মঞ্চের সাম্প্রতিক চিত্র

আড়াই হাজার বছর পুরোনো এক গ্রিক প্রবচনকে উড্ডীন রেখেছে আমাদের মঞ্চনাটক; তা হলো একটি জাতিকে চেনা যায় তার মঞ্চের নাটক দিয়ে। এই প্রবচনের আজও কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। জীবিত মানুষ জীবিত মানুষের সামনে অভিনয় করে এবং দু-তিন ঘণ্টার জন্য সুখে-দুঃখে, আনন্দে একীভূত হয়, এর তুলনা অন্য কোনো প্রায়োগিক শিল্পমাধ্যমে পাওয়াটা সহজ নয়।

মঞ্চনাটক সভ্যতার সমবয়সী এবং অভিনয়শিল্পের সূতিকাগার। সিনেমা ও টেলিভিশন সে তুলনায় একেবারেই নবীন। চলচ্চিত্রশিল্পের বয়স ১২৫ বছরেরও কম। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে টেলিভিশন সম্প্রচার মোটা দাগে শুরু হয় আমেরিকায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে টেলিভিশন সম্প্রচারের উন্নতি ঘটে, তবে তা ছিল সাদা-কালো চলমান ছবির প্রদর্শনী। ২০০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে টেলিভিশনের সত্যিকার উদ্ভাবন হয়। চলচ্চিত্রের আগমনের পর সবাই ভাবল মঞ্চাভিনয়ের যুগ শেষ হতে চলল এবং একইভাবে টেলিভিশনের আগমনে বিশ্ববাসী মনে করল, মঞ্চনাটকের দ্বারে কেউ আর যাবে না। এসব ভবিষ্যদ্বাণী ও ভীতিকর উচ্চারণকে জয় করে বহু ঝড়ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে মঞ্চনাটক সমগ্র বিশ্বে সুস্থ দেহে আজও বেঁচে আছে। তা ছাড়া মঞ্চাভিনয়ের চ্যালেঞ্জই অন্য রকম, এখানে ভুলভ্রান্তি শোধরাবার কোনো উপায় নেই, যা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনয়ে রয়েছে। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের তুলনায় মঞ্চের কাছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম মানুষই যায়।

তবু বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশই মঞ্চনাটককে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। মঞ্চের ওপরে অভিনীত প্রয়োগ শিল্পকে অবলম্বন করে একটি দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, মনোজগৎ, অতীত ও ভবিষ্যৎকে আমরা অবলোকন করতে পারি। মঞ্চনাটক কেবল বিনোদন মাধ্যম নয়, এই প্রয়োগ শিল্পমাধ্যম গণশিক্ষারও বিদ্যালয়। যুগ যুগ ধরে মঞ্চ থেকে শিল্পিতভাবে দুঃশাসন, স্বৈরাচার এবং সব সামাজিক অন্যায়-অত্যাচার ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার উচ্চারণ ধ্বনিত হয়ে আসছে।

আড়াই হাজার বছর আগের গ্রিক সুবর্ণ যুগের নাট্যকার সফোক্লিস, এস্কিলাস, এরোস্টোফেনিস, ইউরিপিডিসসহ রোমান যুগের নাট্যকারসহ ষোড়শ শতকের বিশ্বের সেরা নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, মলিয়ের, হেনরিক ইবসেন, আন্তন চেকভ এবং পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সব নাট্যকারের রচনায় সমাজলগড়বতার কখনো অভাব হয়নি। সমাজ ও রাজনৈতিক বক্তব্য কখনো এসেছে ট্র্যাজেডির মাধ্যমে, কখনো বা এসেছে কমেডি অথবা ট্র্যাজি-কমেডির মাধ্যমে।

মঞ্চনাটক সব শিল্পের সমন্বিত রূপ যা অ্যারিস্টটলের ‘পেয়োটিকা’এবং ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্রে’বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত। মঞ্চনাটক বাচিক শিল্পের পাশাপাশি সঙ্গীত, নৃত্যকলা, মূকাভিনয়সহ সকল শিল্পকলাকে অঙ্গীভূত করেছে। পৃথিবীর সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে তাই মঞ্চনাটককে প্রাধান্য দিয়ে দেশের জাতীয় নাট্যশালা ও অপেরা হাউসগুলোকে সরকার এবং বিভিন্ন ফাউন্ডেশন বিরাট অঙ্কের অনুদান দিয়ে চলমান রাখে। অবশ্য, ইংল্যান্ডের ‘ওয়েস্ট এন্ডের’বাণিজ্যিক থিয়েটারগুলো এবং আমেরিকার ‘ব্রডওয়ে’র থিয়েটারে অনেক অর্থের বিনিময়ে টিকিট কিনে নাটক দেখতে হয়। সেগুলো হলো বাণিজ্যিক অথবা বিত্তশালীদের থিয়েটার।

যা হোক, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিচিত্র ধরনের বড়, মধ্যম ও ছোট আকারের থিয়েটার আছে। ইংল্যান্ডের লন্ডন এবং ভারতের কলকাতা থিয়েটার নগরী হিসেবে পরিচিত। আমরাও সেই পরম্পরায় একটি উন্নত এবং জঙ্গম থিয়েটার চর্চার ইতিহাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। প্রায় দুই হাজার বছর আগের কালিদাস, শুদ্রক ও ভাসের সময় থেকে শুরু করে আমাদের উভয় বঙ্গের বঙ্গীয় থিয়েটার সমগ্র বিশ্বের স্বীকৃতি পেয়েছে বক্তব্য, অভিনয় ও নির্দেশনার কুশলতায়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে আমাদের থিয়েটার, শখের থিয়েটারের অভিধা থেকে মুক্ত হয়ে একটি শক্তিশালী সামাজিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তীকালে আমাদের নব-নাট্য আন্দোলনে একটি অভিপ্রায় যুক্ত হয়েছিল, তা হলো, দর্শনীর বিনিময়ে অর্থাৎ দর্শকদের টিকিট ক্রয় করে নাটক দেখার অভ্যাস গড়ে তোলার রীতি প্রচলন।

আমরা আদি যুগের থিয়েটারের মতো নিরাভরণ মঞ্চে আমাদের যাত্রা শুরু করেছিলাম এবং আজকে প্রযুক্তিগত আধুনিক অনেক সুযোগ-সুবিধা আমরা আমাদের নাট্যাভিনয়ে যোগ করতে সক্ষম হয়েছি। বাংলা ভাষার নাট্যকার গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, শচীন সেনগুপ্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাদল সরকার, মনোজ মিত্রের পথ অনুসরণ করে আমরাও নাট্য রচনার পরম্পরা রক্ষা করে চলেছি। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, আনিস চৌধুরী, নুরুল মোমেন, সাইদ আহম্মেদ প্রমুখ এবং পরবর্তীকালে মমতাজউদ্দীন আহম্মদ, আবদুল্লাহ আল-মামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন, সৈয়দ শামসুল হকসহ নতুন প্রজন্মের একাধিক নাট্যকার দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়ে আসছেন। আমাদের দেশের নাটক আজ বিশ্বের নাট্য ভুবনে ঠাঁই করে নিয়েছে।

নাট্যকারদের পাশাপাশি আমাদের দেশের অভিনেতারা এবং নাট্যনির্দেশকেরা দেশে-বিদেশে নিজেদের সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।

আমাদের দেশের নাট্যচর্চার সূচনালগেড়ব রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, বরিশাল, খুলনার নাট্যচর্চাও বেগবান ছিল, যা অর্থ ও উৎসাহের অভাবে ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকায় সত্তর, আশি, নব্বইয়ের দশকে, এমনকি নতুন শতাব্দীর শুরুর দিকে নাট্যচর্চা ছিল উত্তাল ও সৃজনশীল। বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তিনটি মিলনায়তনে দর্শনীর বিনিময়ে ঢাকার বিভিন্ন দল নিয়মিতভাবে নাটকের মঞ্চায়ন করে চলেছে কিন্তু তাতে আগের দিনের উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, গত পাঁচ-ছয় বছর দুঃসহ ট্রাফিক জ্যামের কারণে সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক দেখার জন্য বারিধারা, গুলশান, মিরপুর, এক কথায় অধিক দূরত্ব থেকে মঞ্চনাটক দেখার জন্য দর্শকেরা আসতে পারে না। নাটক দেখার জন্য আসা-যাওয়ার মধ্যে দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকে। ঢাকায় আরও কিছু মিলনায়তন আছে কিন্তু সেগুলো হয় নাটক মঞ্চায়নের উপযোগী নয়; না হয় অধিক ভাড়ার কারণে নাটকের দল এই হলগুলো ভাড়া নিতে অপারগ হয়। সম্প্রতি নাটক সরণির (বেইলি রোড) মহিলা সমিতি ভবনে নতুনভাবে মঞ্চ নির্মিত হয়েছে। প্রমত হলটি আধুনিক হলেও ছোট এবং হলের নির্ধারিত ভাড়া প্রদান করা নাটকের দলগুলোর ক্ষমতার মধ্যে পড়ে না। শিল্পকলা একাডেমির তিনটি মঞ্চ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বড় অঙ্কের অনুদানের কারণে নাট্যদলগুলো ভাড়া নিতে সক্ষম হয়। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে নাট্যচর্চার ৪৪ বছরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেশের নাটকের দলগুলো আংশিকভাবেও আজ অব্দি পেশাজীবিত্ব অর্জন করতে পারেনি। কেবল ভালোবাসা ও উন্মাদনা দিয়ে এই ধরনের বড় প্রয়োগ শিল্পমাধ্যমকে বেশি দিন প্রবহমান রাখা যায় না। বর্তমানে বাংলাদেশে ন্যূনপক্ষে ২০টি টিভি চ্যানেলে নিয়মিতভাবে একক ও ধারাবাহিক নাটক সম্প্রচারিত হয়। মঞ্চনাটকের শিল্পীরা বর্তমানে অনেকেইে মঞ্চ ছেড়ে অর্থকরী টেলিভিশন নাটকের দিকে ঝুঁকেছে। এই অবস্থায় আমাদের গর্ব, স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম সেরা ফসল মঞ্চনাটককে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি অনুদান, ব্যাংক, বহুজাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

রাজধানী ঢাকার গুলশান, মিরপুর, উত্তরা এবং অন্যান্য স্থানে নাটকের জন্য মিলনায়তন নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই শিল্পমাধ্যমকে সতত প্রবহমান রাখা সম্ভব, কেবল আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে।

এতদ্সত্ত্বেও দেশে এখন ৩৫০টির মতো নাট্যদল সক্রিয় রয়েছে এবং ঢাকায় ৬০টির মতো নাট্যদল নিয়মিত নাটক মঞ্চায়ন করে চলেছে। পুরোনো নাটকগুলোর পাশাপাশি গত এক বছরে বেশ কিছু নতুন নাটক পাদপ্রদীপের আলোয় উন্মোচিত হয়েছে। কিছু কিছু পুরোনো নাটকেরও নব-মঞ্চায়ন হয়েছে।

নিম্নে কয়েকটি নতুন নাট্য প্রযোজনার পাশাপাশি পুরোনো নাটকের নব-মঞ্চায়নের তালিকা দেওয়া হলো।

দলের নাম: নাটক

নাট্যকেন্দ্র: বন্দুক যুদ্ধ ও গাধার হাট।

নাগরিক নাট্যাঙ্গন বাংলাদেশ: গহর বাদশা ও বানেছা পরী।

পদাতিক নাট্যসংসদ (টিএসসি): কালরাত্রি।

প্রাচ্যনাট: ট্র্যাজেডী পলাশ বাড়ী, বনমানুষ।

প্রাঙ্গণেমোর: আমিও রবীন্দ্রনাথ

নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বল: তোরা সব জয়ধ্বনি কর।

ঢাকা পদাতিক: হেফাজত

লোক নাট্যদল (সিদ্ধেশ্বরী): সোনাই মাধব (নতুনভাবে মঞ্চায়িত)

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়: নাম-গোত্রহীন মান্টোর মেয়েরা।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়: দেওয়ান গাজীর কিস্‌সা (নতুনভাবে মঞ্চায়িত)।

উল্লিখিত প্রযোজনাগুলোর মধ্যে আমি নাট্যকেন্দ্রের ‘বন্দুক যুদ্ধ ও গাধার হাট’নাটকদ্বয় (ডাবল বিল) দেখেছি যা আমার কাছে প্রশংসনীয় নাট্য প্রযোজনা মনে হয়েছে। নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বলের ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ সম্প্রতি প্রযোজিত নাটক সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেছেন এবং বর্তমান লেখক দ্বারা নির্দেশিত। প্রাচ্যনাটের ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ী’এবং ‘বনমানুষ’, দুটো নাট্য প্রযোজনাই আমি দেখেছি এবং দুটো নাট্য প্রযোজনাই আমার ভালো মনে হয়েছে। লোক নাট্যদলের (সিদ্ধেশ্বরী) ‘সোনাই মাধব’, মৈমনসিংহ গীতিকার কাহিনি অবলম্বনে নতুনভাবে মঞ্চায়িত এই নাট্য প্রযোজনা আমার কাছে খুব আনন্দদায়ক এবং পাশাপাশি শিক্ষণীয় মনে হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীরা আমাদের মঞ্চনাটকে আবার নতুন জোয়ার আনতে সক্ষম হবে এবং প্রিয় এই শিল্পমাধ্যমকে আরও দর্শকপ্রিয় করে তুলবে।