শঙ্খচিল: জিজ্ঞাসা-জাগানিয়া চলচ্চিত্র

সাম্প্রতিক বাংলা চলচ্চিত্রে গৌতম ঘোষ নির্দেশিত কয়েকটি চলচ্চিত্র নবীন প্রকরণে সমৃদ্ধ হয়ে দর্শক হৃদয়কে আলোড়িত করেছে এবং বোধের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করছে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। ১৯৮০ সালে তেলেগু ভাষায় একটি চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র সৃজন শুরু হয়েছিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি ও লালনের জীবনভিত্তিক মনের মানুষ তাঁর অনন্য সৃষ্টি।
এছাড়া বিসমিল্লাহ খাঁ এবং মোহর-এ তিনি শক্তিমত্তা ও সিদ্ধির যে ছাপ রেখেছেন, তাও হয়ে ওঠে জীবনভিত্তিক ছবির জগতে বিশিষ্ট সৃষ্টি। শঙ্খচিল গৌতম ঘোষের সাম্প্রতিক ছবি। গৌতম ঘোষ এই ছবিতে নির্মাণকৌশল এবং গল্পের বিস্তারে এমন এক আবহ সৃষ্টি করেছেন, যা তাঁর সৃষ্টিকে করে তুলেছে দীপ্তিময়, অশ্রুসিক্ত, হৃদয়গ্রাহী ও শিল্পিত। বহুদিন এমন জিজ্ঞাসা-জাগানিয়া ছবি আমরা দেখিনি। দেশভাগ আর সীমান্তের বিভাজন মানবিক রেখাকে কতভাবে যে বিপর্যস্ত করে রেখেছে, এ নতুন করে আবার উপলব্ধ হয়েছে দর্শকদের মনে- এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। সংস্কৃতি, জীবনাচরণ, ভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় বিভাজন, সীমান্তের বিভাজন যে কত বিনাশী, সে-কথা অর্থবহ হয়ে উঠেছে এ ছবিতে। ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এ ছবি। এ ছবির কাহিনি বা ঘটনাপ্রবাহ সিনেমাবিমুখ মানুষকে সিনেমা হলে নিয়ে যাবে না জেনেও এই ছবিতে যাঁরা অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের অভিবাদন জানাই এবং সে জন্য আমরা আনন্দবোধ করি। যৌথ উদ্যোগে এমন ছবি আরও তৈরি হোক, দুই দেশের নৈকট্য ও পারস্পরিক সখ্যের ক্ষেত্রেও নতুন নবীন মাত্রা যোগ করুক চলচ্চিত্র- এ তো আজ প্রত্যাশা করা যায়।
চোরাচালান ও সীমান্ত প্রহরীদের হৃদয়হীন তৎপরতায় যে প্রাণহানি ঘটে এবং সীমান্ত যে সংকট সৃষ্টি করছে, এ জিজ্ঞাসায় দর্শক হৃদয় আলোড়িত হয়, ছবির শেষে বহু দর্শক চোখ মুছতে মুছতে হল থেকে বেরিয়ে আসেন। সীমান্ত সমস্যা এমন এক বিষয়, যার সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে জন্য অনেক ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরী মারা যায়, কখনো-সখনো কিষান-কিষানি। শঙ্খচিল সীমান্ত বিভাজন প্রশ্নে যে মানবিক বোধকে তুলে ধরেছেন গৗতম ঘোষ, এ ধরনের ছবি খুব একটা হয়নি। দেশ বিভাগ নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখার যন্ত্রণাবোধ এখনো অনেককে তাড়া করে, গৌতম ঘোষের শক্সখচিল হয়ে ওঠে আরেক দুঃখের পরিণাম। যন্ত্রণার চেয়েও দুঃখ ও বেদনার তাপ অধিক হয়ে ওঠে। যে বেদনার সঙ্গে মানুষের ট্র্যাজেডি অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে থাকে। এক কিশোরীর হৃদয়বিদারক মৃত্যুর জন্য মন যেমন কাঁদে, তেমনি মেয়েটির আদর্শবাদী স্কুলশিক্ষক পিতা ও সাধারণ গৃহিণী মাতার বিপন্নতা এবং অন্তিম বিধুরতাও আমাদের কাঁদায়। অসুস্থ কিশোরীটির উচ্ছলতা, ঘুরে বেড়ানো, জিয়ল মাছ নদীতে ছেড়ে দেওয়া, উদার আকাশ, মুক্ত পাখির আকাশে বিচরণ, বিস্তীর্ণ জলরাশি এবং কাঁটাতারের বেড়ার প্রতিরোধ সত্ত্বেও ওপারের সীমান্ত প্রহরীর সঙ্গে কিশোরীটির যে সখ্যের চিত্র পাই শঙ্খচিলে, আমাদের মানবিক সাধনায় এ নবীন মাত্রা যোগ করে। ভাষার ব্যবধান সত্ত্বেও ওপারের সীমান্তরক্ষী কন্যাসম কিশোরীর আনন্দ ও বেদনার সঙ্গে যেভাবে একাত্ম হয়ে ওঠে, তা মানব সম্পর্কে অধিকতর ব্যঞ্জনা দেয়। সীমান্ত সমস্যা ও কাঁটাতারের বেড়ার সঙ্গে দেশভাগের ট্র্যাজিক বেদনার এক আখ্যান হয়ে ওঠে এ ছবি।
শক্সখচিল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তবর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষের গল্প।
ছবিটির প্রাণ যে তিনটি চরিত্র, তাঁদের অসামান্য অভিনয় শৈল্পিক মানের। প্রসেনজিৎ যে কত উঁচু মানের অভিনেতা স্কুলশিক্ষক রূপে তিনি এ ছবিটিতে ও দৃঢ়তার সঙ্গে প্রমাণ করেছেন। সারল্যে ও ঔজ্জ্বল্যে এবং হাসপাতালে মেয়ের মৃত্যুসংবাদ শ্রবণের পর স্কুলশিক্ষকের স্ত্রীরূপী কুসুম শিকদারের হাহাকার মথিত অভিনয় দীর্ঘদিন মনে থাকবে। এই দম্পতির মেয়ে সাঁঝবাতি অসুস্থতা সত্ত্বেও জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে ছুঁয়ে যে উচ্ছলতা, স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা ও কৈশোরক তরঙ্গ স্পর্শ করে অভিনয় করেছে, তা হৃদয়কে আলোড়িত করে।
শক্সখচিল হয়ে উঠেছে মানবিকতার এক ট্র্যাজিক বেদনার গল্প। এই চলচ্চিত্রে গৌতম ঘোষ আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে এই গল্পকে চলচ্চিত্রে রূপায়িত করেছেন এবং তিনি যে সাম্প্রতিক কালের একজন উচ্চমানের পরিচালক, সে কথা আরেকবার প্রমাণিত করলেন।

শঙ্খচিল

পরিচালক : গৌতম ঘোষ
প্রযোজক : ইমপ্রেস টেলিফিল্মস
আশীর্বাদ চলচ্চিত্র
রচয়িতা : সায়ন্তনী পুততুন্ড
মুক্তি : ১৪ এপ্রিল ২০১৬
দেশ : বাংলাদেশ, ভারত
ভাষা : বাংলা