যে কারণে এবছর হচ্ছে না ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব’

২০১২ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রতি বছর নভেম্বর মাসের শেষে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব’। দেশ ও বিদেশের বিখ্যাত পণ্ডিত ও শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা শুনতে প্রতিবছর লাখো মানুষ হাজির হতো উৎসবের ভেন্যু আর্মি স্টেডিয়ামে। কিন্তু আজ সকালে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয় যে এ বছর ভেন্যু বরাদ্দ না পাওয়ায় এ উৎসব আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধাণীর একটি হোটেলে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব আবুল খায়ের, মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, কালি ও কলম এর সম্পাদক আবুল হাসনাত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।

এবছর উৎসব আয়োজন করা সম্ভব হবে না জানিয়ে আবুল খায়ের বলেন, ‘এবার উৎসবের প্রস্তুতি শুরু করার পর আমরা আর্মি স্টেডিয়াম ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলাম। কিন্তু সেনা ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড গত ৩১ আগস্ট এক চিঠিতে জানায়, ওই সময় পোপের বাংলাদেশ সফরের সূচি থাকায় আর্মি স্টেডিয়াম বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়।’

মূলত, আন্তর্জাতিক মানের এ উৎসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা শেষ করতেই আট মাস সময় লেগে যায়। সেজন্য নিবিড়ভাবে সবকিছু সমন্বয়ের পর পরিকল্পনা পরিবর্তন বা সংকোচন সম্ভব হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছরের উৎসবের যে চরিত্র দাঁড়িয়েছে, তাতে ভেন্যু পরিবর্তন করলে সেটি বিপন্ন হবে।’

উপস্থিত সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব করতে আমাদের অনুমতি না দেওয়া হলেও দেশ হিসেবে আমাদের এই অর্জন যেন হারিয়ে না যায়।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে যেন এরকম উৎসবের আয়োজন করা হয়। সেজন্য বেঙ্গল ফাউন্ডেশন যতখানি পারবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে। কারণ আমরা মনে করি, একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে উচ্চাঙ্গসংগীতের মতো সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত রাখা জরুরি।’

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। এবছর উৎসব আয়োজন না করলেও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নিয়মিত সব কার্যক্রমে কোনো ব্যঘাত ঘটবে না বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের অন্যান্য কার্যক্রম থামাচ্ছি না। শুধু এবছর উৎসবটাই হচ্ছে না।’

সংবাদ সম্মেলনে সরোদে একটি রাগ পরিবেশন করেন বেঙ্গল পরম্পরা বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী ইলহাম ফুলঝুরি খান

এসময় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করা হয়। এই বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, প্রতিবারের মতো এবছরও গোড়ার দিকে আর্মি স্টেডিয়াম বরাদ্দের জন্য সেনা ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের কাছে আবেদন করা হয়। এদিকে আগস্ট মাসের মধ্যে ভারতের প্রথম সারির উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী, বাংলাদেশের নবীন ও প্রবীণ শিল্পী এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও যাত্রার তারিখ নির্ধারণসহ সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। সেনা ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড কর্তৃপক্ষ তাঁদের ৩১ আগস্ট তারিখের চিঠিতে মাননীয় পোপের সফর উপলক্ষে প্রার্থিত সময়ে (২০ থেকে ২৮ নভেম্বর) আর্মি স্টেডিয়াম বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয় বলে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করে। তবে, নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় যে পোপ মহোদয়ের আগমনের তারিখ ৩০ নভেম্বর অর্থাৎ উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব শেষ হবার দুদিন পর এবং তাঁর প্রধান অনুষ্ঠানটি আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তখন ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে ভেন্যু বরাদ্দের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য সেনা ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের কাছে আবেদন করা হয়। এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিগত পাঁচ বছর একই নিয়মে নির্ধারিত ভাড়া জমা দিয়ে আর্মি স্টেডিয়াম বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এ বছর জায়গার বিষয়টি সময়মতো মীমাংসা না হওয়ায়, কাজ এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে ইতোমধ্যে বিকল্প স্থান চিহ্নিত করে এর ভিত্তিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে বিদেশী শিল্পীদের অংশগ্রহণের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়। এই সুবাদে জাতীয় রাজস্ব বিভাগে নির্ধারিত করও জমা দেওয়া হয়। তবে বিকল্প স্থানটিতে সারারাত অনুষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি পাওয়া যায়নি।

সেপ্টেম্বর মাসে অর্থাৎ সাত মাস নিবিড়ভাবে সমন্বয়ের পর পরিকল্পনা পরিবর্তন বা সংকোচন সম্ভব নয়। কারণ, তার ফলে বিগত পাঁচ বছরের চর্চায় উৎসবের যে চরিত্র দাঁড়িয়েছে তা বিপন্ন হবে বলে মনে করছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। একই কারণে স্থান পরিবর্তনহেতু তারিখ, সময় বা অনুষ্ঠানের পরিধি সংকোচন বা শিল্পী পরিবর্তন কোনটিই এ পর্যায়ে সমীচীন বলে মনে করছে না তারা।

এছাড়া বিদেশী শিল্পীদের জন্য সরকারের আর্মি স্টেডিয়াম একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। আর তাই চূড়ান্ত পর্যায়ে বিকল্প ভেন্যু বিবেচনার কোনো অবকাশ নেই বলেও জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণার পাশাপাশি বিভিন্ন একক ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন বেঙ্গল পরম্পরা বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থীরা। বিগত পাঁচটি উৎসবের বিভিন্ন মহূর্ত স্মরণ করে নির্মিত ভিডিওচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।