয়ে গৌরব করার শিক্ষা বাঙালি নেয় ৫২ সালে, শহীদের রক্ত দিয়ে। দেবভাষা, রাজভাষার হুকুমবরদার না হয়ে তাই বাঙালির অস্তিত্ব হয়ে ওঠে তার ভাষার মতোই স্বতন্ত্র। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক পথচলার ভিত্তি গড়ে দেওয়া একুশও আমাদের দিয়েছে অসামান্য সব গান।

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ৩ মার্চে জিন্নাহর ভাষণের রাতেই আনিসুল হকের তীব্র ঝাঁঝালো বাক্যে রচিত হয় প্রথম ভাষার গান:

‘শোনেন হুজুর…

বাঘের জাত এই বাঙালেরা

জান দিতে ডরায় না তারা

তাদের দাবি বাংলা ভাষা

আদায় করে নেবেই।’

একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মধ্য দিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের পবিত্র রক্তে স্নাত হয়ে ভাষা সংগ্রামের, জাগরণের গানে বেগবান হয়ে ওঠে বাংলা গানের স্রোতস্বিনী। পরের দিন আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখলেন:

‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,

আমি কি ভুলিতে পারি।’

১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে আবদুল লতিফের সুরে কবিতা থেকে গান হয়ে ওঠে একুশের প্রথম সংগীত। গাজীউল হক লিখলেন প্রথম প্রভাত ফেরির গান:

‘ভুলবো না ভুলবো না…

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই

এই দাবিতে ধর্মঘট’

শহুরে শিক্ষিত গীতিকারদের পাশাপাশি গ্রামে-গঞ্জে অসংখ্য বাউল, কবিয়াল, জারিয়াল, বয়াতি, কীর্তনীয়া, বিচারগায়ক, গম্ভীরা শিল্পীদের কণ্ঠও উচ্চকিত হয়ে ওঠে অসংখ্য গানে। পাঞ্জু সাঁই, মোকসেদ আলী সাঁই, নিবারণ পণ্ডিত, ফণী বডুয়া, মোসলেম উদ্দিন, শফি বাঙালি, জসীমউদ্দীন প্রমুখের বেশ কিছু ভাষার গান স্মরণীয় হয়ে আছে। বাউল মহিন শাহ রচেন ‘মিষ্টি আমার মায়ের ভাষা/ শিখিয়াছি মার কোলে বসি/ কেমন মধুর কেমন খাসা’। বিচারশিল্পী আবদুল হালিম বয়াতি বেঁধেছিলেন ‘ভাষা-আন্দোলনের জারি’ যার মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ৫২ হয়ে পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলির দীর্ঘ ইতিহাসের বর্ণনা উঠে আসে।

সুনামগঞ্জের নওজোয়ান শাহ আবদুল করিম লিখলেন ‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখে/ সালাম বরকতের বুকে/ গুলি চালায় বেঈমানে/ বাঙালির বাংলা ভাষা এই যে তাদের মূল ভরসা/ এই আশায় বঞ্চিত হলে কি চলে’

৫৩-তেই বাগেরহাটের শামসুদ্দীন আহমদ লিখেছিলেন, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙালি,/ তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি।’

১৯৫৩ সালের পর থেকে বাংলা ভাষার সংগ্রাম ও বাঙালির ভাষাপ্রেম নিয়ে রচিত হয়েছে অযুত গান। যার কয়েকটি শিল্পগুণে মানুষের অন্তরে চিরস্থায়ী ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে…’ কিংবা আবদুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘শহীদ মুখের স্তব্ধ ভাষা, আজ অযুত মনের বুকের আশা’ সেসব অসামান্য সাহিত্যিক গুণ সম্পর্কিত গানেরই নিদর্শন।

বাংলা গানের ভাষা নির্মাণে গত ৫০-এর দশকে বাংলার আরেক অংশে যখন হেমাঙ্গ-সলিলের হাত ধরে গণসংগীত গর্জে উঠছে ঠিক সে সময়ই বাংলাদেশেই গানের এক নিজস্ব ভাষা গড়ে উঠতে শুরু করেছে যে গানে আছে নিজের কৃষ্টি আর বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির কথা। অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় যে অধিকারের কথা বলতে তবে তা কেবল কাস্তে-হাতুড়ির আর ধানের হিসেব বুঝে নিতে নয়, বরং নিজের মায়ের ভাষার অধিকার বুঝে নিতেও, তার প্রমাণ উপরের গানের চরণে লক্ষণীয়। মানুষের জীবন ও মননশীলতার বাস্তববোধ এবং উচ্চশিক্ষায় ভাষাকে যথার্থ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা ও প্রভাব নির্মাণের পথে ধীরে হলেও বাংলাদেশ চলতে শুরু করেছে। যে ভাষার জন্য রক্ত আর ঘামের নদী পেরিয়ে আসতে হয়েছে বাঙালিকে, এখন তা সমৃদ্ধ করে তোলাই মূল লড়াই। তাই কবিয়াল লোকমান ফকিরের মতোই বলতে হয়, ‘একুশে আসে জানাতে বিশ্বে ভাষার কতটা মূল্য/ ভাষার দাবিতে নেই কোনো জাতি বাঙালির সমতুল্য’।

 

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত