মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে

তিনি গান করতেন ভালো, লিখতেন প্রাঞ্জল, এমনকি অন্তরঙ্গ আড্ডাতেও ছিলেন দারুণ সপ্রতিভ। অথচ পরিচয় লিখতে গেলে সবার আগে লিখতে হয় রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এ জন্যই তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে সৃজনশীল গুণাবলিতে সমৃদ্ধ এ জেড এম আবদুল আলীর কথাই বললেন সবাই।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেহত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু বিপুল সৃজনকর্মের যে স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন, তার মাধ্যমে চিরকাল অমর হয়ে রইবেন। তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী একটি স্মরণসভায় এমনটাই বললেন আগত অতিথিবৃন্দ। গত ২৩ সেপ্টেম্বর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের মিলনায়তনে সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলম আয়োজন করে এ স্মরণসভার।
নানান অভিধায় ভূষিত করা যায় তাঁকে- বাংলাদেশ রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, বিশিষ্ট কলাম লেখক এবং সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক মাসিক পত্রিকা কালি ও কলম-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। সদ্য প্রয়াত এই গুণী ব্যক্তির সম্মানে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে স্মরণসভাটির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সভাপতিত্ব করেন কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য লুভা নাহিদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য দেন কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত।
আয়োজনের শুরুতে কালি ও কলম-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য প্রয়াত এ জেড এম আবদুল আলী স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে এই সাবেক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কলামিস্ট, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও নিভৃতচারী সংগীতশিল্পীর জীবনের বিভিন্ন দিক আলোকপাত করেন বিশিষ্টজনেরা।


অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, ‘এ জেড এম আবদুল আলীর মৃত্যুতে শোক নয়, বরং তাঁর সফল জীবনের জন্য আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত, তাঁর সাফল্যমণ্ডিত জীবনের জয়গান করা উচিত। কেননা, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপন করে গেছেন তিনি।’ এ জেড আবদুল আলীর রবীন্দ্রসংগীত গায়নেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন অর্থমন্ত্রী।
সভাপতির বক্তব্যে এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান উল্লেখ করেন, এ জেড এম আবদুল আলীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ৬৫ বছরের। জনাব আবদুল আলীর প্রয়াণে সেই বন্ধুত্বের অবসান ঘটলেও স্মৃতি রয়ে যাবে আজীবন। আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের দুজনের মধ্যে আলোচনা হতো বাংলা সাহিত্য নিয়ে। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি এ জেড এম আবদুল আলীর ছিল বিশেষ অনুরাগ। তাঁর মাধ্যমেই ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মে আমার।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেলওয়েতে উচ্চ পদে চাকরি করলেও জনাব আলী কখনোই পাঠ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি অফিস থেকে ফিরেই কাপড় ছেড়ে অথবা না ছেড়ে বই নিয়ে বসতেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি কলামিস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সমাজের অসংগতি, সামরিক সরকার, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে ছিল শাণিত প্রতিবাদ।’ এ জেড এম আবদুল আলীর অসাম্প্রদায়িক চেতনা, প্রজ্ঞা ও সুখী-সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্নকে সবার মাঝে ধারণের আহ্বান জানান তিনি।
স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তাঁর গানে হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর খোকন মামার (এ জেড এম আবদুল আলী) কাছে বলে জানান তিনি। বন্যা বলেন, ‘তিনি নিজের জন্য গান গাইতেন। গানকে তিনি প্রাণে ধারণ করেছিলেন। কিন্তু কখনো বাইরে গান গাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব ছিলেন না। এ জন্য অত্যন্ত ভালো গান গাইলেও কখনো রেডিও-টিভিতে অংশগ্রহণ করেননি। মামা ছিলেন নানা দিক দিয়ে গুণী একজন মানুষ।’ বক্তৃতার শেষাংশে এ জেড এম আবদুল আলীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বন্যা গেয়ে শোনান- ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে…’।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন কালি ও কলম পত্রিকার প্রকাশক এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব আবুল খায়ের। তিনি বলেন, ‘আমার গানের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল এ জেড এম আবদুল আলীর কারণে। সম্পর্কে তিনি আমার খালু হতেন। বিভিন্ন সময়ে খালার বাড়িতে যাওয়া ও খালুর সংস্পর্শ আমাকে সংগীতের প্রতি অনুরাগী করে তোলে।’
এ জেড এম আবদুল আলীর ছেলে তীব্র আলী বলেন, ‘বাবা গান গাইতে পারলে সবচেয়ে খুশি হতেন। বাংলা-ইংরেজি সব ধরনের বইয়ের প্রতিই তাঁর ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। তাঁর কাছেই আমাদের রবীন্দ্রসংগীত শেখা। বিদেশ-বিভুঁইয়ে এখন পথহারা হলে তাঁর শেখানো গান আমাকে পথের দিশা দেয়। এই গান কাজ করে আমার কাছে কম্পাস-দিকনির্দেশক হিসেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আব্বা অসম্ভব বই ভালোবাসতেন। আমি যখন ধীরে ধীরে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়তে থাকি, তখন বাবা বুঝতে পারেন, একসময় তিনি আর আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না। তাই একসময় বিদেশ থেকে আমার জন্য নিয়ে আসেন ২০ খণ্ডের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এনসাইক্লোপিডিয়া। এ জেড এম আবদুল আলীর অসাম্প্রদায়িক চেতনা, জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, সফল বাংলাদেশের স্বপ্ন সবাই ধারণ করে যাবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অবসরপ্রাপ্ত সচিব এম এ হান্নান, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সোহরাব হাসান, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির সেক্রেটারি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন অদিতি মহসিন। তিনি শুরু করেন ‘আপনারে দিয়ে রচিলিরে কিয়ে’ গানটি দিয়ে। এরপর গেয়ে শোনান ‘আমার হিয়ার মাঝে’ ও ‘শুধু তোমার বাণী’। এরপর মঞ্চে আসেন শামা রহমান। তিনি গেয়ে শোনান ‘আজ যেমন করে গাইছে আকাশ’, ‘সকরুণ বেণু বাজায় কে যায়’ ও ‘আজি বিজন ঘরে’। অনুষ্ঠানের তৃতীয় শিল্পী ছিলেন বুলবুল ইসলাম। তিনি একে একে শোনান ‘তোমায় গান শোনাব’, ‘ভুবনেশ্বর হে’, ‘পথের শেষ কোথায়’। শেষ শিল্পী ছিলেন ইফ্ফাত আরা দেওয়ান। তিনি গাইলেন ‘তবু মনে রেখ’, ‘এই কথাটি মনে রেখ’ ও ‘তুমি রবে নীরবে’।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘এ জেড এম আবদুল আলী একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হলেও তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান নাগরিক ও প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক। তাঁর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশকে বাস্তবায়নে এক বলিষ্ঠ আবেদন ছিল। তিনি নিয়মিতভাবে সংবাদপত্রে কলাম লিখে প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করতেন।’
নিভৃতে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করেছেন নন্দিত কলাম লেখক এ জেড এম আবদুল আলী। প্রচারবিমুখ এ লেখক কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের পক্ষে। কটাক্ষ করেছেন সামরিক শাসনকে। বারবার অনুভূত হবে তাঁর প্রস্থান।