মাদ্রিদ থেকে মেঘনা

প্রায় দুই শতাব্দী আগে আইরিশ নাট্যকার অস্কার ওয়াইল্ড ‘দ্য ডিকে অব লাইং- অ্যান অবজারভেশন’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘শিল্প নিজেকে ছাড়া অন্য কিছুই প্রকাশ করে না।’ আদতেও তাই। শিল্পীর ব্যক্তিসত্তার অনুসন্ধান দিতে পারে কেবলই তাঁর সৃষ্টি। তাই শিল্পীকে খুঁজে পেতে ডুব দিতে হবে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। বলতে গেলে সেই চেষ্টাই করেছেন ফাহমিদা আখতার। তাঁর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ফেরার মধ্যে। ২০০৮ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের প্রযোজনায় শিল্পী মনিরুল ইসলামের জীবন ও সৃজনকর্ম নিয়ে নির্মিত হয় এই প্রামাণ্যচিত্র।
আদ্যোপান্ত বর্ণাঢ্য এক জীবন মনিরুল ইসলামের। জন্ম ১৯৪৩ সালে, বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায়। বাবার কর্মসূত্রে শৈশব কাটে কিশোরগঞ্জে। পরে চাঁদপুর থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকার তৎকালীন আর্ট কলেজে। সেখানে তিনি জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়ার কাছে সরাসরি চিত্রকলায় পাঠ নেন। জয়নুল আবেদিনের একান্ত আগ্রহে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৬৬-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেন। তারপর স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। এরপর থেকে স্পেনই তাঁর দ্বিতীয় আবাস। স্পেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর বহু একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়েছে। বিচারক হিসেবেও কাজ করেছেন স্পেন, ফ্রান্স, মিসর, ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু আন্তর্জাতিক চারুকলা প্রদর্শনীতে। তাঁর ছবি স্থান পেয়েছে পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্যালারিতে। ১৯৯৭ সালে তিনি স্পেনের রাষ্ট্রীয় পদক, ২০১০ সালে তিনি ভূষিত হন স্পেনের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা ‘দ্য ক্রস অব দি অফিসার অব দি অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা পুরস্কার’ এবং ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমি পদকসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন।
মাত্র আধঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্রে মনিরুল ইসলামের বিপুল জীবন বন্দি করা সম্ভব নয়। তবু তাঁর বেশ খানিকটা নৈকট্য লাভ করা যায়। শিল্পী ফিরে আসছেন মাদ্রিদ থেকে মেঘনায়- চাঁদপুরে। সেই সঙ্গে তর্পণ করছেন মায়ায় জড়ানো স্মৃতি। কৈশোর-যৌবনের ফেলে যাওয়া স্বদেশ আবারও স্বাগত জানায় শিল্পীকে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রবাস জীবন যাপন করছেন তিনি। অথচ তাঁর চিত্রে এখনো খেলা করে বাংলার চেনা নদী, আকাশের রং। বিষয়বস্তুতে যদিও মোরগ লড়াইয়ের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ‘স্প্যানিশ বুল ফাইট’, তবু ক্যানভাসে মুগ্ধতার মায়া ছড়ায় বাংলার চেনা রোদ। কারণটাও ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘এত দিন স্পেনে আছি, কিন্তু কখনোই মনে হয়নি মাটির কাছে আছি।’ বোধ করি এই মাটির মায়ার কাছেই হার মানে ইউরোপের জৌলুশ। তাই বারবার ফিরে আসেন বাংলার অকৃত্রিম সুধা পান করতে।
এই ফিরে আসার তাড়নাকেই ফিল্মে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা ফাহমিদা আখতার। কয়েকটি ভাগে ভাগ করে এই প্রামাণ্যচিত্রে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে পৃথক করেছেন তিনি। সেখানে শিল্পী মেলে ধরছেন তাঁর ব্যক্তিজীবন ও কর্মের স্মৃতি। আর এ গল্পগুলো নির্মাতা সযত্নে জুড়ে দিয়েছেন হৃদয়গ্রাহী সংগীতায়োজনের মাধ্যমে। মেঘনার বুক চিরে একে একে দর্শক পরিচিত হয় শিল্পীর পরিবার, জীবনবোধ, কর্মস্পৃহা এমনকি ছোট-বড় দুষ্টুমির সঙ্গেও।
এর মধ্যে অবশ্য বেশ কিছু প্রশ্নেরও উত্তর মেলে- শিল্পের ভাষা কী, কিংবা এর উৎস কোথায়, শিল্প কি নিজেই একটা ভাষা নয়, এই ভাষা কি বৈশ্বিক, নাকি দেশকালের সীমায় বাঁধা পড়ে সীমিত হয়ে যায় শিল্পের পরিধি- সব প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য দারুণ এক কেস স্টাডি হতে পারে এই প্রামাণচিত্র। কারণ, দুটো ভিন্ন ভাষা বা সংস্কৃতির কেন্দ্র থেকে মনিরুল ইসলাম সৃজন করে চলেছেন মূর্ত-বিমূর্তের দ্বান্দ্বিক কোলাজ। আর এই সৃজনকর্মের রসদ সংগ্রহ করতে শিল্পী বারবার ফিরে আসেন আপন স্মৃতির দুয়ারে, বাংলার জল-হাওয়ার মাঝে। আর তার অন্বেষায় দর্শক ফিরে যায় তাঁর শিল্পকর্মের কাছে। সব মিলিয়ে এক বিপ্রতীপ ফিরে আসার গল্প এই প্রামাণ্যচিত্র ফেরা।

প্রামাণ্যচিত্রটি দেখা যাবে এখানে

ফেরা
চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: ফাহমিদা আখতার
প্রযোজনা: বেঙ্গল ফাউন্ডেশন
দৈর্ঘ্য: ২৭ মিনিট