মীন ও মনুর কিচ্ছা

ভোর না হতেই হাকডাক হইচই শুরু। মাছ ধরা ট্রলারগুলো একে একে ঘাটে ফেরে। মহাজনরা ব্যস্ত ভঙ্গিতে বুঝে নেয় মাছের ভাগ। এর সঙ্গে যোগ দেয় সর্বস্তরের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ভোক্তাগণ। মহাজনের কাছে মাছের ডালি হস্তান্তর, নিলাম ডাকা, সবমিলে এক এলাহি কারবার। এ সবই চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটের রোজকার দৃশ্য।

 

 

 

বাংলাদেশের অন্যতম বড় মাছের বাজার- চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট। ১৯৬৪ সাল থেকে আজ অবধি এ ঘাটটি ঘিরে ঘুরছে এখানকার অর্থনীতির চাকা। মৎসব্যবসাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য পেশার লোকজন জড়ো হওয়াতে এর সামাজিক গুরুত্বও ব্যপক। হাজার হাজার মাঝি, জেলে, বরফ ব্যবসায়ী এবং মাছ ব্যবসায়ী এই ঘাট ও বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই মাছ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে যে কর্মযজ্ঞ দিনরাত্রি চলছে তা সত্যি দর্শনীয়।

সরগরম মাছের আড়ত

জেলের দল ঘাঁটে আসার পর তাদের মূল কাজ মহাজনকে সাহায্য করা। মহাজনের কাছে মাছ হস্তান্তর হওয়ার পর শুরু হয়ে যায় নিলাম ডাকের খেলা। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাছের আধিক্য দেখা যায়। আবার বিভিন্ন জলস্তরের মাছ শিকার করার ওপর নির্ভর করে জেলেদের মধ্যেও দেখা যায় কয়েকটি ভাগ। সে অনুযায়ী জালেরও আছে শ্রেণিবিভাগ। সাধারনত এই ঘাটে দুই ধরনের জাল দেখা যায়- ভাসান জাল ও ডুব জাল। ভাসান জাল সাগরের উপরের স্তরের মাছ এবং ডুব জাল গভীর জলের মাছ ধরার জন্য ব্যবহার হয়।

একের জীবন অন্যের জীবিকা

টনকে টন জাল নিয়ে এক একটি ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার যাত্রা করে। এক একটি ট্রলারে সর্বনিম্ন ৮-১০ জন, সর্বোচ্চ ১৭-২০ জন কাজ করে। এদের সর্দার হলো মাঝি। ৩০০-৫০০ মন মাছ এক একটি ট্রলারে ধরা পড়ে। এই শতশত মনের মাছ এই ঘাট ও বাজারের মধ্যমণি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গার মাছ ব্যবসায়ীরা এই ঘাটে আসে এবং বিভিন্ন ট্রলার ও ঘাট হতে কেনাবেচা শুরু করে। মাছ কেনার পর সেগুলোকে বাজারজাত করার জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

জালের মায়ায় জীবনের বুনন

বরফ এখানে আপরিহার্য। তাই এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বরফের কল। বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিজেরা বরফ কিনে নিজেরাই প্রক্রিয়াজাত করে। বড় বড় মাছব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্রক্রিয়াজাত করণের দোকানের ওপর নির্ভর করে। এই দোকানগুলতে আধিকাংশ নারী ও শিশু শ্রমিক কাজ করে।

এখানেই সকাল হয় মৎস-শ্রমিকের

মাছ প্রক্রিয়াজাত করণের পর দূরদূরান্তে পাঠানোর জন্য দুরপাল্লার হিমায়িত গাড়ি ব্যবহার করা হয়। এই বাজারের পাশেই একটি হিমাগার আছে অনেক ব্যবসায়ী হিমাগার ভাড়া নিয়ে মাছ জমা রাখে। পাইকারি দরে মাছ কেনা যায় তাই চট্টগ্রামের অনেক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিয়ের মাছ এই বাজার থেকেই সংগ্রহ করা হয়।

বেলাশেষ। পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

ট্রলারগুলো খালি হওয়ার পর মাঝিরা পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। পুরনো ক্ষতিগ্রহস্ত জালগুলো মেরামত করে ট্রলার ধুয়েমুছে নতুন করে তৈরি করে নতুন স্বপ্নের জন্য। কণফুলি নদী ও অগভীর সাগর ঘিরে এ এক নৈমিত্তিক গল্প।

 

ছবি: লেখক