মারিশ্যার পথে

ম্যাপটা চোখের সামনে ধরে একবার মনে হলো থাকি না নিরিবিলি খাগড়াছড়ির এই বুনো পরিবেশে আরও কটা দিন। পরক্ষণেই সে ভাবনা উবে গেল খেয়ালি আচরণে। সফরসঙ্গী দুই বন্ধুর কাছে প্রস্তাব রাখলাম। রুট প্ল্যান শুনে দুজনই রাজি। তল্পি গুছিয়ে ছুটলাম মারিশ্যার পথে।

খাগড়াছড়ি থেকেই মোটরসাইকেল, সিএনজি অথবা পর্যটকদের জন্য ভাড়া করা জিপে যাওয়া যায় মারিশ্যা ইউনিয়ন পর্যন্ত। বলে রাখি, কাপ্তাইয়ে বাঁধ দেয়ায় যে বিশাল হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে, স্থির সেই জলরাশির জায়গায় আগে ছিল এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ি এক শীর্ণ নদ। বর্ষায় দু’কূল ছাপিয়ে যে বয়ে চলত খেয়ালি আচরণে তার নাম কাসালং। পার্বত্য জীবনের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে আশির দশকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাপ্তাইয়ে বাঁধ দিলে উজানে জলরাশি আটকা পড়ে। একসময় ডুবে যায় ছোট টিলা। তারপর পাহাড়। এখন যারা রাঙ্গামাটি বেড়াতে গিয়ে শুভলং ঝর্ণা দেখেন, দেখেন স্বচ্ছ নীলচে-সবুজ পানি, তারা আরেকটু এগিয়ে বা লংগদু পর্যন্ত গেলে ডুবে থাকা পাহাড়ের চূড়া দেখতে পাবেন। পাহাড়ি সেই নদীর এখনো উজানে অস্তিত্ব আছে। আমরা দীঘিনালা ছাড়িয়ে বাঘাইছড়ির একটু আগে নেমে গেলাম মারিশ্যার সেই দুঃখী নদীর গল্প শুনতে। বাঘাইছড়ির এখানে একটি সরু নদীর পাহাড়ি চলতি পথের ডানে চলে গেছে এঁকেবেঁকে। এখান থেকে দুটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে চললাম বাকিটা পথ। এককালে মারিশ্যার খুব বদনাম ছিল শান্তিচুক্তির পক্ষে-বিপক্ষের দুই পক্ষের সংঘর্ষের কারণে। এখন শান্ত সুনিবিড় এ পথে চলতে গিয়ে সেসব কথা মনে হয়ে গা বেশ ছমছম করে উঠল। বাইক চালক জানাল বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ আর সংঘাত এখানে রয়েই গেছে। পাহাড়ের মিথ শুনতে শুনতে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম মারিশ্যা ঘাট।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশের রহস্য অরণ্যখ্যাত পাবলাখালী। বুনো হাতির আক্রমণের দুর্নাম আছে জায়গাটার। রোমাঞ্চের আকর্ষণে সেখানে রাত্রিযাপনের ইচ্ছা অনেক দিনের। সে পথে যেতে আমাদের দরকার একটা নৌযান। একটা ট্রলার নিয়ে চললাম পাবলাখালী অভয়ারণ্যের পথে। যাত্রাপথে দুপাশের পাহাড়ি জনপদ আর জীবনাচরণ ভরিয়ে দিল দুচোখ।

হেমন্তের এই নরম প্রকৃতি যেন মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে শীতের আড়ষ্টতার আগে। ঘণ্টা দুয়েক লাগল পাবলাখালী ঘাটে নৌকা আসতে। কাসালং নদের যে পথটুকু আমরা আজ শেষ করলাম কাল সকাল থেকে এর তিন গুণ পথ পাড়ি দিতে হবে। পাহাড়ে অপহরণ আর নিরাপত্তার সমস্যা থাকায় পাবলাখালীতে রাঙ্গামাটি বন বিভাগ রাত্রিযাপনে অনুমতি দিতে আগ্রহী নয়। বিট অফিসার তাই আমাদের দেখে মোটেও খুশি হলেন না। তাকে জানালাম, গেস্ট হাউসে রুম না পেলে আমরা তাঁবু করতে পারি। শুনে ভদ্রলোক বিনা দাওয়াতীদের উপর অবশেষে সদয় হলেন। বলে রাখা ভালো, আমার দেখা অন্যতম সুন্দর গেস্ট হাউস পাবলাখালীর এই বাসস্থান। একটু গুছিয়ে নিলে সত্যি অসাধারণ একটা পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে। পাবলাখালীতে থাকার জায়গা মিললেও ট্রেকিংয়ের অনুমতি পাওয়া গেল না। একজন গানম্যান দিয়ে শেষ বিকেলে বিট অফিসার আমাদের মাত্র কয়েক কিলোমিটার ঘুরে দেখালেন। সুতরাং সেখানে আর বেশি সময় থাকতে আমরা কেউই আগ্রহ বোধ করালাম না।

বিরতিহীন নামের একটা লঞ্চ মারিশ্যা থেকে ছেড়ে আসে এবং ঠিক ৯টায় পাবলাখালী অতিক্রম করে। আমাদের টার্গেট সেই লঞ্চ ধরে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত যাওয়া। এতে সময় বাঁচে অনেক। অর্থও সাশ্রয় হয়। পরিকল্পনা মাফিক ভোরে উঠে ৩ ঘণ্টায় যতটা দূরে যাওয়া যায়, আমরা নিজেরা ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঘুরে নিলাম। ফিরে এসে ঘাটে অপেক্ষা করতে থাকলাম বিরতিহীনের জন্য। অবাক করে বিরতিহীন আসল ঠিক ৯টা ৫ মিনিটে। ছোট ঘাট, তাই লঞ্চ থামায় না, কেবল স্পিড একটু কমিয়ে দেয়। সেই সুযোগে সদরঘাটের মতো ব্যবস্থাপনা চালু এখানে। প্রথমে একটা ট্রলারে চড়তে হয়। সেই ট্রলার লঞ্চের গায়ে ভিড়িয়ে তারপর যাত্রীরা লঞ্চে উঠে যায়। স্থানীয় সংস্কৃতি মেনে আমরাও উঠে পড়লাম ‘পাহাড়ের টাইটানিক’ বিরতিহীনে। রোদের তাপ থাকলেও মৃদু বাতাসে তা গায়ে লাগছে না।

আমরা চলেছি ভাটির দিকে, যেখানে শেষ স্টেশন রাঙ্গামাটি। পথে স্থানীয় তিনজন সহযাত্রী মুরব্বির দেখা পেলাম। তাদের কাছে জানলাম আশির দশকের কৃষি প্রধান অঞ্চলটা তিন দশকে কীভাবে ভোল পাল্টে শিল্পায়ন আর কাঠ ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো। পানির স্তর আর গভীরতা নিয়েও এখানে বেশ মিথ চালু হয়ে গেছে। সাথে আছে অভিশাপ আর বাস্তুচ্যুতির করুণ উপাখ্যান। একসময়ের দুর্গম হাঁটা পথ হারিয়ে আজ তার বুক কেটে চলছে নৌদানব। পায়ে হেঁটে রাঙ্গামাটি যাওয়ার সেই গল্প শোনাও হয়ে গেছে দীর্ঘ যাত্রায়। এরই মধ্যে দুই জায়গায় যাত্রাবিরতি করল বিরতিহীন। একে একে মাইনিমুখ, লংগদু ফেলে শুভলং পর্যন্ত এসে চিনতে পারলাম আগেরবার রাঙ্গামাটি এসে কতদূর ঘুরেছি আর এবার কতটা পথ যাচ্ছি। তুলনার এই অঙ্ক কষতে কষতে পৌঁছে গেছি শহরে।

রিজার্ভ বাজারের এই জায়গাটায় কোলাহল আছে। পাহাড়ি বাজার হিসেবে বেশ জমজমাট। শহর থেকে দুপুরের খাবার শেষ করে একটা সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করে চললাম কাপ্তাই উপজলোয়।

আসাম বস্তি এলাকা হয়ে এই পথটা সত্যি অসাধারণ। এতক্ষণ যে নদ কেটে কেটে এসেছি সেই নদ এখন হ্রদের স্থিরতা নিয়ে আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে। পাহাড়ের পথে তাই কখনো ডানে কখনো বায়ে কাপ্তাই হ্রদ। কৃত্রিম হ্রদের উৎপত্তিস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগল সড়ক পথে। চাইলে ট্রলারেও যাওয়া যায় এ পথটুকু। আপাতত রাত্রিযাপন কাপ্তাইয়ের একটা হোটেলে। পরদিন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখতে বেরিয়ে বিপদে পড়লাম। রাতেই খবর পেয়েছি প্রথম শ্রেণির কেপিআই হওয়ায় এখানে একটু বাড়াবাড়ি রকমের নিরাপত্তা। ঢুকতে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। রাতভর লবিং আর অনুরোধের পর সকালেও বহাল থাকল সে প্রক্রিয়া। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে মিলল অনুমতি। তবে কোনো ক্যামেরা না নেয়ার শর্তে। ভেতরের সৌন্দর্য আর বিশালতা দেখে সত্যি অভিভূত। কী পরিমান পানি কীভাবে গড়িয়ে পড়ছে আর কীভাবে আবারও মিশে যাচ্ছে নদীতে।

বিদ্যুতের টারবাইন দেখতে দেখতে সময় কেটে যাচ্ছে আর পদে পদে সেনাবাহিনীর সদস্যদের তাড়া খেতে হচ্ছে। ভালো লাগল পুরোটাই, তবে থমকে দাঁড়ালাম ভেতরের কোয়ার্টার আর একটা পুরনো স্কুলের সামনে। এখানেই চিত্রায়িত হয়েছিল বিখ্যাত ট্রাজিক ছবি ‘ছুটির ঘণ্টা’। আফসোস! মাত্র দুই ঘণ্টার অনুমতি না থাকলে বেশ কিছুটা সময় কাটানো যেত ঐতিহাসিক জায়গাটায়। হুড়মুড় করে সময়মতো গেট পেরিয়ে পাস জমা দিয়ে এলাম। হাঁটতে হাঁটতে বসলাম কাপ্তাই হ্রদের এক অখ্যাত কিনারে। ভাবছি, কাপ্তাইয়ের স্থির জলরাশির নিচে ডুবন্ত পাহাড় এখন আর দেখা যায় না সত্যি। যেমন দেখা যায় না অবকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে চাপা পড়া লঞ্চের সেই পাহাড়ির আফসোস আর দীর্ঘশ্বাস।