মুক্তাগাছার রাজবাড়ি

ময়মনসিংহ জেলার কোল ঘেঁষে মুক্তাগাছার অবস্থান। এটি ময়মনসিংহ জেলার পশ্চিমে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি উপজেলা। ময়মনসিংহ শহর থেকে মুক্তাগাছা উপজেলা সদরের দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার। মুক্তাগাছার মোট আয়তন ৩১৪.৭১ বর্গকিলোমিটার। মুক্তাগাছা থানা সৃষ্টি হয় ১৯৬১ সালে এবং থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৩ সালে।

মুক্তাগাছার নামকরণ ও এর উৎপত্তি সম্পর্কে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। জমিদার আচার্য চৌধুরীর বংশ মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন করে বলে জানা যায়। তাঁরা শহরের গোড়াপত্তন করে এখানেই বসতি স্থাপন করেন। আচার্য চৌধুরী বংশের প্রথম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী ছিলেন বগুড়ার বাসিন্দা। তিনি মুর্শিদাবাদের দরবারে রাজস্ব বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তিনি ছিলেন নবাবের খুবই আস্থাভাজন। নবাবের দরবারে রাজস্ব বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১১৩২ সালে তিনি সে সময়ের আলাপসিং পরগনার বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে মুক্তাগাছা শহরসহ মুক্তাগাছা উপজেলার বেশির ভাগই ছিল তৎকালীন আলাপসিং পরগনার অন্তর্ভুক্ত।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নানা কারণে শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর চার ছেলে রামরাম, হররাম, বিষ্ণুরাম ও শিবরাম বগুড়া থেকে আলাপসিং এসে বসবাসের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বসতি স্থাপনের আগে তারা এ পরগনার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন এবং বর্তমান মুক্তাগাছা এলাকায় বসতি স্থাপনের জন্য মনস্থির করেন। সে সময় আলাপসিং পরগনায় খুব একটা জনবসতি ছিল না। চারদিকে ছিল অরণ্য আর জলাভূমি। শ্রীকৃষ্ণ আচার্যের চার ছেলে ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদী আয়মানের তীরবর্তী স্থানে নৌকা ভিড়িয়ে ছিলেন। তারা যে স্থানে নৌকা ভিড়িয়ে ছিলেন, সে স্থানকে এখন পর্যন্ত রাজঘাট নামে ডাকা হয়। রাজঘাটে নৌকা ভেড়ানোর পরবর্তী সময়ে এলাকার অধিবাসীরা সে সময়ের প্রথা অনুযায়ী জমিদারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী নজরানা দেন। সে সময়ে উল্লিখিত স্থানটির নাম ছিল বিনোদবাড়ী। বিনোদবাড়ীর বাসিন্দারা ছিলেন প্রান্তিক চাষি ও জেলে। জমিদারদের যারা নজরানা দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মুক্তারাম কর্মকার নামের এক ব্যক্তি তার নিজের হাতের একটি পিতলের গাছা বা দীপাধার জমিদারদের নজরানা দেন। জমিদাররা মুক্তারামের ‘মুক্তা’র সঙ্গে ‘গাছা’ শব্দটি যোগ করে বিনোদবাড়ীর পরিবর্তে জায়গার নামকরণ করেন মুক্তাগাছা। সেই থেকে মুক্তাগাছা নামকরণটি চলে আসছে।

ইন্দো-ইউরোপীয় ধ্রুপদী বৈশিষ্ট্যের আদলে তৈরি করা হয়েছিল এই রাজবাড়ি

মুক্তাগাছার এসব জমিদার ঊনবিংশ শতাব্দীতে মুক্তাগাছা ও এর আশপাশের অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। মুক্তাগাছার এসব জমিদারই তাদের বসবাসের জন্য তৈরি করেছিলেন এক অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদ, যা ‘মুক্তাগাছার রাজবাড়ি’ নামে জনসাধারণ্যে পরিচিত! মুক্তাগাছার জমিদার বংশের বিভিন্ন সময়ের জমিদাররা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই রাজবাড়ির একেকটি অংশ তৈরি করেছিলেন। এভাবেই গড়ে উঠেছিল মুক্তাগাছার এই সুবিশাল রাজবাড়ি বা জমিদারবাড়ি। প্রায় ২০ হেক্টর আয়তনের এই রাজবাড়িতে আছে ছোট-বড় অসংখ্য প্রাসাদ, মন্দির, পুকুরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এই রাজবাড়ি মূলত ইন্দো-ইউরোপীয় আধুনিক ধ্রুপদি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল।

রাজবাড়িতে ঢোকার জন্য রয়েছে এক বিশাল তোরণ, এককথায় রাজতোরণ! সেই রাজতোরণ দিয়ে ঢোকার পরই চোখে পড়বে চারপাশে ইমারতের স্থাপনায় ঘেরা এক টুকরো উঠোন। এ সময় স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি আটকে যায় রাজবাড়ির ইমারতের স্থাপনায় ফুটিয়ে তোলা অসাধারণ নকশায়। রাজবাড়িতে বসবাসকারী জমিদারদের সুরুচি আর তৎকালীন রাজমিস্ত্রিদের দক্ষতার নীরব সাক্ষী যেন এসব নকশা। আরও কিছুটা ভেতরের দিকে গেলে দেখতে পাওয়া যায় রাজবাড়ির স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম আকর্ষণ ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ’! পাঠক বোধহয় অবাক হচ্ছেন আমার কথা শুনে। কিন্তু সত্যিই এই স্থাপনায় তৎকালীন সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল! বর্তমানে এই রাজবাড়ির একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত হচ্ছে। এই সংরক্ষিত অংশটুকু আঞ্চলিকভাবে ‘চার আনা’ নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই ‘চার আনা’ নির্মিত হয়েছিল। কালের সাক্ষী হিসেবে তাই যেন আজও টিকে আছে এই রাজবাড়ির অপরূপ স্থাপত্যশৈলী! পাঠক, একবার না হয় দেখেই আসুন মুক্তাগাছায় অবস্থিত এই রাজবাড়ি। আর বাড়তি পাওনা হিসেবে আপনার রসনাকে তৃপ্ত করার জন্য মুক্তাগাছার সুপ্রসিদ্ধ ‘মণ্ডা’ তো থাকছেই!

কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে ধ্বংসাবশেষ

কীভাবে যাবেন : মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে মুক্তাগাছা যাওয়ার সরাসরি বাস আছে। সড়কপথে ঢাকা থেকে মুক্তাগাছা যেতে সময় লাগবে তিন-চার ঘণ্টা। সকালে রওনা দিলে সারা দিন মুক্তাগাছা ঘুরে সন্ধ্যা নাগাদ আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতে পারবেন। তবে ভালোভাবে ঘুরে দেখতে চাইলে দু-তিন দিন সময় নিয়ে যাওয়াটা উত্তম। তাহলে মন ভরে উপভোগ করতে পারবেন মুক্তাগাছার অভিজাত রাজবাড়ি।