মাটি ও মানুষের শিল্পী সুলতান স্মরণে

নিসর্গ থেকে মানুষ, সবকিছুর প্রতিই তাঁর অফুরন্ত ভালবাসা। শুধু রঙ তুলির স্পর্শে এরমধ্যে তিনি সৌন্দর্য অন্বেষণ করেননি, বাস্তবেও প্রমাণ দিয়েছেন ভালবাসার। তাই ঢাকার ফুটপাত থেকে দুর্লভ নাগালঙ্গম বৃক্ষ নিধন হতে দেখে তাঁর চোখ প্লাবিত হয়েছিল। বলতেন, এতো একটি বৃক্ষের নিঃশেষ নয়, গোটা জীবনের পরিসমাপ্তি। নির্দ্ধিধায় সারা জীবনের সমস্ত সঞ্চয় তিনি ব্যয় করেন শিশুদের কল্যাণে, পোশা প্রাণীর জন্যে। তিনি শেখ মোহাম্মদ সুলতান, চিত্রশিল্পের সুলতান।

গত ১০ আগস্ট ছিল বিশ্ববরেণ্য চিত্র শিল্পী এস এম সুলতানের ৯৩তম জন্মজয়ন্তী। এ উপলক্ষে প্রতি বছরই আয়োজন করা হয় সুলতান মেলার। ‘সংস্কৃতির চর্চাই হোক আমাদের সুন্দর আগামীর প্রেরণা’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে নড়াইল সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজ সুলতান মঞ্চ চত্বরে ৬ সেপ্টেম্বর উৎসবের আয়োজন করা হয়। ‘এস এম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন’ এবং ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের’ আয়োজনে ছবি এঁকে উৎসবের উদ্বোধন করেন নড়াইল জেলা প্রশাসক মোঃ এমদাদুল হক চৌধুরী, পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম এবং চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন নড়াইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ্বাস।

 

শিশুদের চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগীতা

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন এসএম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ প্রফেসর অশোক কুমার শীল এবং অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। উদ্বোধনী সভা শেষে শিল্পী সুলতানের পালিত কন্য নিহারবালাকে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেওয়া হয়। চারদিন ব্যাপী এই উৎসবের অনুষ্ঠানমালায় ছিল আর্ট ক্যাম্প, চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিল্পী এসএম সুলতানের জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা সভা। নড়াইল জেলার আটটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ভারতের  অতিথি শিল্পীরা সঙ্গীত, নৃত্যসহ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। উৎসব প্রাঙ্গনে আয়োজন করা হয় ‘সুলতান মেলা’।

এ ছাড়াও জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও সুলতান ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার বিকেলে চিত্রা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। এসএম সুলতান ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব মোঃ আশিকুর রহমান মিকু জানান, প্রতিযোগিতায় এবছর  নড়াইল, খুলনাসহ পাশ্ববর্তী জেলার ২২টি নৌকা অংশগ্রহন করে। এর মধ্যে নারীদের ৫টি এবং পুরুষদের ১৭টি নৌকা। উৎসব ও নৌকা বাইচকে ঘিরে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। বৈঠারটান, ঢাক-ঢোলের শব্দ ও কাঁসা-পিতলের ঝংকারে চিরচেনা চিত্রার রূপ হঠাৎ যেন বদলে গিয়েছিল। মাঝিমল্লাদের ‘হেইয়্যা’ ‘হেইয়্যা’ হর্ষধ্বনির আওয়াজ ছিল আরো বেশি ছন্দময়।

চিত্রা নদীতে নৌকা বাইচ

সুলতান ছবি একেঁছেন দু’হাতে। ব্যবহার করেছেন দেশজও লতাপাতা শেকড়ের নির্যাস থেকে সংগৃহীত রং। মোট ছবির সংখ্যা তিনি নিজেও জানতেন না। তবে লক্ষাধিক হবে। যা তিনি কখনও সংরক্ষণের তাগিদ অনুভব করেননি। তাঁর অনন্য সৃষ্টির মধ্যে আছে ‘চরদখল’ ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’ ‘মাড়াই’, ‘গ্রামের দুপুর’, ‘দেশপ্রেম’। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলের কুড়িগ্রামে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে।

চিত্রা নদীতে আয়োজিত নৌকা বাইচের ভিডিও-