মহাদেব সাহার সঙ্গে

শৈশবে সবার চোখের আড়ালে কবিতা দিয়ে অঙ্কের খাতা ভরে তুলতেন। পরবর্তীতে তিনিই হয়ে ওঠেন আমাদের প্রধান কবিদের একজন। সেই কবি মহাদেব সাহা। গত চার দশকে তাঁর হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা কবিতা। কিন্তু এখনো তিনি তাকিয়ে আছেন নতুনতর সৃষ্টি সুখের উল্লাসের দিকে। এই কবির কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে আমাদের চিরপরিচিত জীবনেরই ক্লেদ-যন্ত্রণা আর সুখের অনুষঙ্গগুলো। বাংলা কবিতার আবেগময় রূপটিকে মহাদেব সাহা সজীব ও জনপ্রিয় করে তুলেছেন তাঁর নিজস্ব বৈচিত্র্য দিয়ে। যে কারণেই পাঠক বারবার ফিরে আসে তাঁর কবিতার কাছে দ্রোহ, প্রকৃতি কিংবা ভালোবাসার ছোঁয়া পেতে। কথোপকথন তাঁরই সঙ্গে…

কী নিয়ে ব্যস্ততা এখন?

আমার ব্যস্ততা তো কবিতা নিয়েই। আমি কিছু না লিখলেও ভাবনার মধ্যে থাকি। ভাবনার মধ্যেই বেশির ভাগ সময়ে আচ্ছন্ন থাকি। বাস্তব-অবাস্তব স্বপ্নময়তার মধ্যে কেটে যায়। বলা যায়, জেগে জেগেও ঘুমাই। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঝিমুতেও থাকি। আমাকে অমদ্যপ মাতাল বলা চলে। বাস্তবের মধ্যে থাকি না। বাস্তব থেকে দূরে ঠিক কোথায় থাকি, বলতে পারব না। একধরনের পাগলের জীবনযাপন, বালকের খেলা। স্বপ্নগ্রস্থের আকাশে লাটাইবিহীন ঘুড়ি ওড়ানো।

আগস্টের ৫ তারিখ তো আপনার জন্মদিন গেল। ১৯৪৪ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আপনি। কী করলেন জন্মদিনে?

এবার জন্মদিন উপলক্ষে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আমার একটি কবিতা হলো-

‘আমি কি কফিন থেকে তোমাদের ডেকে বলব কবে

আমার জন্মদিন

তোমরা কেউ আমার হাতে একটা গোলাপ ফুল দাও

কেউ আমার জন্য চারুকলার সামনে এসে

একটু দাঁড়াও…’

জন্মদিন নিয়ে আমার তেমন কোনো ভাবনা নেই। আমার জন্মদিন মানে একটা পিঁপড়ের জন্মদিন। কিন্তু পিঁপড়েরও তো একটি জন্মদিন থাকতে পারে, আমারও আছে। এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। এই জন্মদিন আসে যখন, তখন আমি সেই জন্মমুহূর্তটির কথা ভাবতে থাকি। আমি কত কেঁদেছিলাম, কেঁদে কেঁদে চিৎকার করেছিলাম, তা তো আমি ঠিক জানি না। বড় ইচ্ছা করে সেই মুহূর্তকে জানতে। তখন চোখে হয়তো অশ্রু ছিল না, নবজাত শিশুর চোখে অশ্রু থাকে না। কিন্তু আমার মনে হয়, আমার জন্মমুহূর্তে আমার চোখে অশ্রু ছিল। হয়তো শ্রাবণের বর্ষণ ছিল আমার চোখে, না হলে সারা জীবন এত চোখ ভেজাতে হলো কেন? এই জন্মদিনে শিল্পকলার কফিহাউজ প্রাঙ্গণে আমার কিছু কাছের মানুষকে নিয়ে কাটিয়েছি আমার জন্মদিনটি। যারা আমাকে ভালোবাসে, এরা আমার জন্ম, জন্মদিনটাকে মূল্যবান করে রেখেছে। না হলে আমার মতো মানুষের জন্মই বৃথা হতো। কী আমি করেছি, কে আমার কথা মনে রাখবে। কিছু পদ্য লিখেছি, লিখছি, লিখে যাব।

কবিতা লেখার প্রতি আগ্রহটা কখন থেকে?

গ্রামের এক বালিকা বিদ্যালয়ে শুরু হয়েছিল আমার পড়াশোনা। যদিও নামে সেটি ছিল বালিকা বিদ্যালয়, কিন্তু সেখানে ছেলেমেয়ে সবাই একসঙ্গে পড়াশোনা করত। এখান থেকে প্রাইমারি পাস করে ভর্তি হই গ্রামেরই উচ্চবিদ্যালয়ে। পরে চলে আসি বগুড়ার ধুনট উচ্চবিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ছিল প্রচুর বই। এসব বইয়ের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে আমার পাঠাভ্যাস। তখন থেকেই আলাদা করে পড়তাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কবিতা। বাড়ির সবার ও বন্ধুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে খাতা ভরে তুলতাম কবিতা দিয়ে। বিদ্যালয় ছুটির পর বন্ধুরা যখন মাঠে খেলতে যেত, আমি তখন ঘুরে বেড়াতাম নদীর তীরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে। বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই নিজের ভেতরে অনুভব করলাম, কবিতা যেন আমার বয়স বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর সবার মতো আমি নই। কিছুটা মগ্ন, কিছুটা অন্য রকম।

সাহিত্যের এই অমোঘ আকর্ষণ কি পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে পাওয়া?

আমার বাবা ব্রিটিশ আমলে এন্ট্রান্স পরীক্ষার সময় কলকাতায় গিয়ে জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির সঙ্গে। তখন স্বদেশি আন্দোলনের যুগ। লেখাপড়া ছেড়ে তিনি যোগ দেন স্বদেশি আন্দোলনে। একসময় পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষার তাগিদে তাঁকে ফিরে আসতে হয় গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই উদাসীন। তাঁর মন পড়ে থাকত নাটক আর যাত্রার দিকে। যাত্রার বিবেক হিসেবে তাঁর গানের গলা ছিল খুবই চমৎকার। মা বিরাজমোহিনী স্কুল পাস করা। গৃহিণী। কিন্তু সমস্ত রামায়ণ আর মহাভারতটা ছিল তাঁর ঠোঁটের আগায়। প্রতিদিন বিকেলেই রামায়ণ-মহাভারত পাঠের আসর বসত আমাদের বাড়ির আঙিনায়। পাড়ার মহিলারাই হতো সে আসরের শ্রোতা। মায়ের গানের গলাটিও ছিল ভারি সুন্দর। তিনি নিজে গান লিখে সুর করে শোনাতেন। কবিতাও লিখতেন।

এবার আসি পড়াশোনার বিষয়ে…

শিক্ষাজীবনের শুরু কালীতলা প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৬১ সালে ধুনট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করি। ঢাকা কলেজে এক বছর পড়ে শারীরিক অসুস্থতার কারণে বগুড়া কলেজে গিয়ে পুনরায় ভর্তি হই। সেখান থেকে ১৯৬৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট, সেখান থেকেই বাংলায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করে ১৯৬৯ সালে ইংরেজি বিভাগে পুনরায় ভর্তি হই; কিন্তু পড়া শেষ করিনি আর।

এই যে সদ্য তারুণ্যে পড়তে এসেছিলেন ঢাকায়, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে চলে যেতে হলো বগুড়ায়। তখনকার মনের অবস্থাটা কেমন ছিল?

বগুড়া তখন শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতির সমঝদার শহর। এ ছোট জেলা শহরে তখন সাহিত্যের প্রতি খুবই আগ্রহী। কিছু তরুণ কবিতাপ্রেমী ছিলেন। আমিও ভিড়ে গেলাম সেই দলে। বগুড়ায় থাকাকালেই সাহিত্য আর পত্রপত্রিকার সঙ্গে গভীর যোগাযোগ তৈরি হয় আমার। তখন অধ্যাপক মহসীন আলী দেওয়ান বের করেন বগুড়া বুলেটিন। শিল্প-সাহিত্যে আগ্রহী এই মানুষটি একটি সাহিত্য পত্রিকাও বের করতেন। কবি আতাউর রহমান তখন বগুড়ায়। ফলে জমে যেতে বিশেষ সময় লাগল না। বগুড়া বেণীপুর বুক হাউস তখন শহরের সব সাহিত্যপ্রেমীর ঠিকানা। বগুড়ার এসব সাহিত্যপ্রেমীর সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার পাশাপাশি চলত আমার পড়াশোনা, পড়াশোনা নামমাত্র, কবিতাটাই মুখ্য।

সে সময় আপনারা বের করেছিলেন লিটল ম্যাগাজিন বিপ্রতীক…

হ্যাঁ। বগুড়া কলেজে পড়ার সময় সেখানকার সব আধুনিক ও প্রগতিশীল তরুণরা মিলে বের করেছিলাম লিটল ম্যাগাজিন বিপ্রতীক। ঢাকায়ও তা যথেষ্ট আলোড়ন তোলে।

আর কণ্ঠস্বর?

বেণীপুর বুক হাউসে তখন নতুন নতুন সব পত্রিকা আর বই যেত। একদিন হাতে পড়ে কণ্ঠস্বর নামে একটি পত্রিকা। সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। কণ্ঠস্বর তখন অন্য রকম এক পত্রিকা। এটি যেন চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায় তরুণ কবিতাপ্রেমীদের। কণ্ঠস্বরের ঘোষণাটি ছিল যেমন ধারালো, তেমনি নতুন। অভিভূত হয়ে যাই আমি, যেন নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই পত্রিকার জীবনদর্শনে। এটি ছিল এ রকম- যারা সাহিত্যের স্বনিষ্ঠ প্রেমিক, শিল্পে উন্মোচিত, সত্য, অকপট, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর; যারা উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত, অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী; যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত; যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাপিষ্ট- কণ্ঠস্বর ছিল তাদেরই পত্রিকা।

কণ্ঠস্বরে কবিতা ছাপানোর শুরুর কথাটা বলবেন কি?

কণ্ঠস্বর মোহাবিষ্ট করে রাখে আমাকে। সাহস করে একদিন সেখানে পাঠিয়ে দিলাম একটি কবিতা। অসম্ভব দ্রুততায় একদিন আমার হলের ঠিকানায় একটি খসখসে হলুদ খাম এসে হাজির। কণ্ঠস্বর সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন, আগামী সংখ্যাতেই কবিতাটি ছাপা হচ্ছে। চিঠি পেয়ে সে কী আনন্দ আর উত্তেজনা। মনে মনে অনুভব করলাম, কণ্ঠস্বরের অস্থির উদ্দীপ্ত প্রবল জীবনের সঙ্গে মিলতে হবে। ভেতরে ভেতরে ঢাকা আসার উত্তেজনা ও স্বপ্ন দেখি।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সাহিত্যে অনেক প্রভাব রেখেছে। সে সময় আপনি সান্নিধ্য পেয়েছেন অনেক বরণীয় ব্যক্তির।

১৯৬৮ সালে বাংলায় এমএ ডিগ্রি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৬৯ সালে ইংরেজি বিভাগে পুনরায় ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই পদ্মা নদী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সবকিছু ভুলে ডুবে যাই মতিহারের অপার প্রকৃতির রাজ্যে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তখন সত্যিকার অর্থেই সাহিত্যের তীর্থভূমি। কবি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সম্পাদনায় বের হয় পূর্বমেঘ-এর মতো বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা। লোক-গবেষক কবি মযহারুল ইসলাম বের করেন উত্তর অন্বেষা। রাজশাহী থেকে বের হয় আরও অনেক সাহিত্য পত্রিকা। বদরুদ্দীন উমর, অধ্যাপক মশাররফ হোসেন, অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমেদ, গোলাম মুরশিদ, সনৎ কুমার সাহা, আলী আনোয়ার- সবাই মিলে যেন এক শিল্প-সাহিত্যের রাজত্ব তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা লেখার কারণে সবারই স্নেহ পাই আমি। এমন পরিবেশে নিজেকে বুঁদ করে রাখি কবিতা লেখায়। ঢাকার অনেক পত্রিকাতেই তখন নিয়মিত কবিতা ছাপা হচ্ছে আমার। বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ রেডিওর গীতিকার। তাদের উৎসাহে আমি নিজেও গীতিকার হয়ে যাই। সারা দিন ঘোরাঘুরি, রাতভর আড্ডা, তর্ক-বিতর্ক, শেষ রাতে হলে ফেরা। সবকিছুতেই নিজেকে ডুবিয়ে দিই। গোপনে বুনে তুলি নিজস্ব এক ঠিকানাও।

সাহিত্যের টানেই কি তাহলে প্রথম ঢাকায় এলেন?

সেটা ১৯৬৯-এর জুন মাস। কণ্ঠস্বর সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ উদ্যোগ নেন তরুণ কবি-লেখকদের নিয়ে প্রথম সাহিত্য উৎসব করার। সম্মেলন হবে ঢাকার তোপখানা রোডে তখনকার পাকিস্তান কাউন্সিল মিলনায়তনে। সভাপতি মুনীর চৌধুরী। সম্মেলনে একটি প্রবন্ধ পড়ার জন্য আমাকে বলেন কণ্ঠস্বর সম্পাদক। একটু অবাকই হই আমি। রাজশাহী থেকে সেদিন আমি ছিলাম শেষ বাসের যাত্রী। অধ্যাপক আবদুল হাফিজও প্রবন্ধ পড়বেন সম্মেলনে। তাই আবদুল হাফিজ আর আমি দুজনই সম্মেলনে যোগ দিতে এলাম ঢাকায়। উঠলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদেরই গ্রিন রোডের দুই রুমের বাসায়। এই আসাটাই যেন আমাকে সত্যিকার অর্থে ঢাকা চিনিয়ে দিল। সম্মেলনে নতুন লেখকদের সঙ্গে পরিচয় যেমন হলো, প্রবন্ধ পড়ে কিছু প্রশংসা আর মফস্বলীয় বলে কিছু বিদ্রুপ ও তীক্ষ্ণ অট্টহাসিও জুটল; কিন্তু এরই মধ্যে যা বোঝার, বুঝে গেলাম আমি। ঢাকা যেন চোরাগোপ্তা টানে টানছে আমাকে। এখানে পাড়ি না জমালে যেন কবিতার বিকাশ নেই। এক অন্ধ মোহ সারাক্ষণ লেগে থাকে আমার পিছু। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। ঢাকায়ই আসব। এদিকে রাজশাহীতে বাকি রইল গবেষণা আর শিক্ষা-দীক্ষার পাট।

কোনোরকম আবেগ কাজ করেনি রাজশাহী ছেড়ে আসতে? প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসতে?

যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে দিয়েছিল গভীর অনুভূতির দ্যোতনা, সেই প্রিয় মতিহার ছেড়ে আসতে হলো কবিতারই কারণে। পড়ে রইল প্রমত্তা পদ্মা। আমি উঠে পড়লাম কবিতার ভেলায়। বিষয়টি এমন, গার্ড বাঁশি বাজালেন। পেছনের পড়ে রইল রাজশাহী, মতিহার, কাজলা, উন্মুক্ত উথাল পদ্মা, আমি তাকিয়ে আছি অনন্তের দিকে। আর সঙ্গে নিয়ে চলেছি বহু আনন্দ-বেদনা, ভালোবাসার স্মৃতি। সবার জীবনে যেমন, আমার জীবনেও তেমনি সেই উদ্দীপ্তমুখর দিবারাত্রির কলধ্বনি নীরবে বহে চলেছিল মনে, আমি রাজশাহী ছেড়ে ঢাকা যাচ্ছি, সে ছিল অতল জলের আহ্বান, কবিতাময় দিনরাত্রির স্বপ্ন।

ঢাকায় আসার প্রথম জীবনের শুরুটা হয়েছিল কীভাবে?

ষাটের দশকে ঢাকা কলেজে পড়ার সময় কিছুকাল পরিচয় ছিল ঢাকার সঙ্গে। কিন্তু সে দেখা আর পরবর্তী দেখার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। কবিতার জন্য যাত্রা। তবে অন্যদের চেয়ে আমাকে একটু ভাগ্যবানই বলতে হবে। অন্যদের মতো আমাকে একেবারে খালি হাতে ঢাকায় আসতে হয়নি। পায়ের নিচে মাটি ছিল একটু। মানে একটা চাকরি পাওয়া গিয়েছিল তখন। সেই চাকরিটাও নাটকীয়। কোনো ইন্টারভিউ নেই, ধরাধরি নেই, বলাবলি নেই। কোনোরকমের এক দরখাস্তেই চাকরি হয়ে গেল। ১৯৬৯-এর জুলাই মাসে দৈনিক পূর্বদেশে সহকারী সম্পাদক হয়ে চলে এলাম ঢাকায়।

ইত্তেফাক-এ তো আপনি কমর্রত ছিলেন বহু বছর?

১৯৭৫ সালের জুন মাসে পূর্বদেশ বন্ধ হয়ে যায়। টানা পাঁচ বছর বেকার। এরপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত কলাম লিখতাম সংবাদে। সারথি নামে। প্রথম দিকে প্রতি সপ্তাহে দুটি করে, পরে একটি করে সেই কলাম লেখার কাজ চালিয়ে যাই। এ সময়ের কিছু পরে চাকরি হয় ইত্তেফাকে। সে চাকরি প্রায় ৩৫ বছরের।

সংসারজীবনের শুরু?

১৯৭৩ সালে ঢাকায় দেখা হয় নীলার সঙ্গে। বার দুয়েকের দেখাশোনায় নিজেদের একটু জানাশোনাও হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের পছন্দে দুজন বিয়ে করি। আমাদের দুই পুত্রসন্তান তীর্থ ও সৌধ। দুই পুত্রবধূ তানিয়া ও মিতা।

মুক্তিযুদ্ধকালের জীবনটার কথা জানতে চাইছিলাম।

একাত্তরের কালরাত্রি, ২৫ মার্চ। তখন থাকতাম ১১৩ নম্বর আজিমপুর রোডের একটি বাসায়। মেসবাড়ি। সারা রাত নিজের ঘরে বসে প্রত্যক্ষ করি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের বর্বরতা। ২৬ মার্চের পরের দিন বেরিয়েই চলে আসি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কবিবন্ধু আবুল হাসান তখন সেখানে ভর্তি। সেখানেই দেখি জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে। তখনো জীবন প্রদীপ নেভেনি তাঁর। প্রত্যক্ষ করি ঢাকা শহরের সমস্ত বর্বরতা। সমস্ত শহরজুড়ে তখন কারফিউ। এর মধ্যেই চেষ্টা করি ঢাকা থেকে বের হওয়ার; কিন্তু পারিনি। অবশেষে ২৭ মার্চে ঢাকা থেকে চলে যাই নিজের গ্রামের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে স্থানীয়ভাবে তরুণদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু সেই গ্রামেও আবার ২৫ এপ্রিল আক্রমণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। পরে জুন মাসের দিকে আসাম হয়ে পরিবারসহ চলে যাই কলকাতায়। সেখানে গিয়ে যুক্ত হই জয়বাংলা পত্রিকার সঙ্গে। কাজ করি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও। স্ক্রিপ্ট লেখা, কবিতা পাঠ- এসবই তখন মুক্তিযুদ্ধের কাজ। যুগান্তর, আনন্দবাজারসহ নানা পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করি। বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবহিত করার কাজ করতাম সে সময়। ১৩ ডিসেম্বর সাতক্ষীরায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ে। ভারত থেকে কবি-সাংবাদিকদের একটি দল সেদিন সাতক্ষীরায় আসে সরেজমিনে দেখার জন্য। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের সেই দলে সেদিন আমিও ছিলাম। স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রথম স্পর্শ আজও শিহরণের মতো মনে হয় আমার কাছে। একে মনে হয় জীবনের দুর্লভ অক্ষয় স্মৃতি।

কবিতা লেখা, সাহিত্য রচনার কারণে বিভিন্ন সময়ে আপনি সম্মানিত হয়েছেন নানা পুরস্কারে।

পুরস্কার তো আসলে ভালোবাসা, ভালোবাসার স্বীকৃতি। এটা কাজের সম্মান। পুরস্কারের চেয়ে আমি বেশি পেয়েছি মানুষের ভালোবাসা, যা পেয়েছি তার তুলনা নেই। [উল্লেখ্য, তিনি নানা সময়ে যে পুরস্কারগুলো পেয়েছেন তার মধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৩), রেখাচিত্রম সম্মাননা-কলকাতা (১৯৯৪), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), জেবুন্নেসা-মাহাবুব উল্লাহ পুরস্কার (১৯৯৪), বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার (১৯৯৭), একুশে পদক, খালেদদাদ চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার (২০০২), কবি সুকান্ত সাহিত্য পুরস্কার (২০০৩), বঙ্গবন্ধু পুরস্কার-কলকাতা (২০০৫), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (২০০৮) অন্যতম]।