রঙদার ঢাকা, সমঝদার ঢাকা

যে শহরের জন্মই ঢাকের বাদ্যে, সে শহর তো সংগীতের নানা আয়োজনে ছেয়ে-ঢেকে থাকবেই। হ্যাঁ, মোঘল সুবাদার ইসলাম খান চিশতীর আমলে ধলেশ্বরীর তীরে বিজয়ী সেনাপতি যে নতুন রাজধানীর গোড়াপত্তন করেছিলেন তার নামকরণ জড়িয়ে যায় এক ‘অনার্য’ বাদ্যযন্ত্রের নামের সঙ্গে। বার ভূঁইয়াদের সোনারগাঁও থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে নতুন নগরের সীমানা নির্ধারণ করা হয় জয়ী সেনাদলের জয়ঢাকের বাদ্যে। এ শহর তাই জন্মাবধি সংগীত আর সমঝদারদেরই শহর।

ষোলো শতকের আগে ঢাকার পরিচিতি ছিল মূলত সীমানা চৌকি আর মসলিনের জোরদার বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে। মলমল খাস মসলিনের জ্বলজ্বলে চাহিদায় প্রলুব্ধ হয়ে দিল্লির মসনদের রসজ্ঞ বাদশাহ জাহাঙ্গীরের বাংলা জয়ের পেছনেও রেখেছে বড় ভূমিকা। প্রণম্য আচার্য ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র মতে, প্রাচীনতম বাংলা পদকর্তাদের অন্যতম ‘আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’র ভুসুকু পা নিশ্চিত পদ্মাপাড়ের ‘ছাওয়াল’। সেই ৮ম শতক থেকে বঙ্গে মুসলিম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত বৃহত্তর বিক্রমপুরে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই হয়েছে কলাচর্চা। তবে প্রয়োজনীয় লিখিত প্রমাণ যৎকিঞ্চিৎ। আর তাইতো আজকের পাঠকের কাছে ঢাকার সাংগীতিক ঐতিহ্য বিনির্মাণে এই আবেগী জনপদের সাথে ন্যায়ানুগ থাকা প্রায় অসম্ভব। পালযুগে তান্ত্রিক সাধনার নিদর্শন হিসেবে যে পদ পাওয়া গেছে তা কণ্ঠসংগীত। সিদ্ধাচার্যরা গানের মধ্য দিয়েই তাদের দর্শন, আচার এ দেশের লোকায়ত জীবনে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাগদীদের রণসংগীত ‘আগডুম বাগডুম/ ঘোড়াডুম সাজে’ আজও ছড়িয়ে আছে ছেলেভুলানো কথকতায়। এরপর কর্নাটক থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী সেনদের আগমন এবং ধর্মসংগীতের প্রচার-প্রসার। পাল যুগের শেষ সন্ধ্যায় সন্ধ্যাকর নন্দীর কলমে রামচরিত কিংবা হলায়ুধ মিশ্রের শেক শুভোদয়া ব্যতীত আর কোনো কাহিনীকাব্যই কালের বিস্মৃতির গহ্বর থেকে রক্ষা পায়নি। বিবেচনায় রাখতে হবে যে, এ সমস্ত কাহিনীকাব্যই কয়েক রাত ধরে পর্যায়ক্রমে গীত হতো।

পরিবর্তনের প্রথম ঢেউটা ওঠে ১২ শতকে। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের উৎসাহে এ সময়ে রাঢ় অঞ্চলে শুরু হয় কলাচর্চা। গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের সময়ে এই চর্চার বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। চীনা সন্যাসী মা হুয়ানের বর্ণনায় সোনারগাঁওকে তাই আরব্য রজনীর বাগদাদ বলে ভ্রম হয়। ফারসি চর্চা আর সরগমের যুগলবন্দীতে দিল্লিতে যখন আমির খসরুর হাতে ব্রজবুলি অর্থাৎ হিন্দুস্তানি ভাষাতে শুরু হয়েছে হিন্দুস্তানি সংগীত, ঠিক সেসময়েই বাংলায় লোকজ সুরের আউল ধ্বনিতে চলছে বৈষ্ণব পদচর্চা। নিয়ত দিল্লির দরবারি শক্তির সঙ্গে লড়ে চলেছে যে আজলাফ মুসলমান আর অন্ত্যজ শ্রেণি তার গানের ভাষাও তাই হয়ে উঠেছে নিজস্ব। চণ্ডীদাসেরা তাই প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে গাইছেন ‘মেরেছ কলসির কানা/তাই বলে কি প্রেম দেবো না?’ তাই পথে পথে ছড়িয়ে দেওয়া অমূল্য সেই রতন মানিকের নিদর্শন জিয়াউদ্দিন বারনি কিংবা ইবনে বতুতার রেহেলায় পাওয়া যায় না। যদিও তাদের লেখায় বৃহত্তর ঢাকা অর্থাৎ সোনারগাঁওয়ের উল্লেখ আছে বারংবার।

জগৎখ্যাত মসলিনের সূতিকাগার আর শিল্পনগরী হিসেবে ঢাকায় শুরু থেকেই শ্রেষ্ঠী, বণিক আর ভাগ্যান্বাষীর হট্টরোল। মসলিন ও তাঁত- এই দুই কুটিরশিল্পের সঙ্গে জলজ শীতলক্ষ্যার তীরের সং যাত্রাও এক নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে বিদ্যমান। এ অঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় সং বের করার ঐতিহ্য এমনকি শহর ঢাকার পত্তনেরও পুরনো। এসব মেলায় বিভিন্ন মহল্লা থেকে আসতো সংয়ের দল। হতো গানের লড়াই। বিনোদনই ছিল এসব মেলার মূল উদ্দেশ্য। মির্জা নাথন সাক্ষ্য দেন, ১৬০৮-এ ঢাকায় আনাগোনা ছিল প্রায় ১২শ’ কাঞ্চনী ও সেবিকার। এরা ছিলেন নৃত্যগীতে পটিয়সী। স্বভাবতই সদ্য ঢাকায় পৌঁছানো এক সেনাদলের সঙ্গে দুয়েকজন রঞ্জিকা থাকলেও হাজার-বারোশ লীলাবতী থাকা প্রায় অসম্ভব। তার অর্থ এই যে, ঢাকায় নৃত্যগীতে পটিয়সীদের কদর ছিল এবং মোঘল রাজধানী হওয়ার আগে থেকেই শহরের রাস্তার সঙ্গে তাদের জান-পাহেচানও ছিল।

এই ঐতিহ্য আরও মজবুত হয় শাহ সুজা ও শায়েস্তা খানের আমলে। ভোগী পুরুষ শাহ সুজা বড় ভাই দারা শুকোর মতো শাস্ত্রজ্ঞ না হলেও সমঝদার হিসেবে খ্যাত ছিলেন। মীর জুমলা আর শায়েস্তা খানের সময়ে আসাম আর আরাকান নিয়ে টানা লড়াই আর আওরঙ্গজেবের একগুঁয়ে সাত্ত্বিকতায় শুধু বাংলা কেন, পুরো ভারতেই কলা চর্চার এক ভয়াবহ দুর্দিন গেছে। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে বাহাদুর শাহের সময়ে। কিন্তু ততদিনে সুবা বাংলার দেওয়ানির ইজারা মুর্শিদ কুলি খানের হাতে। কঠোর ধার্মিক ও নিয়মিত খাজনা পাঠানোর রেকর্ড থাকায় যে দেওয়ানের সাথে বিবাদে জড়িয়ে এমনকি শাহজাদা আজিমুশশানকেও পাততাড়ি গুটিয়ে ঢাকা থেকে পাটনা চলে যেতে হয়েছে। নবাব হয়ে মুর্শিদ কুলি প্রথমেই রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেলেন মুর্শিদাবাদ। আর এই সিদ্ধান্তের ফলে কদরদান মোঘল অভিজাতদের বদলে ঢাকার সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব চলে এল বণিকদের কাছে। ডাচ, আরমেনীয় আর ফরাসি বণিকেরাই তখন ঢাকার উঠতি পয়সাওয়ালা আর শিল্প-সাহিত্যের কদরদার। মুর্শিদ কুলি আর আলিবর্দীর সমসাময়িক মাহমুদ শাহ রঙ্গীলার দরবারে যখন হিন্দুস্তানি কলার রমরমা তখন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় চলছে নিয়ত পালাবদল। মারাঠা বর্গি আর মগ-ফিরিঙ্গিদের সাথে যুঝছে বাংলা। তাই উত্তরপ্রদেশ আর দক্ষিণাত্যে যখন সংগীত টানা পৃষ্ঠপোষণা পেতে শুরু করেছে, ওই সময়ে বাংলায় সে অবহেলিত। সিরাজের কুচক্রি খালা ঘষেটি বেগমের সময়ে ঢাকার মতিঝিল আর জিনজিরার প্রাসাদে নিয়মিত জলসার হদিস রিয়াজিস সালাতিনে পাওয়া যায়। তবে ক্ষমতার পালাবদলে প্রদেশ সরাসরি কোম্পানির শাসনে থাকায় স্বাধীন শাসকের অধীনে রামপুর কিংবা মুলতানে যেভাবে একটি ঘরানা গড়ে উঠেছে তা ঢাকায় হয়ে ওঠেনি। অতকিছুর পরও ঢাকায় তখন ঠিকই গড়ে উঠেছে রসবোধসম্পন্ন এক শ্রেণি- কোম্পানির প্রথম যুগেই যাদের বিকাশ, বৃত্তিতে তারা ছিলেন ব্যবসায়ী। তাদের প্রবল উৎসাহেই শুরু হয় মহররম আর জন্মাষ্টমীর মিছিল। হোলি আর ঈদে হতো সংগীত উৎসব। হোলি তখন প্রায় সার্বজনীন। কট্টর সুন্নিরা বাদে আবীর খেলায় মজত সবাই। নবাব স্যার আব্দুল গনির সময় আহসান মঞ্জিলের প্রাঙ্গণে হোলির গানের ‘কল শো’ হতো। হতো লাউনি প্রতিযোগিতা। সেহেরিতে ঢাকার মানুষের ঘুম ভাঙতো গানের সুরে।

ঢাকার রইসরা তবলা বাদনে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। বিশেষ করে আহসান মঞ্জিলের খাজাদের এ ব্যাপারে সুনামও ছিল। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্’র দরবারের তবলাবাদক হোসেন বখ্শের ছেলে আতা হোসেন ঢাকায় ছিলেন দীর্ঘদিন। যন্ত্রসংগীত কলাকারেরা এ সময় ঢাকায় স্থায়ী হতে শুরু করেন। মিঠ্ঠন খান ছিলেন এই যুগের অন্যতম। হাসন, তানের গায়ক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। আলী আহমদ খান, কাশেম আলি খান ছিলেন পেশাদার গায়ক। ঢাকার এলিট সমাজের চাবি বণিকদের কুর্তার গিঁটে সেঁটে থাকায় সাংস্কৃতিক জীবনে তবায়েফদের গুরুত্বময় অংশগ্রহণ ছিল।

উনিশ শতকে নবাব নুসরত জং, নবাব শামসুদ্দৌলা, নবাব কমরুদ্দৌলা ও নবাব আবদুল গনি’র সময়ে বাইজীদের প্রচুর আনাগোনা ছিল। নিয়মিত মাসোহারা পেতেন তারা। জিন্দা বাজার, ফুলবাড়িয়া ও সিদ্দিক বাজার ছিল এ সময়ের রসমণ্ডিত রঙ্গালয়। এলাহী জান, ওয়াসু, পান্না, আন্নু, নওয়াবীন আর গহরজানেরা ছিলেন ঢাকার তৎকালীন বিনোদন জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ। ঢাকার সংগীতের ইতিহাসে অনস্বীকার্য ভূমিকা আছে হিজড়াদেরও। ঢোল বাজিয়ে গান করতেন তারা।

রানীর রাজত্বের রাজধানী কলকাতা হওয়ায় ঢাকার অর্থনৈতিক ভূমিকা ব্রিটিশ শাসনের সময়ে খানিকটা  অবহেলিতই হয়। উনিশ শতকের শেষভাগে রাজা কালী নারায়ণ রায় বাহাদুর, নবাব খাজা আহসানউল্লাহ ও বাবু কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর সহযোগিতায় ঢাকায় স্থাপিত হয় সংগীত বিদ্যালয়। ভাওয়াল রাজবাড়ি, জয়দেবপুর রাজবাড়ি, মুরাপাড়া রাজবাড়ি, রূপলাল হাউস আর আহসান মঞ্জিল হয়ে ওঠে পৃষ্ঠপোষকতার কেন্দ্র।

গত শতকটা কবিদের যুগ। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুল প্রসাদ আর রজনীকান্তের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির যে চর্চা আরম্ভ হয় তার প্রভাব ঢাকাতেও পড়ে। কাজী নজরুল ইসলাম আর জসীম উদ্দীনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আর আব্বাসউদ্দিন ও আবদুল আলীমের সুরেলা গলায় পল্লীর সহজ গানের পুনর্জাগরণ ঘটে। এর মাঝেই ১৯৩৯ সালে ঢাকায় স্থাপিত হয় বেতার কেন্দ্র। বেতারে বাংলা গান অবহেলিত হলেও হিন্দুস্তানি সংগীত প্রচারে নতুন উদ্যম দেখা যায়। দেশভাগের ফলে কীর্তন গায়কদের অনেকে ভারত চলে গেলেও মুহাজির হয়ে উত্তর ভারত থেকে একটা বড় গোষ্ঠী এদেশে আসেন। ওদিকে ওস্তাদ আলাউদ্দিন ও আয়েত আলি খানের মাধ্যমে প্রসার ঘটে যন্ত্রসংগীতের। উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন টঙ্গীর বাজি গোষ্ঠীর যাদব আলী, সাদেক আলী। এঁদের বাইরে গোয়ালিয়র ঘরানার তালিম নিয়ে আসেন গুল মোহাম্মদ খান। যার শিষ্য ছিলেন লায়লা আরজুমান্দ বানু, মুন্সি রইসউদ্দিন প্রমুখ। ব্রিটিশ যুগের রইসদের জায়গায় পাকিস্তান আমলে কলাবিদদের পৃষ্ঠপোষণের দায়িত্ব নেয় বেতার। সেকালের গুণীরা সকলেই ঢাকা বেতারের বাঁধা শিল্পী ছিলেন। তার মাঝেই নাগরিক উদ্যোগে গড়ে ওঠে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি আর ছায়ানট। প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতচর্চায় বুলবুল চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক আর বারীন মজুমদার তৈরি করেন ঢাকা তথা ভবিষ্যতের নতুন সাংগীতিক কাঠামো। জাতীয়তাবাদী চেতনায় উন্মুখ হয়ে আলতাফ মাহমুদ আর সুরেন দাসেরা গড়ে তোলেন জনগণের গানের দল। আখতার সামদানী ঢাকার শ্রোতাদের পরিচয় করিয়ে দেন ওস্তাদ আমির খানের গায়কির সঙ্গে।

মোঘল যুগ থেকে ঢাকার সংগীতের বিবর্তনের কালিক পরিক্রমার অনন্য এক উপাদান ঢাকার বন্দিশ। ফারসি, হিন্দুস্তানি, উর্দু হয়ে এ সংগীত আজ বাংলা বাণীতে গীত হয়।

স্বাধীনতার পর আরেক পালাবদল। বলা চলে, নতুন পর্ব শুরু এসময়। লোকজ সহজ সুর আর রাগপ্রধান কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে বাংলার সংগীত নিজস্ব কাঠামোপ্রাপ্তির দিকে এগোতে থাকে। যে জীবনবোধ, যে জীবন-দর্শন, যে সৌন্দর্য নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের গানের ‘অবয়ব’, তাতে আরও একটি পালক যোগ করেছে আমাদের উচ্চাঙ্গসংগীত তন্নিষ্ঠতা।