রসকাহন

শীত আসতে না আসতেই মাঠের পর মাঠ সোনারাঙা ধান, গোলা ভরা সোনালি শস্য আর খেজুর গাছে ঝুলানো ছোটো ভাঁড় পরিপূর্ণ হয় রসে। ভাটি বাংলার পালা-পার্বণের সাথে জড়িয়ে আছে খেজুরের রস। অগ্রহায়ণ, পৌষ মানেই হলো খেজুরের রস আর পিঠে-পুলির মস্ত আয়োজনে ভরা মৌসুম। যশোর-খুলনায় আজও শোনা যায় সেই গান- ‘ঠিলে ধুয়ে দে বউ গাছ কাটতি যাব/ খাজুর গাছে চোমর বারুইছে/ তোরে আইনে দেব/ সন্ধের রস ঝাড়ে আইনে / জাউ নান্দে খাব।’

 

বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোর, ফরিদপুর, খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চল, পাবনা-রাজশাহী আর ময়মনসিংহে খেজুরের রসের কদর বেশি। প্রবাদও আছে- যশোরের যশ খেজুরের রস। তবে ইটভাটার কাঁচামাল হয়ে সেই খেজুরগাছই এখন বিরল আর রস তো বিরলস্য!

রস আহরণের জন্য হাতে দা আর কোমরে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছে উঠে নিপুণ হাতে গাছচাঁছা-ছোলা করতে হয়। পরে ছোলা স্থানে বসানো হয় নল। আর সেই নল বেয়ে নেমে আসে সুস্বাদু রসধারা। কাকডাকা ভোর থেকে সকাল ৮-৯টা পর্যন্ত গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে দুপুর পর্যন্ত জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। কেউ কেউ আবার গুড় থেকে পাটালি তৈরি করে বিক্রির জন্য। অনেকে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আরেক দফায় রস সংগ্রহের জন্য গাছে গাছে কলস বাঁধে। প্রতিবার গাছ কাটার পর রস পাওয়া যায় মোটে দুই-তিন দিন। প্রথম দিনের রসের নাম জিরান কাট। সুমিষ্ট এ রসে হয় ভালো পাটালিও। দ্বিতীয় দিনের রসকে দেকাট আর তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাট। রসের জন্য একবার গাছ কাটার পাঁচ-ছয় দিন পর আবার ওই একই গাছ কাটা যায়। এভাবেই অগ্রহায়ণ থেকে পৌষের ব্যস্ত সময় পার করে গাছিরা। আর যারা খেজুরের গুড় বানায় তাদের বলে গুড়শিল্পী বা শিউলি।

আদতে রস আহরণের পুরো প্রক্রিয়াটার সাথে জড়িত থাকে ক্ষেতমজুররাই। হেমন্তের ধানকাটা শেষে এদের অধিকাংশেরই কাজ থাকত না ক্ষেতে। ঐতিহাসিকভাবেই এই সুযোগে মহাজনের দাদন ব্যবসা চালু থাকত। ফলে মহাজনের নির্ধারিত দামেই গুড় বিক্রি করতে হয়েছে গাছি আর শিউলিদের। রস নিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্রর এক অনবদ্য গল্প আছে, যা সওদাগর নামে বোম্বের সিনেমায় দারুণভাবে চিত্রায়িতও হয়। বাঙালির চিরচেনা এক গ্রাম ও সেখানকার বাসিন্দাদের কলা ও কারবারের কাহিনী নিয়ে এক অনন্য ত্রিভুজ। শীতকাল, প্রকৃতির অমৃত উপাদান খেজুরের রস, মোতালেফ-ফুলবানু-মাজুর সংসার যাত্রা, সঙ্কট পাড়ি দেওয়ার বিষয়ের পাশে সেথায় এক অন্যরূপে প্রতিভাত হয় বিভাগপূর্ব নিম্নবিত্ত মুসলমান সমাজ।

শীতের আগমনে মধুবৃক্ষ খেজুর গাছের কদর অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায়। তবে এখন আর বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে আগের মতো মাঠজুড়ে অসংখ্য খেজুরগাছ দেখা যায় না। একসময় খেজুর রসের যে সমারোহ ছিল তা কমে যাচ্ছে। শীতের সকালে রস বিক্রেতাদের ভাড় কাঁধে নিয়ে খেজুরের রস বিক্রি করা ছিল গ্রাম্য জীবনের পরিচিত দৃশ্য। কালের পরিক্রমায় সেই দৃশ্য আগের মতো আর দেখা যায় না। তবে এখনও আমরা হারাইনি আমাদের আবেগময়তার সবটুকু। সংখ্যায় কমে গেলেও গাছিরা এখনও সংগ্রহ করে জিরান কাট আর নতুন পাটালি চলে আসে মাতামহী আর পিতামহীর স্নেহ মেখে। গ্রামের কন্যা-বধূদের রস জ্বালিয়ে পাতলা, ঝোলা, নলেন আর দানাগুড়ের পাশাপাশি চলে পাটালি তৈরির অনুপম কাব্যগাথা।

এখনও শীতের ছুটিতে অনেকেই ছুটে যান গ্রামে। ‘যত শীত পড়বে তত মিষ্টি রস দেবে খেজুর গাছ’- এ কথা মাথায় রেখে অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়বে গ্রামীণ পরিবারগুলো। শীতজুড়ে চলবে রস, গুড়, পিঠা-পুলি ও পায়েসের ব্যস্ত আয়োজন। গ্রাম থেকে তলব আসবে, পুকুর পাড়ের পশ্চিম দিকের গাছ কাটা হবে পরের রোববার; বাড়ি এসো। রস খাবে না?

পাঠক, এই শীতে রস নাকি রসের গুড় খাবেন সে সিদ্ধান্ত আপনার। ভালো মন্দ বিচারের আমি কেউ নই। এ প্রসঙ্গে সুকুমার রায় অনেক আগেই রায় গেছেন, “…কিন্তু সবার চাইতে ভালো—/ পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়।”

 

ছবি: দীন মোহাম্মদ শিবলী ও সোহেল আহমেদ